অতিরিক্ত তারল্য বেড়েছে ৪৪ দশমিক ২৭ শতাংশ

কেএম শরীফ ইমতিয়াজ

বাণিজ্য

ব্যাংকে নগদ টাকা পাহাড় কিন্তু নতুন কারখানা হচ্ছে না এবং কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে না। অনিশ্চয়তা আর আস্থার ঘাটতিতে থমকে আছে

2026-06-24T12:45:15+00:00
2026-06-24T12:47:04+00:00
  বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬,
১১ আষাঢ় ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
বাণিজ্য
ব্যাংকে জমছে অলস টাকার পাহাড়
অতিরিক্ত তারল্য বেড়েছে ৪৪ দশমিক ২৭ শতাংশ
কেএম শরীফ ইমতিয়াজ
বুধবার, ২৪ জুন, ২০২৬, ১২:৪৫ পিএম  আপডেট: ২৪.০৬.২০২৬ ১২:৪৭ পিএম
সংগৃহীত ছবি
ব্যাংকে নগদ টাকা পাহাড় কিন্তু নতুন কারখানা হচ্ছে না এবং কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে না। অনিশ্চয়তা আর আস্থার ঘাটতিতে থমকে আছে অর্থনীতির চাকা। বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় টাকার কোনো ঘাটতি নেই। বরং ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা টাকার পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যে অনেক ক্ষেত্রে সেই টাকা বিনিয়োগের উপযুক্ত খাত খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। ব্যাংকিং খাতে অলস টাকার পাহাড় জমছে। কিন্তু বাড়ছে না বড় কোনো বিনিয়োগ। 

নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর রাজনৈতিতে স্থিতিশীলতা ফিরে এলেও শিল্প উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না। কাগজে-কলমে হিসাব করলে ধারণা হয়, ব্যাংকিং খাত যেন আবার স্থিতিশীলতার পথে ফিরছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন এক চিত্র সামনে আসে। 

বিপুল পরিমাণ তারল্য থাকা সত্ত্বেও সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হচ্ছে না। ফলে আপাত ব্যাংকখাত নিয়ে যে স্বস্তি বাইরে থেকে দৃশ্যমান, তার গভীরেই লুকিয়ে আছে অচলাবস্থা ও অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত।

কারণ, এই টাকা ঘুরছে না। নতুন কোনো কারখানা গড়ে উঠছে না। কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ব্যাংকে জমা টাকা সংখ্যার দিক থেকে শক্তিশালী, কিন্তু বাস্তব অর্থনীতিতে নিষ্ক্রিয়। দেশে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগের গতি কার্যত স্থবির হয়ে আছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে ব্যাংকগুলোর তারল্য পরিস্থিতিতে। প্রয়োজনীয় সংরক্ষিত সম্পদের বাইরে ব্যাংকগুলোর হাতে জমা থাকা অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। 

তথ্যমতে, বর্তমানে ব্যাংক ব্যবস্থায় উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। এক বছর আগে একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকার মতো। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়েছে প্রায় ৪৪ দশমিক ২৭ শতাংশে। 

এর বড় অংশই সীমিত সংখ্যক ব্যাংকের হাতে কেন্দ্রীভূত রয়েছে এবং সরকারের ঋণ চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে অনিয়ম ও লুটপাটের স্বীকার হওয়া বেশকিছু ব্যাংক এখনও তারল্য সংকটে এবং বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা নেই। 

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন শিল্প স্থাপন বা উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করেন। কিন্তু ত্রয়োদশ নির্বাচনের আগে ও পরের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, খেলাপিঋণ বৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং শিল্প খাতে নতুন উদ্যোগের ধীরগতির কারণে বেসরকারিতে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোর হাতে অর্থ জমে থাকছে। 

নিয়মানুযায়ী, দেশের ব্যাংকগুলোকে নগদ জমার হার (সিআরআর) এবং সহজে বিনিময়যোগ্য সম্পদ (এসএলআর) নামে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়। এ দুই উপায়ে রাখা অর্থ ব্যাংকের তরল সম্পদ হিসেবে গণ্য। ফলে ব্যাংকগুলোকে মোট আমানতের ৪ শতাংশ সিআরআর এবং ১৩ শতাংশ এসএলআর আকারে জমা রাখতে হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, সিআরআর ও এসএলআর বাবদ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ব্যাংকগুলোর জমা আছে প্রায় ৭ লাখ ২ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা। কিন্তু এ সময় পর্যন্ত রাখার প্রয়োজন ছিল ৩ লাখ ১৯ হাজার ৫১১ কোটি টাকা। এর মানে অতিরিক্ত তারল্য ছাড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৪৩৩ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে অতিরিক্ত তারল্য বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা বা ৪৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। 

বেসরকারি শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ বলেন, ব্যাংক খাতে যে উদ্বৃত্ত তারল্যের চিত্র দেখা যাচ্ছে, সেটি পুরো খাতের বাস্তব অবস্থা পুরোপুরি তুলে ধরে না। কারণ অতিরিক্ত তারল্যের বড় অংশ সীমিত সংখ্যক ব্যাংকের হাতে কেন্দ্রীভূত রয়েছে। অনেক ব্যাংক এখনও তারল্য সংকটে রয়েছে এবং বড় অঙ্কের নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা তাদের নেই। 

তিনি বলেন, দেশে বেসরকারি বিনিয়োগের গতি কমে যাওয়ার পেছনে শুধু ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে অনীহা দায়ী নয়; বরং ব্যবসায়িক পরিবেশও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্যের বড় অংশ নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে খাটানো হয়েছে। 

অর্থাৎ ব্যাংকগুলোর হাতে থাকা অতিরিক্ত অর্থ পুরোপুরি অলস পড়ে নেই; বরং এর বড় অংশ সরকারের ঋণ চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে এসব বিনিয়োগ থেকে ব্যাংকগুলো উল্লেখযোগ্য আয়ও করছে। 

গত বছর ভালো ব্যাংকগুলো যে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করেছে, তার একটি বড় অংশ সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে অর্জিত হয়েছে। 

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকের জন্য এটি স্বল্পমেয়াদে লাভজনক হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির জন্য খুব ইতিবাচক নয়। কারণ ব্যাংকের প্রধান কাজ হচ্ছে জনগণের সঞ্চয়কে উৎপাদন ও ব্যবসা সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করা। কিন্তু বড় অংশের অর্থ যদি নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিতে চলে যায়, তাহলে বেসরকারি খাতে অর্থপ্রবাহ কমে যেতে পারে। 

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আস্থার সংকটের কারেণ উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে এগিয়ে আসছে। এছাড়া রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলেও এটাকে বেশির ভাগ মানুষই সাময়িক অবস্থা মনে করছে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে এগিয়ে আসছেন না কেউই। পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের চড়া সুদের হারও এর জন্য দায়ী। 

তার মতে, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ ফিরাতে সরকার এখনো লক্ষণীয় কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে একদিকে বিনিয়োগ বাড়ছে না অন্যদিকে ব্যাংকে অলস টাকার পাহাড় জমছে।

কেন্দ্রয়ী ব্যাংকের তথ্য বলছে, বর্তমানে বেসরকারি খাতে ঋণের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে, যা আগের বছর এ সময় ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। এই প্রবৃদ্ধি এ যাবতকালের সর্বনিম্ন। 

ব্যবসায়ীদের মতে, বিনিয়োগে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ সুদহার। বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদ ১৪-১৫ শতাংশ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি খাতে অনিশ্চয়তা। ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে, অথচ ভোক্তা চাহিদা সেই তুলনায় বাড়েনি। এই বাস্তবতায় নতুন কারখানা স্থাপন বা উৎপাদন সম্প্রসারণে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না উদ্যোক্তারা। 

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বর্তমানে ব্যাংক ঋণের সুদহার অনেক বেশি। এই সুদে উৎপাদন ও বিনিয়োগ টেকসই রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয় বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রভাব। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছে। 


Loading...
Loading...

বাণিজ্য- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: