
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রকাশিত নির্বাচনী ফল অনুযায়ী, ৪৩৫ সদস্যের প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ২১৮টি আসন। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটরা প্রয়োজনীয় আসনসংখ্যা নিশ্চিত করেছে। অন্যদিকে, রিপাবলিকানরা পিছিয়ে রয়েছে। তবে সব আসনের ভোট গণনা শেষ না হওয়ায় দুই দলের আসনসংখ্যার চূড়ান্ত ব্যবধান এখনো নির্ধারিত হয়নি।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। সাউথ ক্যারোলিনা, নর্থ ক্যারোলিনা, টেক্সাস, ওহাইও ও কানসাসের মতো রিপাবলিকান-প্রধান অঙ্গরাজ্যেও দলটির প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন। এসব রাজ্যের কয়েকটিতে দীর্ঘদিন ধরে ডেমোক্র্যাটদের জয় ছিল বিরল ঘটনা।
সাউথ ক্যারোলিনায় রিপাবলিকান প্রার্থী ডারলেইন গ্রাহামকে হারিয়ে সিনেট আসনটি পুনরুদ্ধার করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। নর্থ ক্যারোলিনায় সাবেক গভর্নর রয় কুপার পরাজিত করেছেন রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলিকে। টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো হারিয়েছেন রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে।
এ ছাড়া ওহাইওতে রিপাবলিকান সিনেটর জন হাস্টেডকে পরাজিত করে আসনটি নিজেদের দখলে নিয়েছেন ডেমোক্র্যাট শেরউড ব্রাউন। কানসাসে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটন। এসব ফলের মধ্য দিয়ে রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দুর্গ হিসেবে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গরাজ্যেও দলটির অবস্থানে পরিবর্তন এসেছে।
অন্যদিকে, নিজেদের দখলে থাকা গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোও ধরে রেখেছে ডেমোক্র্যাটরা। জর্জিয়ায় সিনেটর জন অসফ পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। ভার্জিনিয়ায় নিজের আসন ধরে রেখেছেন দীর্ঘদিনের সিনেটর মার্ক ওয়ার্নার।
২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ের পর প্রেসিডেন্টের পদ, সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাকেন্দ্রই নিয়ন্ত্রণে ছিল রিপাবলিকানদের। মার্কিন রাজনীতিতে এই অবস্থাকে ‘ট্রাইফেক্টা’ বলা হয়। মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ফলে সেই একক নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটছে।
প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসনে প্রতি দুই বছর পর নির্বাচন হয়। অন্যদিকে, সিনেটের সদস্যদের মেয়াদ ছয় বছর এবং প্রতি দুই বছর পর মোট আসনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে ভোট হয়। এবারের নির্বাচনে সিনেটের নিয়মিত ৩৩টি আসনের পাশাপাশি দুটি বিশেষ আসনেও ভোট হয়েছে। ২০২৫ সালে ট্রাম্প প্রশাসনে যোগ দেওয়ার পর তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সিনেটের সদস্যপদ ছেড়ে দেওয়ায় ওই দুটি বিশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পেছনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক, ইরান যুদ্ধ এবং তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ ভূমিকা রেখেছে।
সিএনএনের ভোটার জরিপেও ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষের চিত্র উঠে এসেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ১০ জনের মধ্যে ছয়জনের বেশি তাঁর কর্মকাণ্ড অনুমোদন করেননি। তাঁদের বড় একটি অংশ তীব্র অসন্তোষের কথাও জানিয়েছেন। এ ছাড়া জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটারের ধারণা, ট্রাম্পের নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।
কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর নজরদারি ও তদন্তের সুযোগ বাড়বে। প্রতিনিধি পরিষদের বিভিন্ন কমিটি প্রশাসনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করতে পারবে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শুনানিতে হাজির করার জন্য সমনও জারি করতে পারবে।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হবে ডেমোক্র্যাটদের। বিশেষ করে ফেডারেল আদালত ও সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের মনোনীত প্রার্থীদের অনুমোদন আটকে দিতে বা বিলম্বিত করতে পারবে তারা।
তবে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেই ডেমোক্র্যাটদের সব রাজনৈতিক ও নীতিগত কর্মসূচি বাস্তবায়ন সহজ হবে না। কারণ, প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের হাতে আইন ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। আবার সিনেটে অধিকাংশ আইন পাসের ক্ষেত্রে ৬০ ভোটের সমর্থন প্রয়োজন হয়। ফলে আইন প্রণয়নে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতার প্রয়োজন হতে পারে।
সব মিলিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রেসিডেন্টের পদ রিপাবলিকানদের হাতে থাকলেও কংগ্রেসের দুই কক্ষ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আগামী দুই বছর আইন প্রণয়ন, বিচারক নিয়োগ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে।