রাজনৈতিক অঙ্গনে টানটান উত্তেজনার মধ্যে বিরোধীদের উদ্দেশে এবার সরাসরি কড়া বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে পুঁজি করে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে—এমন অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, অন্যের দিকে আঙুল তোলার আগে নিজেদের ঘরের খবর সামলাতে হবে। তাঁর ভাষায়, ‘নিজের ঘরের লোকেরা কীভাবে নারী নির্যাতন করছে, কীভাবে কী করছে, সেটি আগে সামাল দেন। তারপর অন্যকে কিছু বলতে আসেন।’
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার ফেনীর পরশুরামে মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের উদ্বোধন শেষে আয়োজিত শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে আইন সবার জন্য সমান—এমন বার্তাও দিয়েছেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, ‘কিছু কিছু দুষ্ট মানুষ অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটাচ্ছে। বিএনপিকে যখন এ দেশের মানুষ দায়িত্ব দিয়েছে, বিএনপি তার সর্বশক্তি দিয়ে নিশ্চিত করবে—আইন সবার জন্য সমান।’
তিনি অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক দল বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে সামনে এনে দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। এ সময় তিনি রাজনৈতিকভাবে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আজকে সময় এসেছে আমাদের সতর্ক হওয়ার। সময় এসেছে ভাবার—কাদের কথা বিশ্বাস করব আর কাদের কথা বিশ্বাস করব না।’
বক্তব্যে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী একটি রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করেন। তিনি ১৯৭১ সালে তাদের ভূমিকার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, সেই সময় অন্যায় ও নির্যাতনের সঙ্গে যারা জড়িত ছিল, তাদের কর্মকাণ্ডের কথা মানুষ দেখেছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, বর্তমানে ওই দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে। তবে তদন্তাধীন কোনো বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে চান না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে ওই দলের নেতাদের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, অন্যের সমালোচনা করার আগে নিজেদের ঘরের অনিয়ম ও অভিযোগের দিকে নজর দেওয়া উচিত।
এদিন পরশুরামের ঘাটঘর এলাকায় মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়) প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পে ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ এবং ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাশয় পুনঃখনন করা হবে। পাশাপাশি ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন ও ৭৭টি ইনলেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্প উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী বৃক্ষরোপণ করেন এবং নদী খনন কার্যক্রমেরও উদ্বোধন করেন।
মুহুরী-কহুয়া নদী ও সংশ্লিষ্ট খাল পুনঃখননের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই-আড়াই বছর আগে ভয়াবহ বন্যায় ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের লাখ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কৃষি ও জনজীবনেও ব্যাপক দুর্ভোগ নেমে এসেছিল।
তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে নদী-খাল খননের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কৃষিজমিতে সেচ, পানি নিষ্কাশন এবং মানুষের দৈনন্দিন পানির সুবিধার জন্য নদী-খাল খনন গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় সংসদ সদস্যের দাবির প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলা হাসপাতাল ১৫০ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এর ফলে উপজেলা পর্যায়েই মানুষের জন্য উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে এবং চিকিৎসার জন্য দূরের শহরে যাওয়ার প্রয়োজন কমবে বলে জানান তিনি।
ফেনীর সঙ্গে নিজের পারিবারিক ও শৈশবের স্মৃতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বহু বছর পর তিনি নানাবাড়িতে এসেছেন। ১৯৮৪ সালে প্রথম সেখানে যাওয়ার স্মৃতিও তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশের মানুষের জন্য এবং এলাকার মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। মুহুরী-কহুয়া নদীর পুনঃখনন সেই কাজেরই অংশ।
বক্তব্যের শেষদিকে তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের আন্দোলন হয়েছে। ১৭ বছর মানুষের ভোটের অধিকার ও কথা বলার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের মানুষ সেই শাসনের অবসান ঘটায় এবং চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে দেশের দায়িত্ব দিয়েছে। এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য মানুষের উন্নয়ন ও জনদুর্ভোগ কমানো।