গুপ্তহত্যা এবং অভ্যুত্থানের শঙ্কায় ১০ শীর্ষ কমান্ডারসহ ভ্লাদিমির পুতিনকে ঘিরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নজিরবিহীনভাবে জোরদার করেছে ক্রেমলিন। ইউরোপীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনের বরাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ড এবং সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের আশঙ্কা থেকেই এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে রাশিয়ায় প্রতিমাসে অন্তত ৩০ হাজার হতাহতের ঘটনা ঘটছে। এমনটি আর্থিক ও অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির জেরে রাশিয়াজুড়ে অসন্তোষ বাড়ছে। এছাড়া ২০২৫ সালের ২২শে ডিসেম্বর লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফানিল হত্যাকাণ্ডের পর প্রেসিডেন্ট কার্যালয় ক্রেমলিনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। কারণ মস্কোতে এই গুপ্তহত্যার পেছনে কিয়েভের এজেন্ট জড়িত বলে সন্দেহ করছে ক্রেমলিন।
এই ঘটনার পর পুতিনের প্রোটোকল পর্যালোচনা করা হয়। এমনকি রাশিয়ার আরও ১০ শীর্ষ কমান্ডারকে লক্ষ্য করে গুপ্তহত্যা এবং অভ্যুত্থানের শঙ্কা প্রকট হয়। ষড়যন্ত্র বা অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার ঝুঁকিতে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনে'র নিরাপত্তাও জোরদার করেছে ক্রেমলিন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী—পুতিনের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীদের বাড়িতে উন্নত নজরদারি প্রযুক্তি বসানো হয়েছে। এমনকি তাঁর সঙ্গে কাজ করা রাঁধুনি, দেহরক্ষী ও ফটোগ্রাফারদেরও গণপরিবহন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ক্রেমলিনে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হলে দর্শনার্থীদের দুই ধাপে নিরাপত্তা তল্লাশি পেরোতে হচ্ছে। পাশাপাশি পুতিনের কাছাকাছি কাজ করেন এমন ব্যক্তিদের ইন্টারনেটবিহীন ফোন ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত কয়েক মাসে রাশিয়ার উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পর এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়। বিশেষ করে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এক শীর্ষ জেনারেলকে হত্যার ঘটনায় রুশ নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে তীব্র মতবিরোধ তৈরি হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে ক্রেমলিনের ভেতরে অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তার মাত্রা বেড়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, পুতিনের চলাফেরা এখন অনেক সীমিত। তিনি নিয়মিত যেসব জায়গায় যেতেন, সেগুলোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে। তাঁর মস্কো অঞ্চলের বাসভবন কিংবা ভালদাইয়ের নির্জন গ্রীষ্মকালীন রেসিডেন্সেও এখন আর তিনি নিয়মিত যাচ্ছেন না। এমনকি চলতি বছরে এখন পর্যন্ত তিনি কোনো সামরিক ঘাঁটিও পরিদর্শন করেননি—যা আগের বছরগুলোতে ছিল নিয়মিত ঘটনা। এর পরিবর্তে ক্রেমলিন মাঝে মাঝে তাঁর পূর্বে ধারণ করা ভিডিওচিত্র প্রকাশ করছে।
ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পুতিন দীর্ঘ সময় ধরে সুরক্ষিত বাংকারে অবস্থান করছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে কৃষ্ণসাগর উপকূলীয় ক্রাসনোদার অঞ্চলে তাঁর উপস্থিতি বেশি দেখা গেছে।
চার বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এখন রাশিয়ার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। পশ্চিমা দেশগুলোর হিসাবে, প্রতি মাসে প্রায় ৩০ হাজার রুশ সেনা নিহত বা আহত হচ্ছে। সীমিত অগ্রগতি এবং ইউক্রেনের ড্রোন হামলা রাশিয়ার ভেতরেও অস্থিরতা বাড়িয়েছে। সম্প্রতি মস্কোর অভিজাত এলাকায় একটি বহুতল ভবনে ড্রোন হামলার ঘটনাও সেই উদ্বেগকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবও এখন স্পষ্ট। রাশিয়ার বড় শহরগুলোতে মোবাইল নেটওয়ার্ক বিঘ্নিত হওয়া নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে, এমনকি পুতিনপন্থী শহুরে মধ্যবিত্তদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে।
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে ক্রেমলিনের ভেতরে সংবেদনশীল তথ্য ফাঁস এবং সম্ভাব্য অভ্যুত্থানের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে ড্রোন ব্যবহার করে হত্যাচেষ্টার আশঙ্কা নিয়ে পুতিন সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
এই প্রেক্ষাপটে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগুকে নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করা শোইগুর সামরিক বাহিনীতে এখনো যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। এ জন্য তাঁকে সম্ভাব্য ‘ঝুঁকির’ উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তবে এসব দাবির পক্ষে সরাসরি কোনো প্রমাণ দেওয়া হয়নি।
প্রতিবেদনটি আরও জানায়, ২০২৫ সালের শেষ দিকে ক্রেমলিনের এক বৈঠকে শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা হয়। ওই বৈঠকে জেনারেল স্টাফ প্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভ এবং এফএসবি প্রধান আলেকজান্ডার বোর্তনিকভ একে অপরকে নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য দায়ী করেন।
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই পুতিন তাঁর ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সংস্থা ফেডারেল প্রোটেকশন সার্ভিস (এফএসও)-এর আওতা বাড়ান এবং আরও ১০ জন শীর্ষ কমান্ডারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন।
এদিকে এসব তথ্য নিয়ে বিশ্লেষকেরা মত দিয়েছেন, এমন গোয়েন্দা তথ্য ফাঁসের ঘটনা বিরল এবং এর সত্যতা যাচাই করা কঠিন। তবে এটি ইউরোপীয় দেশগুলোর একটি কৌশলও হতে পারে—রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে সামনে এনে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা।