পথ পথিকের, এটি সম্ভবত পুরোনো দিনের কথা হয়ে গেছে। এখন পথ যান্ত্রিক-অযান্ত্রিক বিভিন্ন যানবাহনের। আর ফুটপাত- তার কিয়দংশ যায় দোকানপাটের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে। অবশিষ্ট যেটুকু থাকে, তাতে বেপরোয়া গতিতে চলে মোটরবাইক। তার ওপর হকাররা তো আছেনই। ফলে পথচারীর জন্য কার্যত কিছুই থাকে না। এমন পরিস্থিতিতে নগর-মহানগরগুলোর যানবাহন ও পথচারী চলাচলে অনেকটা বিপর্যস্ত অবস্থা বিরাজ করছে। আর এর প্রতিকার করতে মাঝেমধ্যে চলে হকার উচ্ছেদ অভিযান। পালিয়ে যান তারা। ক্ষেত্রবিশেষে তাদের অস্থায়ী স্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়। আবার ঘন্টা কয়েক গেলেই যে কে সেই। যেন কিছুই হয়নি। অথবা এমন কিছু হয়েছে; যা পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ছিল অত্যন্ত সহায়ক।
তবে এবার রাজধানী ঢাকার ফুটপাতে উচ্ছেদ হওয়া হকারদের দ্রুত পুনর্বাসনের লক্ষ্যে জাতীয় নীতিমালা তৈরি করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান হকারদের স্বাচ্ছন্দ্যময় স্থানে পুনর্বাসনের নির্দেশ দিয়েছেন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) অস্থায়ী ভিত্তিতে ৬টি খোলা মাঠ বা নির্ধারিত স্থান ব্যবহার করার পরিকল্পনা করছে। নিবন্ধন ও নির্দিষ্ট ফি-এর বিনিময়ে এই জায়গাগুলো ব্যবহার করা যাবে। তথ্যমতে, রাজধানীর ফুটপাতে আগে যেখানে ২০০ হকার ছিল, এখন তা বেড়ে প্রায় দুই হাজারে দাঁড়িয়েছে। এতে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এমনকি হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্স চলাচলও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। দুই শতাংশ মানুষের কারণে ৯৮ শতাংশ মানুষ ভোগান্তিতে পড়ছে। আমরা ঢাকার এই কয়েকজন হকারের জন্য পুরো ঢাকাবাসীর ভোগান্তি হোক সেটা কোনোভাবেই চাই না। নির্দিষ্ট জায়গায়ই তাদের বসতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময় পরে দোকান সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। দোকানগুলো ট্রলির আদলে তৈরি হতে হবে, কোনোভাবে স্থায়ী বা অস্থায়ী স্থাপনা করা যাবে না।
গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত বলেন, ঢাকা শহর বর্তমানে এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি, যা একে একটি মৃত নগরীর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বুড়িগঙ্গাসহ চারপাশের নদীগুলো দখল ও দূষণে কার্যত মৃত হওয়ায় ঢাকা এখন পানির জন্য দূরবর্তী মেঘনা নদীর ওপর নির্ভরশীল, যা দীর্ঘমেয়াদে অত্যন্ত ঝুঁঁকিপূর্ণ। এই সংকট থেকে উত্তরণে একটি সমন্বিত নগর শাসন কাঠামো এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি। এ লক্ষ্যে সরকার শহরের ফুটপাতে ব্যবসারত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসনের জন্য নতুন একটি নীতিমালা জারি করতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে সেই আলোকে কার্যপরিধি মোতাবেক একটি কমিটি গঠন করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। কমিটি ইতোমধ্যে তাদের কাজও শুরু করে দিয়েছে। দ্রুতই এ নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে। এ কমিটি গঠন করে সম্প্রতি অফিস আদেশ জারি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। এ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব কমিটির আহ্বায়ক। সদস্য সচিব হলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব (সিটি-১)। কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের দুই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) এবং রাজউকের একজন পরিচালক সদস্য হিসেবে রয়েছেন।
কমিটির কার্যপরিধিতে বলা হয়েছে, এ কমিটি ঢাকা মহানগরীর হকারদের পুনর্বাসন ও ঢাকা শহরের যানজট নিয়ন্ত্রণের জন্য কমিটি ঢাকা শহরের ফুটপাতে ব্যবসারত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে শৃঙ্খলায় আনার লক্ষ্যে মূল রাস্তা থেকে সুবিধাজনক স্থানে পুনর্বাসনের জন্য একটি নীতিমালা দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রণয়ন করে স্থানীয় সরকার বিভাগের সচিব বরাবর দাখিল করবেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির সদস্য সচিব ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব (সিটি কর্পোরেশন-১) রবিউল ইসলাম বলেন, হকার ও ফুটপাতে ব্যবসারত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে পুনর্বাসনের জন্য একটি নীতিমালা করতে আমরা ইতোমধ্যে একটি সভা করেছি। আগামী সপ্তাহে আরও একটি সভা হবে। তিনি আরও বলেন, আমরা এ বিষয়ে কাজ করছি। দ্রুতই নীতিমালা চূড়ান্ত করা হবে। চূড়ান্ত করার পর এ মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর এই নীতিমালা দেওয়া হবে।
জানা যায়, ঢাকার ব্যস্ততম সড়ক ও ফুটপাত পথচারীদের জন্য উন্মুক্ত করতে চলতি মাসের শুরুতে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) এবং দুই সিটি করপোরেশন সাঁড়াশি অভিযানে নামে। গত ১ থেকে ৫ এপ্রিল পূর্ব ঘোষণা দিয়ে এ অভিযান চালানো হয়। ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, এ অভিযানে ফুটপাত দখলকারীদের কাছ থেকে ১১ লাখ ৩১ হাজার ৪৫০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এছাড়া, ৪৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অবৈধ পার্কিংয়ের অভিযোগে ১৭০টি ভিডিও মামলা দেওয়া হয় এবং অবৈধভাবে স্থাপিত দোকান ও যানবাহনসহ বিভিন্ন মালামাল জব্দ করা হয়।
অভিযানে গুলিস্তান, নিউমার্কেট, নীলক্ষেত ও সায়েন্সল্যাবসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত ও সড়কের দখলমুক্তি ঘটে। তাতে অনেকটা স্বস্তি ফিরে জনজীবনে। যদিও এটি বেশিদিন দখলমুক্ত থাকেনি। গুলিস্তান, নিউমার্কেট, নীলক্ষেত ও সায়েন্সল্যাবসহ বিভিন্ন এলাকার ফুটপাত আগের মতোই দখল করে এখন জামা-কাপড়, বই, জুতা, ফলসহ নানা পণ্য বিক্রি করছেন হকাররা। ট্রাফিক ও থানা পুলিশের সামনেই চলছে এসব কার্যক্রম। অতীতেও বহুবার উচ্ছেদ করা হয়েছে, কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা বা পুনর্বাসন না থাকায় কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই ফুটপাত ফিরে গেছে হকারদের দখলে। হকার উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন প্রসঙ্গে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী যেটা চান, শুধু হুট করে উচ্ছেদ করলে হবে না। এদের একটা বিকল্প ব্যবস্থাও করতে হবে। সেটার জন্য ঢাকা শহরে আমরা ৮টি নৈশ মার্কেট করার চিন্তা করছি। নৈশ মার্কেট বলি বা যেটাই বলি, নৈশকালীন। অর্থাৎ অফিস আওয়ারের পর বিকেল থেকে শুরু করে রাত ১২টার আগ পর্যন্ত সেখানে তাদের বসাতে চাই যেন সারাদিন সব জায়গায় হকারদের মার্কেট না বসে। অন্যদিকে, ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিধন এবং খালগুলো পরিষ্কারের ক্ষেত্রে জনগণের সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করে ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল খান জানান, ‘নগরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমরা যা করি, তার অধিকাংশই সাময়িক। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। ওয়াসা, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে একটি কর্তৃপক্ষের আওতায় আনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন প্রশাসক।
এদিকে, পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ চান না হকাররা। এ লক্ষ্যে গত ১৬ এপ্রিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ করে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন। সমাবেশে বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল হাশিম কবির বলেছেন, পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ করা যাবে না, হকারদের অর্থনৈতিক অবদানের জাতীয় বা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে, জীবিকা সুরক্ষা আইন প্রণয়ন করতে হবে, হকারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি বন্ধ করে রাজস্ব আদায়, হকারদের ওপর মামলা-গ্রেপ্তার, দমন-পীড়ন-নির্যাতন বন্ধ, প্রকৃত হকারদের তালিকা প্রণয়ন করতে হবে। এছাড়া দখল করা সরকারি জায়গা দখলমুক্ত করে হকারদের বরাদ্দ দিয়ে হকারদের পুনর্বাসন, ৫ বছর মেয়াদি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ, জাতীয় বাজেটে হকারদের জন্য বরাদ্দ ও হকার্স মার্কেটগুলোতে প্রকৃত হকারদের নামে বরাদ্দ দিতে হবে।