
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বড় ধরনের ক্ষমতার পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল। রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত একাধিক অঙ্গরাজ্যে জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে সাফল্যের মধ্য দিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের পথে এগিয়েছে দলটি।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার রাতে প্রকাশিত নির্বাচনী ফলাফলে সাউথ ক্যারোলিনা, নর্থ ক্যারোলিনা, টেক্সাস, ওহাইও ও কানসাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের জয় দলটির অবস্থান শক্তিশালী করেছে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরে পেতে প্রয়োজনীয় চারটি আসন নিজেদের অনুকূলে নেওয়ার দাবি করা হয়েছে নির্বাচনী ফলাফলে।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে আলোচিত ফল এসেছে সাউথ ক্যারোলিনা ও টেক্সাসে। ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের প্রভাবশালী এলাকা হিসেবে পরিচিত এই দুই অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের জয় মার্কিন রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।
সাউথ ক্যারোলিনায় রিপাবলিকান প্রার্থী ডারলেইন গ্রাহামকে হারিয়ে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও চিকিৎসক অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। প্রায় তিন দশক পর অঙ্গরাজ্যটিতে সিনেট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এই জয়কে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর আগে ১৯৯৮ সালে সর্বশেষ ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সেখানে সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছিলেন।
নর্থ ক্যারোলিনায় সাবেক গভর্নর রয় কুপার রিপাবলিকান প্রার্থী মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করে সিনেটের আসনটি দখলে নিয়েছেন। অন্যদিকে টেক্সাসে অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস টালারিকো। রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাসে এই ফল বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। অঙ্গরাজ্যটিতে ১৯৯৪ সালের পর কোনো ডেমোক্র্যাট রাজ্যব্যাপী নির্বাচনে জয় পাননি।
ওহাইওতেও ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান সিনেটর জন হাস্টেডকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী শেরউড ব্রাউন। একইভাবে কানসাসে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে হারিয়ে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও মেগাচার্চের যাজক অ্যাডাম হ্যামিলটন।
সিনেটের বিদায়ী ১১৯তম কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের আসন ছিল ৫৩টি। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের ছিল ৪৫টি। এ ছাড়া দুই স্বতন্ত্র সিনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে একই ককাসে যুক্ত ছিলেন। নতুন নির্বাচনী ফলাফলে সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমীকরণ বদলে যাচ্ছে।
এর ফলে ওয়াশিংটনে রিপাবলিকানদের একক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ের পর প্রেসিডেন্টের পদ, সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ—তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাকেন্দ্রই নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল রিপাবলিকান পার্টি। মার্কিন রাজনীতিতে এই অবস্থাকে 'ট্রাইফেক্টা' বলা হয়।
তবে প্রতিনিধি পরিষদের তুলনায় সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনকে বেশি কঠিন মনে করা হয়েছিল। কারণ, দুই কক্ষের নির্বাচনব্যবস্থায় রয়েছে মৌলিক পার্থক্য। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হলেও সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর। ফলে প্রতি দুই বছর অন্তর সিনেটের মোট আসনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
এবার সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩টি ছিল নিয়মিত নির্বাচন। পাশাপাশি ওহাইও ও ফ্লোরিডায় অনুষ্ঠিত হয়েছে দুটি বিশেষ নির্বাচন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রশাসনে যোগ দেওয়ার পর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সিনেটের সদস্যপদ ছেড়ে দেওয়ায় ওই দুটি আসনে বিশেষ নির্বাচনের প্রয়োজন হয়।
নির্বাচনের আগে আলাস্কা, আইওয়া, কানসাস, মেইন, ওহাইও, টেক্সাস ও মিশিগান—এই সাতটি অঙ্গরাজ্যের সিনেট আসন ঘিরে বিশেষ নজর ছিল। এর মধ্যে কানসাস ও টেক্সাসকে রিপাবলিকানদের নিরাপদ আসন হিসেবে বিবেচনা করা হতো। কানসাসে ১৯৩২ সালের পর কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হননি।
অন্যদিকে নিজেদের দখলে থাকা আসনগুলোও ধরে রেখেছে ডেমোক্র্যাটরা। সুইং স্টেট হিসেবে পরিচিত জর্জিয়ায় পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন সিনেটর জন অসফ। ভার্জিনিয়ায় নিজের আসন ধরে রেখেছেন দীর্ঘ ১৭ বছর সিনেটে দায়িত্ব পালন করা মার্ক ওয়ার্নার।
সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভায় ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলে গেলে আইন প্রণয়ন, প্রশাসনের ওপর নজরদারি এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নিয়োগ অনুমোদনের ক্ষেত্রে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের মুখোমুখি হতে হবে হোয়াইট হাউসকে।