যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় নির্বাচিত হয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নারী আবের কাওয়াস। অঙ্গরাজ্যটির আইনসভায় প্রথম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। বিজয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে কাওয়াস লিখেছেন, ‘আমরা ইতিহাস গড়েছি।’
কে এই আবের কাওয়াস?
আবের কাওয়াস একজন পরিচিত কমিউনিটি সংগঠক ও ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার (ডিএসএ) সদস্য। রাজনীতিতে আসার আগে দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে শ্রমিক অধিকার, অভিবাসীদের স্বার্থ এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করেছেন তিনি।
গত জুনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে জয়লাভের মধ্য দিয়ে সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ তৈরি করেন কাওয়াস।
ব্রুকলিনে বেড়ে ওঠা, শৈশবেই নানা প্রতিকূলতা
নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে জন্ম ও বেড়ে ওঠা কাওয়াসের। তার বাবা-মা ফিলিস্তিনি অভিবাসী। ১৯৯০-এর দশকে তারা যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।
কাওয়াসের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকেই তার শৈশবের নিরাপত্তাবোধে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। ওই সময় মুসলিম পরিবারগুলোর মধ্যে সরকারি নজরদারি ও বহিষ্কারের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
হাই স্কুলে পড়ার সময় তার বাবাকে জর্ডানে বহিষ্কার করা হয়। এ ঘটনায় পরিবারের আর্থিক অবস্থারও অবনতি ঘটে। জীবনের এসব অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে তার অধিকারভিত্তিক রাজনৈতিক অবস্থান গঠনে ভূমিকা রাখে।
যে আন্দোলন থেকে রাজনীতিতে উত্থান
২০২৩ সালে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখলদারত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন বন্ধে স্থানীয় সরকারকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেন একদল অধিকারকর্মী। সেই উদ্যোগে যোগ দেন কাওয়াস।
নিউইয়র্কের দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ইসরায়েলি বসতি-সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন করতে না পারে, সে লক্ষ্যে একটি বিলের পক্ষে প্রচার চালান তিনি ও তার সহকর্মীরা।
অঙ্গরাজ্যের সিনেটর জাবারি ব্রিসপোর্ট বিলটি উত্থাপন করেন। তৎকালীন অ্যাসেম্বলি সদস্য জোহরান মামদানি এর খসড়া তৈরিতে সহযোগিতা করেন। তবে আইনপ্রণেতাদের বিরোধিতার কারণে শেষ পর্যন্ত বিলটি পাস হয়নি।
এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই স্থানীয় রাজনীতিতে কাওয়াসের সক্রিয়তা আরও বাড়ে।
নির্বাচনী প্রচারে যেসব প্রতিশ্রুতি
‘মর্যাদায় অর্থায়ন, ধ্বংসের বিরুদ্ধে লড়াই’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে নির্বাচনী প্রচার চালান কাওয়াস।
তার প্রতিশ্রুতির মধ্যে ছিল সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ বাড়ানো। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও যুদ্ধের পেছনে অর্থায়নের বিরোধিতায় সোচ্চার ছিলেন তিনি।
অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলোর সঙ্গে অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় সরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা বন্ধে প্রস্তাবিত ‘নিউইয়র্ক ফর অল অ্যাক্ট’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও দেন কাওয়াস।
বিক্ষোভে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার
সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহণের কারণেও আলোচনায় এসেছেন কাওয়াস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নিউইয়র্ক সফরের প্রতিবাদে আয়োজিত এক বিক্ষোভে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। পরে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
সম্প্রতি নজরদারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কগনাইটের সঙ্গে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের (এনওয়াইপিডি) ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলারের চুক্তিরও বিরোধিতা করেন কাওয়াস। নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলোর আপত্তির মুখে গত সপ্তাহে ওই চুক্তি থেকে সরে আসে পুলিশ বিভাগ।
সমর্থনে ছিলেন বার্নি স্যান্ডার্স ও রাশিদা তালিব
নির্বাচনী লড়াইয়ে কাওয়াসের পাশে ছিলেন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট নেতা ও সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, কংগ্রেস সদস্য রাশিদা তালিব এবং নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি।
গত বছর নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে মামদানির বিজয়ের পর এবার কাওয়াসের জয়ও অঙ্গরাজ্যটির রাজনীতিতে ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার প্রভাব বিস্তারের নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
শ্রমিক অধিকার, অভিবাসী মানুষের স্বার্থ এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর এবার আইনসভায় জায়গা করে নিলেন কাওয়াস। তার এই বিজয় নিউইয়র্কের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি