জীবনে অনেক জল দেখেছি। নদী দেখেছি, সমুদ্র দেখেছি, বর্ষার উচ্ছ্বসিত স্রোত দেখেছি। কিন্তু একটি নদী যখন হঠাৎ করে নিজেকে আকাশের কিনারা থেকে ছুড়ে দেয়, পৃথিবীর বুক কাঁপিয়ে কয়েক লাখ গ্যালন পানি যখন একসঙ্গে এক বিশাল সাদা পর্দার মতো নিচে পতিত হয়, তখন সেই দৃশ্যের কাছে “সুন্দর” শব্দটিও বোধকরি কম হয়ে যায়। শব্দেরা অপ্রতুল হয়ে যায়। যাকে শুধু অনুভব করতে হয় চুপ করে!!
কোনো কোনো সৌন্দর্যের সামনে পৌঁছানোর আগেই তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। নায়াগ্রাও ঠিক তাই। দূর থেকেই কানে আসতে শুরু করে একটানা গর্জন। প্রথমে মৃদু, তারপর একটু স্পষ্ট, তারপর যেন চারপাশের সমস্ত শব্দকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে নেওয়া এক বিশাল আওয়াজ। জলের পতনের শব্দকে একসময় আর শব্দ বলে মনে হয় না। মনে হয়, সেটিই এই জায়গার ভাষা!!
জলপ্রপাতের কাছাকাছি গেলে চারপাশের দৃশ্য আরও রহস্যময় হয়ে ওঠে। বাতাসে জলকণার ঘনত্ব বাড়ে। দূরের দৃশ্য কখনো পরিষ্কার, কখনো অস্পষ্ট। এক মুহূর্তে মনে হয়, সামনে সবকিছু স্পষ্ট, পরের মুহূর্তেই কুয়াশা এসে জলপ্রপাতের একটা অংশ ঢেকে দেয়। এটি শুধু চোখের দৃশ্য নয়। এটি বাতাসের অভিজ্ঞতা, কানের অভিজ্ঞতা, ত্বকের অভিজ্ঞতা। মুখে এসে পড়ে ঠান্ডা পানির ছিটে। চুল ভিজে যায়, পোশাকে জমে আর্দ্রতা। চারপাশে ভেসে বেড়ায় সূক্ষ্ম জলকণা। তারপর সূর্যের আলো এসে সেই জলকণার ভেতর দিয়ে তৈরি করে বেনীআসহকলার একটি ক্ষণস্থায়ী রঙের সেতু। নায়াগ্রার গর্জনের পাশে রংধনুটি সম্পূর্ণ বিপরীত এক ভাষায় কথা বলে!! ঠিক যেন প্রকৃতি তার এত গর্জন, এত উন্মত্ততার মাঝেও একটুখানি কোমলতার জায়গা রেখে দিয়েছে!! একদিকে প্রচন্ড শক্তিতে নিচে নেমে আসা জল, অন্যদিকে সূর্যের আলো আর অসংখ্য ক্ষুদ্র জলকণার মিলনে তৈরি সাত রঙের এক নীরব বাঁক। সাদা জলরাশির পাশে সাত রঙের সেই বাঁক যেন নায়াগ্রার একটুখানি হাসি। কিছুক্ষণ থাকে। তারপর মিলিয়ে যায়। আবার আসে। আবার হারিয়ে যায়। তাকে ধরে রাখা যায় না, কাছে যাওয়া যায় না, ছুঁয়ে দেখা যায় না। সূর্যের আলো একটু বদলালেই তার রং বদলে যায়। বাতাসের গতিপথ পাল্টালেই তার আকৃতি অস্পষ্ট হয়ে আসে। রংধনুটি আমাদের জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলোর মতই, ক্ষণিকের বলেই হয়ত এত সুন্দর!!
নায়াগ্রা কখনো একা থাকে না। সেখানে থাকে জগতের নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষ। কারও প্রথমবার, কারও হয়তো দশমবার বা আরো বেশি !! কারও হাতে ক্যামেরা, কারও হাতে ফোন, কারও কোলে শিশু, কারও হাতে প্রিয়জন কিংবা অপ্রিয়জনের হাত!! এত মানুষ একই দৃশ্য দেখতে আসে, অথচ প্রত্যেকের কাছে এই মুহূর্তের গল্প আলাদা...!! কারও কাছে এটি পরিবারের স্মৃতি, কারও কাছে বন্ধুত্বের গল্প, কারও কাছে বহুদিনের স্বপ্নপূরণ, আবার কারো কাছে প্রকৃতির সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ক্ষুদ্রতাকে নতুন করে উপলব্ধি করার মুহূর্ত। তবে সেই ক্ষুদ্রতা কিন্তু অপমানের নয়, বরং বিনয়ের!! নায়াগ্রার প্রচন্ড শব্দের মধ্যেও এক ধরনের গভীর নীরবতা আছে। জলের গর্জন এত প্রবল যে অন্য সব শব্দকে ঢেকে দেয়। মানুষের কথা, গাড়ির শব্দ, ক্যামেরার ক্লিক, এমনকি আমাদের সাফল্য, ব্যর্থতা, অভিমান, অপেক্ষা সবকিছুর প্রবল ঝংকারকে কিছুক্ষণের জন্য নীরব করে দেয়। কত বছর ধরে পড়ে চলছে এই নায়াগ্রা। থামেনি। সে শুধু পড়েই চলেছে। অবিরাম। অবিচল। তার কোনো বিরতি নেই, কোনো ক্লান্তি নেই। এই জলপ্রপাতের মতই আমাদেরও কিছু অব্যক্ত বিষাদের ধারা কখনো থামে না, শুধু রূপ পাল্টে একসময় তা দৃশ্যমান সৌন্দর্যের ছদ্মবেশ হয়ে ওঠে !! নায়াগ্রা গর্জায়, উন্মাদ গতিতে বয়ে চলে...যেভাবে বয়ে চলে অনেকের বেদনা তবে নিঃশব্দে!! প্রকৃতি নিজের ব্যথা ঢেকে রাখে সৌন্দর্যে, আর আমরা...??? মুখের হাসিতে!!
আলো বদলায়, ঋতু বদলায়, প্রজন্ম বদলায়, কিন্তু নায়াগ্রা চলে তার নিজস্ব ছন্দে। আর আমরা তো আসি ক্ষণিকের দর্শক হয়ে, জগতে মাত্র কয়েক দশকের জন্য!!