"মানুষ বড় অসহায় হলে তবেই দেশ ছাড়ে। পেটের দায়ে আর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য হাড়ভাঙা খাটুনি দিতে আমরা প্রবাসে আসি। কিন্তু বিদেশের মাটিতে পা রাখার পর যখন আমাদের সাথে প্রতারণা হয়, তখন সেই কষ্টের ভাগ নেওয়ার কেউ থাকে না।" কথাগুলো বলছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মরত এক বাংলাদেশি কর্মী।
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় কৃষি, মৎস্য এবং শিল্প খাতে হাজার হাজার বাংলাদেশি কর্মী সরকারিভাবে (বোয়েসেল-এর মাধ্যমে) কর্মরত আছেন। কিন্তু এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জীবনের গল্পটা সবসময় মসৃণ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে প্রবাসীদের একটি বড় অংশ অভিযোগ করছেন যে, কোম্পানিগুলো চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করলেও সরকারি সংস্থাগুলো তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে না।
চুক্তি বনাম বাস্তবতা
অনেক কর্মী অভিযোগ করেছেন যে, বাংলাদেশ থেকে যে বেতন এবং ওভারটাইমের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের আনা হয়, কোরিয়ায় আসার পর তার প্রতিফলন দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে মালিক পক্ষ চুক্তি অনুযায়ী কাজ করায় না, আবার ঠিকমতো বেতন বা ওভারটাইমও দেয় না। নিরুপায় হয়ে যখন একজন কর্মী কোম্পানি পরিবর্তন করতে চান, তখন তাকে 'অবাধ্য' বা 'খারাপ কর্মী' হিসেবে তকমা দেওয়া হয়।
বোয়েসেল-এর ভূমিকা ও কর্মীদের আক্ষেপ
বাংলাদেশি এজেন্সিগুলো এবং বোয়েসেল প্রায়ই বলে থাকে যে, কর্মীরা কোরিয়ায় গিয়ে ঠিকমতো কাজ করে না বা কোম্পানি পরিবর্তন করে। কিন্তু কোনো সংস্থা কি কখনও গভীরভাবে খতিয়ে দেখেছে যে, কেন একজন কর্মী তার বৈধতা হারানোর ঝুঁকি নিয়ে কোম্পানি ছাড়ছে? যখন একজন মালিক অমানবিক আচরণ করেন, গালিগালাজ করেন কিংবা প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন, তখন ওই কর্মীর সামনে পালানো ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না।
অবৈধ হওয়ার নেপথ্যে
ফ্যামিলির চাহিদা এবং পেটের দায়ে অনেক সময় কর্মীরা অবৈধ (Undocumented) হয়ে যান। তারা জানেন এতে জীবনের ঝুঁকি আছে, কিন্তু শূন্য হাতে দেশে ফেরার চেয়ে বিদেশের মাটিতে লুকিয়ে কাজ করাকেই তারা বেছে নেন। সরকারের পক্ষ থেকে যদি সময়মতো আইনি সহায়তা বা কোম্পানি পরিবর্তনের সহজ সুযোগ থাকতো, তবে এই অবৈধ হওয়ার হার অনেক কমতো।
মৃতদেহের হাহাকার ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, কোনো কর্মী দুর্ঘটনায় মারা গেলে কিংবা অসুস্থ হলে অনেক সময় তার লাশ দেশে পাঠানোর মতো লোক খুঁজে পাওয়া যায় না। পরিবারের খরচ চালাতে গিয়ে সঞ্চয় করা টাকাগুলো নিঃশেষ হয়ে যায়, অথচ কঠিন সময়ে সরকারি কোনো বিশেষ তহবিল বা উদ্যোগের দেখা মেলে না। প্রবাসীরা আজ দেশের চাকা সচল রাখলেও, তাদের বিপদে রাষ্ট্রকে যতটুকু পাশে পাওয়ার কথা ছিল, তা অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান নয়।
উপসংহার
প্রবাসীরা কাজ করতে জানে, তারা কঠোর পরিশ্রমী এবং সম্মান নিয়ে বাঁচতে চায়। তারা চায় না কোনো দালালের খপ্পরে পড়ে জীবন নষ্ট করতে। সরকারের উচিত প্রতিটি কর্মীর খোঁজ রাখা—কে কোথায় আছে, কী সমস্যায় আছে। সরকারি এজেন্সিগুলোর যদি সঠিক তদারকি থাকতো, তবে আজ প্রবাসী জীবন এতোটা বিষাদময় হতো না।
রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের শুধু 'টাকা পাঠানোর যন্ত্র' না ভেবে তাদের মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তবেই ধন্য হবে প্রবাস জীবন, সার্থক হবে প্রবাসীদের ত্যাগ।