দেশজুড়ে চলছে তীব্র তাপদাহ। আকাশ থেকে যেন আগুন ঝরছে, বাতাসে নেই স্বস্তির কোনো ছোঁয়া। এমন দমবন্ধ পরিস্থিতির মধ্যেই শুরু হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং, যা জনজীবনকে প্রায় অচল করে তুলেছে। দিনে-রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় নগর ও গ্রাম, সবখানেই মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। গরমে হাঁসফাঁস করা মানুষের কষ্ট যেন কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এই বিদ্যুৎ সংকট।
#দিন-রাত দীর্ঘ বিদ্যুৎহীনতা, তাপদাহে বিপর্যস্ত জীবন
#জ্বালানি সংকট, বকেয়া আর নীতিগত জটিলতায় গভীর হচ্ছে সংকট
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিনই লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দৈনিক ২ থেকে ৩ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেও ঢাকার বাইরে অনেক জেলায় ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। এই দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার প্রভাব পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম এবং স্বাস্থ্যসেবায়। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে শুধু তাপদাহ নয়, রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীনতা, অব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। কাগজে-কলমে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে অনেক কম। চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদনের এই ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সাম্প্রতিক এক দিনে বিদ্যুতের চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট, কিন্তু সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে ১২ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি। ফলে ২ হাজার মেগাওয়াটেরও বেশি ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যার ফলেই ব্যাপক লোডশেডিং দেখা দিয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ জ্বালানি ঘাটতি। গ্যাস, কয়লা এবং ফার্নেস অয়েলের সরবরাহ প্রয়োজনের তুলনায় কম। বিশেষ করে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুরো সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ১২ হাজার মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় অর্ধেক। প্রতিদিন প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ না পাওয়ায় অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি এলএনজি আমদানিতে প্রভাব ফেলছে, ফলে সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
বিদ্যুৎ খাতে আর্থিক সংকটও এখন প্রকট। সরকারি বিদ্যুৎ সংস্থার কাছে বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পাওনা প্রায় ৪২ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই বিপুল বকেয়ার কারণে অনেক কোম্পানি জ্বালানি কিনতে পারছে না, ফলে উৎপাদন কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। অন্যদিকে উৎপাদন ব্যয় বেশি হলেও কম দামে বিদ্যুৎ বিক্রি করায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিপুল লোকসানের মুখে পড়ছে। চলতি বছরে এই লোকসানের পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, এবারের গ্রীষ্মে বিদ্যুৎ সংকট তীব্র হতে পারে, এমন সতর্কতা আগেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি।
বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ থাকা এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, এবারের গরমে বিদ্যুতের চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই তুলনায় গ্যাস, কয়লা ও জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ ছিল সীমিত। গত বছর যেখানে দৈনিক ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল, এবার তা কিছুটা কমেছে। ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
অর্থ বিভাগ ও বিদ্যুৎ বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতাও সংকটকে আরও জটিল করেছে। ভর্তুকির টাকা ছাড়ে বিলম্ব এবং নতুন শর্ত আরোপের কারণে বিদ্যুৎ খাতে অর্থপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র সময়মতো অর্থ না পেয়ে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রস্তাব বাতিল হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
এ বিয়য়ে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক বলেছেন, এবার বিদ্যুৎ খাতকে দৈনিক ৯৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হচ্ছে এবং এটা বছরের শুরুতে তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাই এখন চাইলেই বিদ্যুৎ খাতকে বেশি করে গ্যাস দেওয়া সম্ভব নয়। অপরদিকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকেও প্রত্যাশিত উৎপাদন পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কয়লার মান খারাপ, কোথাও সরবরাহে ঘাটতি, আবার কোথাও আর্থিক জটিলতায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের যোগান কমে গেছে।
বিদ্যুৎ আমদানির ওপর নির্ভরশীলতাও একটি বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে আমদানি কমে যাওয়ায় ঘাটতি বেড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
লোডশেডিংয়ের প্রভাব এখন সর্বত্র। শিল্পখাতে উৎপাদন কমে যাচ্ছে, ব্যয় বাড়ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যে ক্রেতা কমে যাওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছে না। স্বাস্থ্যখাতে গরমজনিত রোগ বাড়ছে, হাসপাতালগুলোতে চাপ বাড়ছে। অনেক এলাকায় পানির সংকটও দেখা দিয়েছে, কারণ পানির পাম্প চালাতে বিদ্যুৎ প্রয়োজন।
এই পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের প্রশ্ন, প্রতিবছরই যদি গরমে একই সংকট তৈরি হয়, তাহলে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয় না কেন? এত বিনিয়োগের পরও কেন স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বকেয়া বিল দ্রুত পরিশোধ, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝোঁক বাড়ানোর কথাও বলা হচ্ছে।
এমতাবস্তায় সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন যে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিং পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে। তিনি বলেন, রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে বর্তমানে কিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না, তবে সেগুলো দ্রুত স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরে আসবে। এর ফলে খুব শিগগিরই বিদ্যুৎ সরবরাহ স্থিতিশীল হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
তবে অনেকেই মনে করছেন, বৃষ্টিপাত হলে সাময়িক স্বস্তি মিলতে পারে। কারণ তাপমাত্রা কমলে বিদ্যুতের চাহিদাও কিছুটা কমবে। তবে এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। সর্বোপরি, গরম ও লোডশেডিংয়ের এই দ্বিমুখী চাপ সাধারণ মানুষের জীবনকে চরম দুর্বিষহ করে তুলেছে। সংকটের গভীরে রয়েছে জ্বালানি ঘাটতি, আর্থিক দুর্বলতা এবং নীতিগত জটিলতা। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ মানুষ, যারা প্রতিদিন অন্ধকারে বসে অপেক্ষা করছে আলো ফিরে আসার।