রক্তের দায় ও ক্ষমতার দায়বদ্ধতা: সমকালীন সমাজচিন্তা

মতামত

ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি মানুষের মনস্তত্ত্বে এক গভীর রূপান্তর ঘটায়। ইতিহাস সাক্ষী, কর্তৃত্ব যখন নৈতিকতাহীন অহমিকার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন ব্যক্তি

2026-09-27T17:42:09+00:00
2026-09-27T17:42:33+00:00
  সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩
 
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
রক্তের দায় ও ক্ষমতার দায়বদ্ধতা: সমকালীন সমাজচিন্তা
-মো. সাদ্দাম হোসাইন
রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৫:৪২ পিএম  আপডেট: ২৭.০৯.২০২৬ ৫:৪২ পিএম
প্রতীকী ছবি

ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি মানুষের মনস্তত্ত্বে এক গভীর রূপান্তর ঘটায়। ইতিহাস সাক্ষী, কর্তৃত্ব যখন নৈতিকতাহীন অহমিকার পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন ব্যক্তি সবার আগে বিস্মৃত হয় তার শিকড় ও রক্তের বন্ধনের কথা। আজকের ক্ষয়িষ্ণু সামাজিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে যখন আমরা ক্ষমতার দম্ভ, পারিবারিক ভাঙন এবং আত্মীয়তার তীব্র টানাপোড়েন প্রত্যক্ষ করি, তখন এই সংকটকে কেবল আইনি বা রাজনৈতিক কাঠামোর ব্যর্থতা বলে মনে হয় না; এটি মূলত এক গভীর আত্মিক ও নৈতিক স্খলন।

মানবচরিত্রের এই জটিল মনস্তাত্ত্বিক অধঃপতন নিয়ে আল-কুরআনের সূরা মুহাম্মদের ২২ ও ২৩ নম্বর আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—“ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে কি তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং নিজেদের আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে? এরাই তারা, যাদের প্রতি আল্লাহ অভিসম্পাত করেছেন; অতঃপর তাদের বধির করেছেন এবং তাদের দৃষ্টিশক্তিকে অন্ধ করে দিয়েছেন।”

এই আয়াতের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আল্লামা ইবনে কাসির তাঁর তাফসিরগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, কর্তৃত্বের মোহ মানুষকে এতটাই বিভ্রান্ত করে যে, সে সামাজিক পরিমণ্ডলে অন্যায়-অবিচার ছড়ায় এবং নিকটাত্মীয়দের প্রাপ্য অধিকার হরণ করে। একইভাবে ‘তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন’-এ মুফতি মুহাম্মদ শফী দেখিয়েছেন, ক্ষমতা ও আধিপত্যের প্রত্যক্ষ বিষফল হিসেবে সমাজে জন্ম নেয় দুটি মারাত্মক ব্যাধি—অনাচার সৃষ্টি এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা। ধ্রুপদি নীতিশাস্ত্রবিদ ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম তাঁর ‘মাদারিজুস সালিকিন’ গ্রন্থে বিষয়টিকে আরও গভীরে নিয়ে দেখিয়েছেন যে, ক্ষমতার লোভ মানুষের বিবেককে অবশ করে ফেলে। ফলে ব্যক্তি দুর্বল ও স্বজনদের অবমূল্যায়ন করাকে নিজের অধিকার বলে মনে করতে শুরু করে। হাদিসের বিশুদ্ধ বর্ণনায় রক্তের সম্পর্ক অটুট রাখাকে মুমিনের জন্য অপরিহার্য দায়িত্ব হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সমকালীন বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতার আয়নায় যদি এই নৈতিক মানদণ্ডটি ফেলা হয়, তবে এক বেদনাদায়ক চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সামান্য রাজনৈতিক পদায়ন, প্রশাসনিক ক্ষমতা কিংবা আকস্মিক বিত্তবৈভবের ছোঁয়া পেলেই মানুষের আচরণে আমূল পরিবর্তন আসে। নিজের পারিবারিক গণ্ডির যে স্বজনেরা একসময় শৈশবের সহযাত্রী ছিলেন, তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করাকে তখন অনেকের কাছে আভিজাত্যের পরিপন্থী মনে হয়। পৈতৃক ভিটেমাটি দখল, ক্ষুদ্র ব্যক্তিস্বার্থে ভাইয়ে-ভাইয়ে দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং রক্তের আত্মীয়দের নিঃস্ব অবস্থায় ফেলে রেখে বৈষয়িক বিলাসিতায় মত্ত হওয়া এখন অনেক ক্ষেত্রেই নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার এই আত্মম্ভরিতা কেবল ব্যক্তিস্বার্থেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পেশিশক্তির দাপটে স্থানীয় পর্যায়ে সংঘাত উসকে দেয়। ক্ষমতা যখন দায়বদ্ধতাহীন হয়ে পড়ে, তখন পরিবার থেকে রাষ্ট্র—সব স্তরেই পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি ভেঙে যায়।

এই আত্মঘাতী প্রবণতা রোধে আমাদের সমাজচিন্তায় মৌলিক পরিবর্তন অপরিহার্য। কর্তৃত্ব ও পদমর্যাদাকে পেশিশক্তি বা অহংকারের হাতিয়ার না ভেবে ‘আমানত’ বা সেবামূলক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করাই নেতৃত্বের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত। কর্মক্ষেত্র কিংবা সমাজ—যেখানেই কর্তৃত্ব থাকুক না কেন, তা যেন সাধারণ মানুষের ওপর অবিচারের রূপ না নেয়। পাশাপাশি বৈষয়িক অবস্থান যেমনই হোক, রক্তের দায়কে নিঃশর্তভাবে অগ্রাধিকার দিতে হবে; কারণ আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা কেবল আবেগের বিষয় নয়, এটি সমাজের সামাজিক নিরাপত্তারও অন্যতম প্রধান ভিত্তি। স্বার্থের দ্বন্দ্বে স্বজনদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হলে নিজ উদ্যোগে তা মিটিয়ে ফেলার সৎসাহস দেখানোই প্রকৃত মানবিক আভিজাত্য।

ক্ষমতা, বিত্ত কিংবা পদ-পদবি—সবই ক্ষণস্থায়ী। ইতিহাস সাক্ষী, ক্ষমতার দম্ভে যারা নিজের শিকড় উপড়ে ফেলেছে, সময় তাদের শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই নিক্ষেপ করেছে। শিকড়কে আঁকড়ে না ধরে কোনো বৃক্ষ যেমন মহীরুহ হতে পারে না, তেমনি আত্মীয়-স্বজন ও সমাজের দায় অস্বীকার করে কোনো ব্যক্তি বা সমাজ টেকসই মর্যাদার অধিকারী হতে পারে না। রক্তের বন্ধন রক্ষা করে ক্ষমতার সঙ্গে মানবিক দায়বদ্ধতার মেলবন্ধন ঘটানোই আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

জনসংযোগ কর্মকর্তা
আল ফাতাহ পাবলিকেশন্স



Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: