শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত গাজীপুরের বিভিন্ন উপজেলায় জ্বালানি তেলের সংকটের প্রভাবে তীব্র লোডশেডিং দেখা দিয়েছে। এতে একদিকে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা চরম দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত কয়েকদিন ধরে দিনে-রাতে একাধিকবার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হচ্ছে। অনেক এলাকায় প্রতিদিন ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং চলছে, যা তীব্র গরমে জনদুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
শ্রীপুরসহ গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানাগুলোতে বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছে, ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে।
এক কারখানা কর্মকর্তা বলেন,“বিদ্যুতের অভাবে সময়মতো অর্ডার সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে আমরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছি।”
লোডশেডিংয়ের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন শ্রমজীবী মানুষ। কাজ শেষে ঘরে ফিরেও স্বস্তি মিলছে না।
এক শ্রমিক বলেন,“গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় ঘুমানোই কষ্টকর হয়ে গেছে। কাজের পর শরীর ঠাণ্ডা করার সুযোগ নেই।”
ডিজেল সংকটের কারণে কৃষি খাতেও দেখা দিয়েছে প্রভাব। সেচ পাম্প চালাতে না পারায় ফসল উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে জানান কৃষকেরা।
শিক্ষার্থীরাও পড়েছে বিপাকে। শ্রীপুরের হাজী ছোট কলিম স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক এসএসসি পরীক্ষার্থী জানায়,“রাতে ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় পড়াশোনা ঠিকমতো করা যাচ্ছে না। পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সমস্যা হচ্ছে।”
এদিকে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা পড়েছে পোল্ট্রি খাতে। খামারিরা জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় মুরগি মারা যাচ্ছে এবং জেনারেটর চালাতে গিয়ে উৎপাদন খরচ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।
শ্রীপুরের খামারি আবু তালেব বলেন,“২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৫-১৮ ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকে না। এই গরমে মুরগি মারা যাচ্ছে। আবার জেনারেটর চালাতে তেল কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন,“এই সংকট শুধু আমার না, আশপাশের সব খামারিই একই অবস্থায় আছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।”
শ্রীপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন বলেন,“পোল্ট্রি খাত টিকিয়ে রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ জরুরি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
তিনি জানান, খামারিদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহের সুপারিশ দেওয়া হচ্ছে, তবে স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি ও আমদানি জটিলতার কারণে দেশে সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গিয়ে লোডশেডিং বেড়েছে।
ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২, মাওনা জোনাল অফিসের ডিজিএম শান্তনু রায় বলেন,“চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কম থাকায় লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। বর্তমানে জাতীয় গ্রিড থেকে গড়ে ৩০-৩৫ শতাংশ ঘাটতি রয়েছে। প্রতিদিন এলাকায় ৭-৮ ঘণ্টা লোডশেডিং করা হচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে গাজীপুরের শিল্প, কৃষি ও পোল্ট্রি খাত বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে। এর প্রভাব সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট শুধু সাময়িক ভোগান্তি নয়, বরং দেশের উৎপাদন ব্যবস্থা ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি তৈরি করছে। দ্রুত সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।