বঙ্গোপসাগরের তলদেশে তেল-গ্যাসের বড় সম্ভাবনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। কিন্তু সম্ভাবনার তুলনায় অনুসন্ধান হয়েছে খুবই কম। একের পর এক উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত সমুদ্র থেকে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য বড় কোনো তেল-গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের খবর নেই। এবার সেই অবস্থার পরিবর্তন করতে নতুন করে মাঠে নেমেছে সরকার। বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি অগভীর সমুদ্রের ব্লক। বাকি ১৫টি গভীর সমুদ্রের। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২৪ মে ২০২৬ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬ শুরু করে পেট্রোবাংলা। দরপত্র জমার শেষ সময় ৩০ নভেম্বর ২০২৬। সফল কোম্পানির সঙ্গে ২০২৬ সালের সংশোধিত অফশোর মডেল প্রোডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্ট বা পিএসসি অনুযায়ী চুক্তি হবে। সরকারের আশা, এবার আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো আগ্রহী হবে। কারণ আগের তুলনায় গ্যাসের দাম, খরচ ফেরত, কর, মুনাফা দেশে আনার সুযোগ এবং অনুসন্ধানে ব্যর্থ হলে ঝুঁকি ভাগাভাগির মতো বিষয়গুলোতে সুবিধা বাড়ানো হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ভালো চুক্তি করলেই হবে না। সমুদ্রে অনুসন্ধানের ঝুঁকি অনেক বেশি। পর্যাপ্ত তথ্য, আধুনিক প্রযুক্তি, গভীর সমুদ্রে ড্রিলিং সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা ছাড়া বড় আবিষ্কার করা কঠিন। জানা গেছে, ২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অধিকারভুক্ত সমুদ্র এলাকা প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। এই বিশাল এলাকায় তেল, গ্যাসসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক সম্পদের সম্ভাবনা রয়েছে। পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, সমুদ্র এলাকা তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ২৬টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি শ্যালো বা অগভীর সমুদ্রের ব্লক। আর ১৫টি ডিপ বা গভীর সমুদ্রের ব্লক। পেট্রোবাংলার ২০২৬ সালের দরপত্রে অগভীর সমুদ্রের ব্লকগুলো হলো— এসএস-১, এসএস-২, এসএস-৩, এসএস-৪, এসএস-৫, এসএস-৬,এসএস-৭, এসএস-৮, এসএস-৯, এসএস-১০ ও এসএস-১১। গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলো হলো-ডিএস-৮ থেকে ডিএস-২২ পর্যন্ত মোট ১৫টি ব্লক।
অগভীর সমুদ্রের ব্লকগুলো উপকূলের তুলনামূলক কাছে। গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলো আরও দূরে। আগের নথি অনুযায়ী, অগভীর সমুদ্রের ব্লকগুলো প্রায় ১৫০ কিলোমিটারের মধ্যে এবং গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলো উপকূল থেকে প্রায় ১৫০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্বে বিস্তৃত। গভীর সমুদ্রের কিছু এলাকায় পানির গভীরতা প্রায় ২ হাজার মিটার পর্যন্ত। বিশেষজ্ঞরা জানান, বাংলাদেশের সমুদ্রে তেল-গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় বাণিজ্যিক আবিষ্কার না হওয়ায় সম্ভাবনাকে নিশ্চিত মজুদ বলা যাবে না। এর পেছনে বড় একটি কারণ হলো বঙ্গীয় অববাহিকার ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকা বিশ্বের অন্যতম বড় গভীর সামুদ্রিক পললভূমির অংশ। এখানে বিপুল পরিমাণ পলি জমেছে। তেল-গ্যাস তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ভূতাত্ত্বিক কাঠামোর উপস্থিতির সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূতাত্ত্বিক ও জ্বালানি তথ্য প্রতিষ্ঠান টিজিএস-এর কর্মকর্তারা বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরকে বিশ্বের অন্যতম বড় অনাবিষ্কৃত ফ্রোন্টিয়ার বেসিন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সমুদ্রভিত্তিক অনুসন্ধান এখনো তুলনামূলকভাবে খুব কম হয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাংলাদেশের পাশের সমুদ্র এলাকায় ভারত ও মিয়ানমার গ্যাস পেয়েছে। একই ধরনের ভূতাত্ত্বিক কাঠামো বাংলাদেশের সমুদ্রসীমাতেও রয়েছে। তাই সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু কোথায় কত গ্যাস আছে, তা জানার জন্য অনুসন্ধান কূপ খনন করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, সিসমিক ছবিতে সম্ভাবনাময় কাঠামো দেখা এক বিষয়। আর সেই কাঠামোর মধ্যে বাণিজ্যিক পরিমাণে তেল বা গ্যাস পাওয়া আরেক বিষয়।
পুরোনো তথ্যেও ছিল সম্ভাবনার ইঙ্গিত : বাংলাদেশের অগভীর সমুদ্র নিয়ে আগের ভূতাত্ত্বিক মূল্যায়নেও গ্যাসের সম্ভাবনা উঠে এসেছে। ইউএস জিয়োজলিক্যাল সার্ভে ও পেট্রোবাংলার যৌথ মূল্যায়নে বাংলাদেশের অগভীর সমুদ্র এলাকায় অনাবিষ্কৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছিল। তবে এসব পুরোনো মূল্যায়নের সময় গভীর সমুদ্রের বর্তমান পর্যায়ের সিসমিক তথ্য ছিল না। ফলে নতুন তথ্য দিয়ে সম্ভাবনা আবার মূল্যায়ন করা জরুরি। এ কারণেই গত কয়েক বছরে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি ছিল সমুদ্রের তলদেশের নতুন সিসমিক তথ্য সংগ্রহ।
সবচেয়ে বড় কাজ সিসমিক জরিপ : ২০২০ সালে পেট্রোবাংলা ও টিজিএস-শ্লামবার্জার অংশীদারত্বে সমুদ্র এলাকায় মাল্টি-ক্লায়েন্ট ২ডি সিসমিক জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল সমুদ্রের ভূতাত্ত্বিক কাঠামো সম্পর্কে উন্নত তথ্য সংগ্রহ করা। প্রথম পর্যায়ে প্রায় ৩২ হাজার লাইন কিলোমিটার সিসমিক ডাটা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর মধ্যে ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১২ হাজার ৬৩৬ লাইন কিলোমিটার ২ডি সিসমিক জরিপ সম্পন্ন হয়। ২০২৪ সালের বিডিংয়ে দেওয়া ২৪টি ব্লকের প্রায় ৭৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় এই জরিপের কাভারেজ ছিল। বিদেশি কোম্পানি কোনো ব্লকে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগের আগে ভূতাত্ত্বিক ঝুঁকি বুঝতে চায়। সিসমিক ডাটা যত ভালো হবে, সম্ভাবনাময় কাঠামো শনাক্ত করা তত সহজ হবে।
টিজিএস-এর কর্মকর্তারা সে সময় বলেছেন, এই ধরনের ডাটা কোম্পানিগুলোকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। তাদের মতে, উন্নত সিসমিক ডাটা অনুসন্ধান শুরু করার সময় কমাতেও সহায়তা করতে পারে। জানা গেছে, ২০২৪ সালে সরকার সমুদ্রের ২৪টি ব্লক নিয়ে আন্তর্জাতিক বিডিং করেছিল। এটি ছিল ২০১২ সালের পর বড় ধরনের প্রথম অফশোর বিডিং উদ্যোগ। তখন ৯টি অগভীর এবং ১৫টি গভীর সমুদ্রের ব্লক দেওয়া হয়েছিল। সাতটি বিদেশি কোম্পানি দরপত্রের কাগজপত্র কিনেছিল।