এক সময় শিল্পনগরী খুলনার বিনোদনের প্রধান কেন্দ্র ছিল সিনেমা হল। পিকচার প্যালেস, বৈকালি, সোসাইটি, স্টার, ঝিনুকসহ জনপ্রিয় হলগুলো ছিল মানুষের আনন্দ-উচ্ছ্বাসের ঠিকানা। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই রমরমা দিন এখন শুধুই স্মৃতি। বর্তমানে জেলায় এক সময়ের ২০টি সিনেমা হলের মধ্যে মাত্র চারটি কোনোভাবে টিকে আছে।
বাকি অধিকাংশ হল হয় ভেঙে ফেলা হয়েছে, না হয় বাণিজ্যিক বহুতল ভবনে রূপান্তরিত হয়েছে। আধুনিক সিনেপ্লেক্সের অভাব, পুরোনো হলগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থা এবং দর্শকের রুচি পরিবর্তনের কারণে ক্রমশ হলবিমুখ হয়ে পড়ছে দর্শকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনার পিকচার প্যালেস, নিউ মার্কেট সংলগ্ন ঝিনুক, সোসাইটি, স্টার, দৌলতপুরের মিনাক্ষী, পাইকগাছার বাসরী, কপিলমুনির সোহাগ, চালনার সুন্দরবন, ডুমুরিয়ার শঙ্খমহল, ফুলবাড়ি গেটের জনতা, খালিশপুরের বৈকালি, বড় বাজারের উল্লাসিনী, গ্যারিসন, ফুলতলার শাপলা এবং রূপসার রূপসাগর সিনেমা হলসহ বহু হল দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে অনেকগুলো প্রায় দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে অচল।
বর্তমানে কোনোভাবে চালু আছে চিত্রালী ডিজিটাল সিনেমা হল, লিবার্টি সিনেপ্লেক্স, সঙ্গীতা ও শঙ্খ সিনেমা হল।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মানসম্মত সিনেমার অভাব, ওটিটি প্ল্যাটফর্মের প্রসার, স্মার্টফোনে বিনোদনের সহজলভ্যতা, উচ্চ বিদ্যুৎ বিল ও আধুনিক প্রযুক্তির ঘাটতির কারণে একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে সিনেমা হলগুলো।
এর সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে এসব হলের কর্মীদের জীবনে। গেটম্যান, প্রজেক্টর অপারেটর, ক্লিনার ও টিকিট কাউন্টারের শ্রমিকরা বছরের পর বছর এই পেশায় যুক্ত থাকলেও এখন তারা চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই বাধ্য হয়ে ইজিবাইক, ভ্যান, রিকশা চালানো, হকারি কিংবা দিনমজুরির কাজ করছেন।
বন্ধ হয়ে যাওয়া স্টার সিনেমা হলের সাবেক অপারেটর সিরাজুল ইসলাম বলেন, “হল বন্ধ হওয়ার পর ভাইয়ের ব্যাটারির ব্যবসায় সাহায্য করেছি, এখন ইজিবাইক চালাই। স্টার হলে ১১ জন কর্মী ছিলেন, এখন কেউ নেই। কেউ মারা গেছেন, কেউ অন্য পেশায় চলে গেছেন।”
পিকচার প্যালেসের সাবেক ম্যানেজার মুজিবর রহমান বলেন, “হল বন্ধ হওয়ার পর সবাই বেকার হয়ে পড়ে। পরে ইজিবাইক শোরুম দিয়েছিলাম, কিন্তু দুর্ঘটনার পর এখন বাড়িতেই আছি।”
দৌলতপুর মিনাক্ষী সিনেমা হলের সাবেক বুকিং ক্লার্ক নূর আলম জানান, “এক সময় হলে দর্শক উপচে পড়ত। ২০০৮ সালে হল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আমরা ছোট ব্যবসা শুরু করেছি। অনেক সহকর্মী এখন আর জীবিত নেই।”
চিত্রালী ডিজিটাল সিনেমা হলের পরিচালক তপু খান বলেন, “সিনেমা হল চালানো এখন আর একটি টেকসই পেশা নয়। ভালো কনটেন্টের অভাব, হলগুলোর অবস্থা খারাপ এবং দর্শক না থাকায় আমরা চরম সংকটে আছি। ঈদের সিনেমা দিয়েও খরচ ওঠে না।”
তিনি আরও বলেন, “সরকার হল বন্ধ না করতে বললেও বাস্তবতা ভিন্ন। কর্মীদের অন্য কোনো অভিজ্ঞতা নেই, তাই তারা এখন রিকশা-ভ্যান চালাচ্ছেন।”
সঙ্গীতা সিনেমা হলের ম্যানেজার নাঈম জানান, “চারটি হল কোনো রকমে টিকে আছে, তবে যেকোনো সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।”
খুলনার ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিটির সদস্য সচিব মহেন্দ্রনাথ সেন বলেন, “সিনেমা হল শুধু বিনোদনের জায়গা নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির অংশ। এগুলো হারিয়ে গেলে নতুন প্রজন্ম তাদের শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।”
তিনি পুরোনো হলগুলো আধুনিক সিনেপ্লেক্সে রূপান্তর এবং মানসম্মত বাংলা সিনেমা নির্মাণ ও প্রদর্শনের জন্য সরকারি উদ্যোগের দাবি জানান।