মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সামরিক সংঘাতের উত্তাপ পৌঁছেছে বাংলাদেশেও। যদিও ইরানের সাথে বাংলাদেশের সরাসরি দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সীমিত, কিন্তু বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং প্রবাসী আয়ের ওপর এই যুদ্ধের প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী। ইতিমধ্যে দেশের প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট বিপর্যয় এবং জ্বালানি আমদানির রুট নিয়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের প্রধান উৎস সৌদি আরব, কুয়েত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। এই দেশগুলো থেকে জ্বালানি আমদানির জন্য ব্যবহৃত একমাত্র পথ হরমুজ প্রণালি। ইরান এই প্রণালিটি বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়ায় বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানিতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি $১০০ ছাড়ানোর আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম মাত্র $৫ বাড়লে বাংলাদেশের বার্ষিক আমদানি খরচ প্রায় ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ডলার বেড়ে যাবে।
জ্বালানি সংকটের ফলে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধির আশঙ্কা প্রবল, যা সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। মধ্যপ্রাচ্যের জিসিসি (GCC) দেশগুলোতে প্রায় ৮০ লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন।
গত কয়েক দিনে ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী প্রায় ১৭৬টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে হাজার হাজার প্রবাসী শ্রমিক কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। অনেকের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন।
যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে নতুন শ্রমিক পাঠানো বন্ধ হয়ে যেতে পারে, যার ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিপূর্বে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে যুদ্ধের প্রভাবে কয়েকজন বাংলাদেশি হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যা প্রবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে।
তৈরি পোশাক খাতের কাঁচামাল আমদানি এবং ইউরোপ-আমেরিকায় পণ্য রপ্তানির জন্য সুয়েজ খাল ও হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।সমুদ্রপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় বিমা প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়া ৩০-৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে।
ডলার সংকট এবং কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্বের কারণে দেশের শিল্প উৎপাদন কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমানের নাজুক অর্থনীতিতে এই যুদ্ধ একটি বড় ধাক্কা। সরকার যদি দ্রুত বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি নিশ্চিত করতে না পারে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়, তবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাবে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, দেশে বর্তমানে প্রায় ৪০ দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে, যা সাময়িকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সাহায্য করবে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ নয়, এটি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য একটি বড় অর্থনৈতিক পরীক্ষা। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট দফতরগুলোকে এখনই বিকল্প পরিকল্পনা ও কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে হবে।