কিশোর গ্যাং: এক ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি, যেন ঘরে ঘরে জন্ম নিচ্ছে আতঙ্ক

মতামত

গত এক মাসের খবরগুলো পড়লে বুক কেঁপে ওঠে। ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামের গলি—সবখানেই

2026-09-27T18:27:32+00:00
2026-09-27T18:27:32+00:00
  সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩
 
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
কিশোর গ্যাং: এক ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধি, যেন ঘরে ঘরে জন্ম নিচ্ছে আতঙ্ক
-মোহাম্মদ আলী সুমন
রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৬:২৭ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
গত এক মাসের খবরগুলো পড়লে বুক কেঁপে ওঠে। ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামের গলি—সবখানেই একই ছবি। কিশোর গ্যাং। নামে ‘কিশোর’, কাজে ভয়ংকর। ছুরি-চাপাতি হাতে মহড়া, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক—আর এখন হত্যাও। এ যেন এক সামাজিক ক্যান্সার, যা ধীরে ধীরে পুরো জাতির শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে।

সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লায়। গত ১৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান, সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩), মায়ের আইফোন নিয়ে ছবি তুলতে বের হয়ে আর ফেরেনি। পরদিন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় তার রক্তাক্ত মরদেহ। মাথায় ছিল বাঁশের লাঠির আঘাতের চিহ্ন। প্রধান অভিযুক্ত ১৯ বছর বয়সী সাইফুল ইসলাম তুহিনসহ আরও কয়েকজন কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তুহিন নিজেই একটি গ্যাং গড়ার চেষ্টা করছিল। টিকটকের ভিডিও, অস্ত্রের মহড়া, ‘হিরো’ হওয়ার নেশা—সব মিলেমিশে এক নিষ্পাপ শিশুর জীবন কেড়ে নেয়। অপ্রতিমের বাবা বলেন, ‘দশটা ফোন চাইলেও দিতাম।’ কিন্তু একটি ফোনের জন্যই প্রাণ গেল শিশুটির!

এ ঘটনার পর কুমিল্লায় পুলিশের সাঁড়াশি অভিযান চলে। ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে জেলার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযান চালিয়ে ৬২৪ জনকে আটক করা হয়। অনেককে অভিভাবকের কাছে হস্তান্তর করা হয়, কেউ কেউ মাদক ও অন্যান্য অপরাধে জড়িত থাকায় আদালতে পাঠানো হয়। অপরাধের সন্দেহে দাউদকান্দি থানায় আটক হওয়ার পর কিছু কিশোর থানার আসবাবপত্র ভাঙচুর করে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দিয়ে বেরিয়ে যায়। কুমিল্লা শহরেই অন্তত ২০টি গ্যাং সক্রিয়। চলতি বছরের সাড়ে আট মাসে অন্তত ২৫টি আলোচিত অপরাধে এদের নাম এসেছে। টিকটকে অস্ত্র হাতে মহড়ার ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ভয়ে শাটার নামিয়ে দোকানের ভেতরে ঢুকে পড়ছেন।

রাজধানীতেও পরিস্থিতি কম ভয়াবহ নয়। ১৫ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিংয়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা হামলা চালায়। কর্মচারী ইমরানকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করা হয়। ডিএমপি কমিশনার ঘোষণা দিয়েছেন, ‘মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাং বলে কোনো শব্দ থাকবে না।’ কিন্তু ঘোষণার দুদিন পরই এমন ঘটনা ঘটে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে কিশোর গ্যাং লিডার ‘কুত্তা শ্রাবণ’ অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়। চাঁদাবাজি, ছিনতাই—সবই ছিল তার দলের কর্মকাণ্ডের অংশ।

র‍্যাবের হালনাগাদ তথ্য বলছে, দেশে এখন ৩৩৯টি কিশোর গ্যাং সক্রিয়। আগে ছিল ২৩৭টি। ঢাকাতেই ১২৭ থেকে বেড়ে গ্যাংয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৫৯টিতে। সারা দেশে সদস্যসংখ্যা হাজার হাজার। ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা—কোথাও বাদ যায়নি। অপরাধের প্রায় ৪০ শতাংশই কিশোরদের হাতে—খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, ধর্ষণ—সবই।

চাঁদার জন্য পরিবারে হামলা, নদীর তীরে অস্ত্রের মহড়া

শুধু ঢাকা-কুমিল্লা নয়। গত ১৮ সেপ্টেম্বরই কক্সবাজারের পেকুয়ায় এক সাংবাদিক পরিবারের ওপর নৃশংস হামলা চালায় স্থানীয় কিশোর গ্যাং। বাড়ি নির্মাণের সময় পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় কিরিচ ও হাতুড়ি দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয় নুর মোহাম্মদ, তাঁর স্ত্রী কহিনুর আক্তার ও ছেলে মনিরুল মোস্তফাকে। রক্তাক্ত পরিবার, ভাঙা স্বপ্ন—এ যেন এক নতুন বাস্তবতা।

বরিশাল নগরীতেও আতঙ্ক ছড়িয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে মোটরসাইকেলে চড়ে প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্রের মহড়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। নদীর তীরে একে অন্যের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার দৃশ্য দেখে স্থানীয়রা ভয়ে কাঁপছেন। নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে দুই ডজনের বেশি গ্যাং সক্রিয়। চট্টগ্রামে শতাধিক গ্রুপ, রাজশাহীতে ছিনতাই-মারধর, ঢাকার দক্ষিণখানে অস্ত্র ও ইয়াবাসহ সাত সদস্য গ্রেপ্তার—সবখানেই একই কাহিনি। পল্লবীর সবুজবাংলায় গণমাধ্যমকর্মীর বাসায় হামলা ও গুলির ঘটনাও ঘটেছে। দেশজুড়ে এখন প্রায় ৩৮৬ থেকে ৪০০টি গ্যাং, সদস্যসংখ্যা সাড়ে চার হাজারের বেশি।

কেন এমন হচ্ছে? অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব, নাকি আরও ভয়ংকর কিছু?

সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর সময় নেই, বাড়ছে স্ক্রিন টাইম। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নজরদারির অভাব। রাজনৈতিক সংগঠনগুলো কিশোরদের হাতিয়ার বানাচ্ছে। রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থা ভঙ্গুর, প্রশাসনের নজরদারি দুর্বল। মাদকের অবাধ বিস্তার। অনলাইন জুয়া এবং টিকটক-ফেসবুকের নেশায় কিশোররা ‘হিরো’ হতে চায়। দ্রুত টাকা, ক্ষমতা ও ভয় দেখানোর আকাঙ্ক্ষা তাদের টেনে নিচ্ছে অপরাধের দিকে। পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, মূল্যবোধ হারাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন গ্যাং তৈরির নতুন কারখানায় পরিণত হয়েছে।

এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে? এক প্রজন্ম যদি অস্ত্র হাতে বেড়ে ওঠে, তাহলে সমাজ কীভাবে বাঁচবে? রাষ্ট্রই বা কীভাবে নিরাপদ থাকবে?

একমাত্র পুলিশ নয়, পুরো জাতিকে জাগতে হবে

করণীয় শুধু পুলিশি অভিযান নয়। এটি বহুমুখী যুদ্ধ।

পরিবারকে ফিরে আসতে হবে। বাবা-মাকে সন্তানের বন্ধু হতে হবে। রাতের আড্ডা, মোবাইলের অতিরিক্ত ব্যবহার, অস্বাভাবিক বন্ধুত্ব—সবকিছুর দিকে নজর রাখতে হবে। স্কুল-কলেজে কাউন্সেলিং চালু করতে হবে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের খুঁজে বের করে বিকল্প পথে ফিরিয়ে আনতে হবে। খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কাজের সুযোগ বাড়াতে হবে। গ্যাংয়ের বদলে স্পোর্টস ক্লাব ও যুব ক্লাব গড়ে তুলতে হবে।

রাষ্ট্রকে শক্ত হতে হবে। কিশোর অপরাধীদের জন্য বিশেষ আইন ও সংশোধনাগারব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সুযোগ নিয়ে বারবার মুক্তি পেয়ে আবার অপরাধে জড়ানোর প্রবণতা বন্ধ করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। পৃষ্ঠপোষক রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদক ও অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংস কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন।

সমাজকেও জাগতে হবে। পাড়া-মহল্লায় কমিটি গড়ে স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা ও নাগরিক সমাজ—সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। গণমাধ্যমকে শুধু খবর পরিবেশন নয়, সচেতনতা তৈরির মাধ্যম হিসেবেও ভূমিকা রাখতে হবে।

কিশোর গ্যাং কোনো অমোঘ বিপর্যয় নয়। এটি আমাদের ব্যর্থতারও ফসল। আমরা যদি এখনই জেগে না উঠি, তাহলে আগামী প্রজন্ম হাতের মুঠোয় অস্ত্র নিয়ে বেড়ে উঠবে। অপ্রতিমের মতো নিষ্পাপ শিশুরা আরও প্রাণ হারাবে। ঘরে ঘরে আতঙ্ক বাড়বে।

সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাই মিলে যদি একযোগে দাঁড়ায়, তাহলে এই ভয়ংকর ব্যাধি থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করা সম্ভব। একটি সুস্থ, নিরাপদ ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন আন্তরিকতা, সাহস ও ঐক্য।

আজকের কিশোরই আগামীর নাগরিক। তাদের হাতে অস্ত্র নয়, কলম ও স্বপ্ন তুলে দিতে হবে। নয়তো ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।

লেখক: সাংবাদিক ও সংগঠক



Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: