দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আজ সোমবার শুরু হচ্ছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গসহ পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা।
পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও আসাম, কেরালা, তামিলনাড়ু ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরির নির্বাচনী ফলাফল আজ ঘোষণা করা হবে। ইভিএম খোলার সাথে সাথেই স্পষ্ট হয়ে যাবে আগামী পাঁচ বছর এই রাজ্যগুলোর শাসনভার কাদের হাতে যাচ্ছে।
পুরো দেশের রাজনৈতিক মহলের নজর এখন মূলত পশ্চিমবঙ্গের দিকে। ২০১১ সালে বামফ্রন্টের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেস এবারও জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী।
গত ২০১৬ এবং ২০২১ সালের নির্বাচনে বড় ব্যবধানে জয়লাভ করে 'মা-মাটি-মানুষ'-এর সরকার নিজেদের অবস্থান সুসংহত করেছিল। তবে এবার লড়াইটা আগের চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে, ২০১৬ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গে শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে উত্থান ঘটেছে বিজেপির। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তারা তৃণমূলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং উল্লেখযোগ্য হারে নিজেদের ভোট ব্যাংক বাড়াতে সক্ষম হয়। এবারও তারা পরিবর্তনের ডাক দিয়ে মাঠে নেমেছে। বুথ ফেরত সমীক্ষাগুলো যাই বলুক না কেন, শেষ পর্যন্ত বাংলার জনগণ মমতার হ্যাটট্রিক নিশ্চিত করবেন নাকি গেরুয়া শিবিরের উত্থান হবে, তা জানা যাবে আজই।
আসামের রাজনৈতিক ময়দানে এবারও লড়াই হচ্ছে গেরুয়া শিবির ও কংগ্রেসের মধ্যে। কেরালায় প্রথাগতভাবে সরকার পরিবর্তনের চল থাকলেও এবার বাম জোট পুনরায় ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন দেখছে। তামিলনাড়ুতে ক্ষমতার পালাবদলের জোরালো ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বিভিন্ন সংস্থার জরিপে। আর পুদুচেরির ছোট লড়াইয়েও রয়েছে বড় বড় রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ।
নির্বাচন পরবর্তী যেকোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি রুখতে রাজ্যগুলোতে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সোমবারের এই ফলাফল শুধু সরকার গঠনের লড়াই নয়; বরং ভোটাররা পুরনো সরকারের ওপর আস্থা রাখলেন নাকি নতুন পরিবর্তনের পথ বেছে নিলেন, তা বোঝার চূড়ান্ত পরীক্ষা।
ভোটার তালিকা বিতর্ক : পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষের কাছে ‘দিদি’ বলে পরিচিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য এবারের লড়াইটি মূলত নিজের দুর্গ রক্ষার। সেই ২০১১ সাল থেকে টানা তিন মেয়াদ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আছেন তিনি।
এ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় ছিল এসআইআর বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন। এটা ভোটার তালিকা সংশোধনের পোশাকি নাম। ভারতীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে এত বেশি বিতর্ক আর কখনো হয়নি।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস টানা ১৫ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায়। বলা হয় সেখানে সংখ্যালঘু মুসলমান ভোটারদের বড় অংশ তৃণমূলকেই সমর্থন করেছে। তৃণমূলের অভিযোগ, ভোটাার তালিকা সংশোধনের নামে ওই ভোটারদের নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বাইরে রাখার চেষ্টা করেছে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি।
ভোটার তালিকা সংশোধনের বড় প্রভাব যে নির্বাচনে পড়েছে, তাতে কারো সন্দেহ নেই। এসআইআরের আগে পশ্চিমবঙ্গে মোট ভোটার ছিল প্রায় ৭.৬–৭.৭ কোটি। এই প্রক্রিয়ার পরে প্রায় ৮৩–৯১ লাখ নাম বাদ পড়ে। অর্থাৎ মোট ভোটারের প্রায় ১০–১২ শতাংশ কমে যায়। সংশোধনের পর ভোটার সংখ্যা নেমে আসে আনুমানিক ৬.৪–৬.৮ কোটির মধ্যে।
আনন্দবাজার লিখেছে, এসআইআর-এর কারণে এ র মোট ভোটারের সংখ্যা অনেকটা কমে যাওয়ায় প্রত্যাশিতভাবেই ভোটদানের হার বেড়েছে। কিন্তু সরল পাটিগণিতের বাইরেও এ বার ভোটদাতার সংখ্যা ২০২১-এর তুলনায় ৩০ লাখেরও বেশি। ফলে দুয়ে মিলিয়ে ভোটদানের হার রেকর্ড গড়ে ফেলেছে।
“সেই ভোটের অভিমুখ কোন দিকে, তৃণমূলের দিকে থাকা সংখ্যালঘু ভোটের সমর্থনে ফাটল ধরেছে কি না, হিন্দু ভোট ঐক্যবদ্ধ ভাবে বিজেপির দিকে গিয়েছে কি না বা বিপুল সংখ্যক মহিলা ভোট গিয়েছে কোন দিকে, এ নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে নানা বিশ্লেষণ চলেছে। সোমবার দুপুরের পরে স্পষ্ট হয়ে যাবে পশ্চিমবঙ্গ কেমন পরীক্ষা দিয়েছে।”
ভোট গণনা আরো তিন রাজ্যে : পশ্চিমবঙ্গের মত ভারতের অন্য তিন রাজ্য আসাম, কেরালা, তামিলনাড়ু ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরিতেও বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা হবে সোমবার। এসব রাজ্যেও সকাল থেকে ভোট গণনা শুরু হয়েছে।
এসব রাজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।
রেকর্ড ভোট, জিতবে কে : পশ্চিমবঙ্গে এবার দুই দফায় ভোট পড়েছে ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। আশাতীত ভোটার উপস্থিতি এবার সবাইকে বিস্মিত করেছে।
সোমবার ভোটগণনার পরপরই নিশ্চিত হওয়া যাবে এবারের নির্বাচনে টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকা তৃণমূল কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় আসবে, নাকি বিরোধী দল বিজেপির হাতে যাবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা।
২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। ২০২১ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস; তারা পেয়েছিল ২১৫টি আসন। ৭৭টি আসন পেয়ে প্রথমবারের মতো বিজেপি বসেছিল বিরোধী দলের আসনে। কংগ্রেস ও বামদের নির্বাচনি ফলাফল ছিল শোচনীয়।
এবারের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি তার সর্বশক্তি প্রয়োগ করেছে ভালো ফলাফল পাওয়ার চেষ্টায়। ভারতের কেন্দ্রে এবং অনেক রাজ্যেই বিজেপি সরকার গঠন করেছে, ফলে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গড়তে বিজেপি মরিয়া।
তাই এবার তাদের লক্ষ্য ছিল নির্বাচনে ভোটার তালিকা সংশোধন করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে তৃণমূলের প্রভাব থেকে বের করে আনা। নির্বাচন কমিশনও সেভাবেই কাজ করেছে।
গত ২৩ এপ্রিল রাজ্যের ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছিল। তার পরে দ্বিতীয় দফায় ভোটগ্রহণ হয় দক্ষিণবঙ্গের সাত জেলার ১৪২টি আসনে।
প্রথম দফায় যে ভোটগ্রহণ হয়েছিল, তার বেশির ভাগ জেলা বিজেপির ‘শক্ত ঘাঁটি’ বলে পরিচিত। আবার দ্বিতীয় দফায় ভোটগ্রহণ হয়েছিল তৃণমূলের ‘দুর্গ’ বলে পরিচিত দক্ষিণবঙ্গে।
ফলাফল নিয়ে দুই শিবিরই ‘আত্মবিশ্বাসী’। দ্বিতীয় দফার ভোট শেষে বিভিন্ন জরিপ সংস্থা যে বুথফেরত সমীক্ষা প্রকাশ করেছিল, তার বেশির ভাগেই ইঙ্গিত মিলেছিল রাজ্যে ‘পরিবর্তন’ হতে চলেছে। ক্ষমতায় আসতে চলেছে বিজেপি। অবশ্য তৃণমূল পাল্টা দাবি করেছে, ২০২১ এবং ২০২৪ সালের ভোটেও বুথফেরত সমীক্ষা মেলেনি। এ বারও মিলবে না।
ভোট গণনা কীভাবে : ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় গত ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দুই দফায় ভোটগ্রহণ হয়। অনিয়মের অভিযোগে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ফলতা কেন্দ্রের ভোট বাতিল করে নির্বাচন কমিশন। ওই কেন্দ্রে ফের ভোট হবে ২১ মে। গণনা হবে ২৪ মে।
সোমবার রাজ্যের মোট ৭৭টি গণনাকেন্দ্রের ৪৫৮টি হলে সোমবার ভোটগণনা চলছে। প্রথমে পোস্টাল ব্যালট গোনা শুরু হয়। এরপর শুরু হয় ইভিএমের ভোট গণনা।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রাউন্ডের গণনা হবে চুঁচুড়ায়। সেখানে ২৭ রাউন্ড ইভিএম গণনা হবে। সবচেয়ে কম রাউন্ড গণনা রয়েছে মেটিয়াবুরুজ, সপ্তগ্রাম এবং বীজপুরে। এই তিন আসনেই ১০ রাউন্ড করে গণনা হবে।
এমটিআই