যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। তাঁর দাবি, সামরিক সক্ষমতার পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সফট পাওয়ার বা প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতাও অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
৪ নভেম্বর ‘আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয় দিবস’ ও ইরানের ‘জাতীয় শিক্ষার্থী দিবস’ উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় এসব কথা বলেন তিনি।
১৯৭৯ সালের ৪ নভেম্বর ইরানি শিক্ষার্থীদের হাতে তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখলের ঘটনাকে স্মরণ করে প্রতিবছর দিনটি পালন করা হয়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে ইরানের অবস্থান ও প্রতিরোধের ইতিহাসও এ দিবসের আলোচনায় গুরুত্ব পায়।
বার্তায় মোজতবা খামেনি বলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। তাঁর ভাষায়, সত্য ও মিথ্যা এবং নিপীড়িত ও নিপীড়কদের মধ্যকার সংঘাতের ধারাবাহিকতাই এ ইতিহাসের মূল বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের বৈরী অবস্থানের মুখে ইরানের প্রতিরোধের ইতিহাস ভবিষ্যৎ পথচলার দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান থেকে নিষেধাজ্ঞা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিরোধের সূচনা ১৯৫৩ সালের ১৯ আগস্টের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বলে উল্লেখ করেন খামেনি। তাঁর অভিযোগ, ইরানের জাতীয় সম্পদ, বিশেষ করে তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠাই ছিল ওই অভ্যুত্থানের অন্যতম উদ্দেশ্য।
পরবর্তী সময়ে ইরানের তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীকে টিকিয়ে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিপ্লবের পরও ওয়াশিংটনের বৈরিতা বন্ধ হয়নি বলে দাবি করেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা।
এ প্রসঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে সমর্থন, অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র, ইরান-ইরাক যুদ্ধে বাথ সরকারের প্রতি সহযোগিতা, ইরানের যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার মতো ঘটনাগুলো তুলে ধরেন তিনি।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নিয়েছে বলে অভিযোগ করেন খামেনি। এসব ঘটনায় ইরানের বিজ্ঞানী, সামরিক কর্মকর্তা ও বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
হরমুজ প্রণালি ও মার্কিন সামরিক শক্তি নিয়ে মন্তব্য
পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে বর্ণনা করেন খামেনি।
তাঁর দাবি, আঞ্চলিক সংঘাতে ইরানের প্রতিরোধ এবং মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে নেওয়া পদক্ষেপ ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক প্রভাবকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন চালালে তেহরানের জবাব আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে বিদেশি শক্তির ওপর নির্ভরশীল আঞ্চলিক দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
প্রতিরোধ জোটের ভূমিকার কথা তুলে ধরলেন
ফিলিস্তিন, লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনের বিভিন্ন প্রতিরোধপন্থী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের কথাও নিজের বার্তায় তুলে ধরেন খামেনি।
তাঁর মতে, এসব গোষ্ঠীর প্রতিরোধমূলক অবস্থান বিশ্বরাজনীতিতে নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি বলেন, আত্মবিশ্বাস, আত্মত্যাগ ও ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে প্রতিরোধ অব্যাহত থাকলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রভাব কমে আসবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে সতর্কবার্তা
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে দেশটির ইরানবিরোধী নীতির পরিবর্তন হবে—এমন ধারণার বিরোধিতা করেন মোজতবা খামেনি।
তিনি বলেন, মার্কিন প্রশাসনের পরিবর্তন হলেও ইরানের প্রতি ওয়াশিংটনের মৌলিক অবস্থান বদলাবে না। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছ থেকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ চায়।
খামেনির সতর্কবার্তা, যুক্তরাষ্ট্রের সামনে সামান্য ছাড় দেওয়ার মানসিকতাও ইরানের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও অর্জনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বরং এতে ভবিষ্যতে আরও আগ্রাসনের ঝুঁকি বাড়বে।
শক্তিশালী ইরান গড়ার আহ্বান
বার্তার শেষাংশে জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সংহতি ও আত্মরক্ষার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। তাঁর মতে, শক্তিশালী ইরান গড়ে তোলার পাশাপাশি জনগণের কল্যাণে সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা দেশের সাফল্যের অন্যতম ভিত্তি।
তরুণ ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি হতাশা কাটিয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আত্মবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে উন্নত ভবিষ্যৎ নির্মাণের আহ্বান জানান।
আল্লাহর রহমতে ইরানি জাতি ভবিষ্যতে বিজয় ও সমৃদ্ধি অর্জন করবে এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রভাব আরও কমবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।