
এ তিনটি ঘটনার মধ্যে দুটি ঘটনায় দুর্গন্ধের সূত্র ধরে মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা সামনে আসে। কিন্তু এমন ঘটনা যখন বারবার সামনে আসে, তখন প্রশ্ন জাগে—শহরে পাশাপাশি বসবাস করেও আমরা কি একে অপরের কাছ থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুব বেশি দূরে যেতে হয় না। মাত্র কয়েক মাস আগের ঘটনা। রাজধানীর মিরপুর-১১ এলাকায় ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের মরদেহ একটি ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয়। ৩১ মে রাতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে পুলিশ সেখানে যায়। জানা যায়, মরদেহটি কয়েক দিন ধরে পড়ে ছিল। একই ফ্ল্যাটে তাঁর মেয়ে থাকতেন, তবে আলাদা কক্ষে। পরে সন্তানদের দায়িত্ব ও ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
মিরপুরের ঘটনাটি শুধু একজন বৃদ্ধ মায়ের মৃত্যুর ঘটনা নয়। এটি পরিবার, দায়িত্ব এবং আমাদের চারপাশের মানুষের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
পাশের মানুষজন কতটা জানতেন? কেউ কি খোঁজ নিয়েছিলেন? কেউ কি বুঝতে পেরেছিলেন, ঘরের ভেতর থাকা মানুষটি অসুস্থ বা বিপদে আছেন? এসব প্রশ্নের সব উত্তর হয়তো একটি ঘটনার মধ্যেই পাওয়া যাবে না। তবে ঘটনাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—একজন মানুষ যখন ক্রমে একা হয়ে পড়েন, তখন তাঁর চারপাশের সামাজিক সম্পর্ক কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ঢাকায় এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে। চলতি বছরের মে মাসে খিলক্ষেতের লেকসিটি এলাকার একটি ফ্ল্যাট থেকে ফারুক কবির বাদল নামে এক ব্যক্তির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি ওই ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন। তাঁর স্ত্রী ও মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেন বলে সংবাদমাধ্যমে তথ্য এসেছে।
কাফরুলেও একটি ফ্ল্যাট থেকে রাবেয়া ওরফে জেনি খান নামে এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। ফ্ল্যাটের আশপাশে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় লোকজন পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা দরজা খুলে মরদেহ উদ্ধার করেন।
শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেটের আবাসিক ভবন থেকেও ফারাহ ফেরদৌস নামে এক নারী চিকিৎসকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। তাঁর কক্ষ থেকে দুর্গন্ধ বের হওয়ার পর বিষয়টি নজরে আসে।
প্রতিটি ঘটনার প্রেক্ষাপট আলাদা। কোথাও একা বসবাস, কোথাও পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, কোথাও অসুস্থতা, আবার কোথাও মৃত্যুর কারণ নিয়ে তদন্ত হয়েছে। তাই সব ঘটনাকে একই সূত্রে বাঁধা ঠিক হবে না। কিন্তু একটি সামাজিক প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে—পাশের মানুষটির খবর আমরা কতটা রাখি?
ঢাকায় আমরা একই ভবনে থাকি। একই লিফটে উঠি। একই সিঁড়ি ব্যবহার করি। একই গেট দিয়ে বের হই। কিন্তু পাশের ফ্ল্যাটে কে থাকেন, অনেক সময় তাঁর নামটিও জানি না।
বৃদ্ধ মানুষটি একা থাকেন কি না, জানি না। কেউ কয়েক দিন ধরে বাইরে বের হননি, খেয়াল করি না। কারও ঘরে অস্বাভাবিক নীরবতা—সেটিও অনেক সময় আমাদের ভাবায় না। কারণ আমরা ব্যস্ত। অথবা হয়তো ব্যস্ততার আড়ালে আমরা নিজেদের চারপাশ থেকে মানুষকে সরিয়ে নিয়েছি।
একসময় পাড়া মানে ছিল সম্পর্ক। পাশের বাড়ির মানুষকে না চিনে থাকা ছিল অস্বাভাবিক। কারও বাড়িতে অসুস্থতা হলে খবর যেত। কারও ঘরে নতুন সন্তান এলে প্রতিবেশীরা জানতেন। মৃত্যু হলে মানুষ ছুটে আসত।
পাড়ার দোকান ছিল। চায়ের আড্ডা ছিল। মাঠ ছিল। উঠান ছিল। বারান্দা ছিল। বিকেলে মানুষের দেখা হতো। আজ শহরের অনেক জায়গায় সেই সামাজিক পরিসরগুলো সংকুচিত হয়েছে। শিশুর খেলার জায়গা কমেছে। খোলা জায়গা কমেছে। বসার জায়গা কমেছে। মানুষের স্বাভাবিকভাবে একসঙ্গে হওয়ার সুযোগও কমেছে।
আমরা নিজেদের ফ্ল্যাটের ভেতর আরও বেশি সময় কাটাই। আর সেই ফ্ল্যাটের ভেতরেও আমাদের সঙ্গী হয়ে আছে আরেকটি পর্দা—স্মার্টফোনের পর্দা। সেখানে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। দূরের বন্ধুর ছবি দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শত শত মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকা যায়।
কিন্তু পাশের দরজার মানুষটি কয়েক দিন ধরে বের হননি, সেটি জানার সময় আমাদের নেই। এটাই হয়তো আধুনিক শহুরে জীবনের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। যোগাযোগের সুযোগ বেড়েছে, কিন্তু প্রতিবেশী কমেছে। আমরা পৃথিবীর খবর রাখি, পাশের বাসার খবর রাখি না।
অবশ্যই ব্যক্তিগত গোপনীয়তা মানুষের অধিকার। কে কখন দরজা খুলবেন, কার সঙ্গে মিশবেন, কীভাবে জীবনযাপন করবেন—এসব বিষয়ে প্রতিবেশীর অযাচিত হস্তক্ষেপ কাম্য নয়।
তবে পাশের ফ্ল্যাটের মানুষটিকে কয়েক দিন দেখা যাচ্ছে না, একবার দরজায় কড়া নাড়া যায়। সাড়া না পেলে তাঁর পরিবারের কাউকে ফোন করা যায়। পরিচিত কেউ না থাকলে ভবনের নিরাপত্তাকর্মী বা ব্যবস্থাপনা কমিটিকে জানানো যায়। এটুকু করা কারও ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ নয়; বরং এটি মানবিক দায়িত্ব।
কারণ বিপদে পড়লে মানুষ প্রথমে রাষ্ট্রকে নয়, অনেক সময় পাশের মানুষকেই কাছে পায়। পুলিশ প্রতিটি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। অ্যাম্বুলেন্স প্রতিটি ফ্ল্যাটের খবর রাখতে পারে না। সিসিটিভি ক্যামেরাও সব বিপদ বুঝতে পারে না। কিন্তু একজন প্রতিবেশী বুঝতে পারেন, লোকটিকে আজ দেখা যাচ্ছে না।
একজন নিরাপত্তাকর্মী বুঝতে পারেন, যিনি প্রতিদিন সকালে বের হন, তিনি কয়েক দিন ধরে বের হননি। একজন দোকানি বুঝতে পারেন, যে বৃদ্ধ মানুষটি প্রতিদিন ওষুধ কিনতে আসতেন, তিনি কয়েক দিন ধরে আসছেন না। এই ছোট ছোট খেয়ালই কখনো বড় বিপদ ঠেকাতে পারে।
তবে বিষয়টি শুধু নাগরিকের দায়িত্বের নয়। রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব আছে। রাষ্ট্র কাউকে জোর করে প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব করাতে পারে না। কিন্তু এমন নগরপরিকল্পনা করতে পারে, যেখানে মানুষ পরস্পরের কাছাকাছি আসার সুযোগ পায়।
প্রতিটি এলাকায় খেলার মাঠ দরকার। পার্ক দরকার। বয়স্কদের বসার জায়গা দরকার। কমিউনিটি স্পেস দরকার। স্থানীয় পর্যায়ে জরুরি যোগাযোগব্যবস্থাও দরকার। কারণ পার্ক শুধু গাছপালা বা সৌন্দর্যের জন্য নয়। মাঠ শুধু খেলার জন্য নয়। কমিউনিটি সেন্টার শুধু অনুষ্ঠান করার জন্য নয়।
এসব জায়গা মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি করে। সামাজিক জায়গাগুলো মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে আসে।
আমরা আধুনিক হব। ব্যক্তিস্বাধীনতা থাকবে। গোপনীয়তা থাকবে। নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার থাকবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে পাশের দরজার মানুষটি বেঁচে আছেন কি না, সেটিও আমাদের জানার প্রয়োজন নেই।
একটি শহর কত উঁচু ভবন বানিয়েছে, কত প্রশস্ত রাস্তা করেছে কিংবা কত নতুন প্রকল্প নিয়েছে—এসব দিয়ে উন্নয়ন মাপা যায়। কিন্তু শহরটি কতটা মানবিক, সেটিও উন্নয়নের একটি মাপকাঠি হওয়া উচিত। কারণ শহর শুধু ভবনের সমষ্টি নয়; শহর মানুষেরও।
রাজধানীতে প্রতিনিয়ত মানুষ বাড়ছে। ফ্ল্যাট বাড়ছে। ভবন বাড়ছে। নিরাপত্তা বাড়ছে। প্রযুক্তি বাড়ছে। এর বিপরীতে প্রতিবেশী কমছে। এই কমে যাওয়ার কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই। কোনো জরিপে হয়তো সংখ্যাটিও পাওয়া যাবে না। কিন্তু তার চিহ্ন দেখা যায় বন্ধ দরজায়।
কেউ দরজা খুলছেন না। কেউ জানেন না কেন। তারপর একদিন ভেতর থেকে দুর্গন্ধ বের হয়। তখন আমরা জানতে পারি, পাশের ফ্ল্যাটে একজন মানুষ ছিলেন।
মানুষটি হয়তো কয়েক দিন আগেই মারা গেছেন। প্রশ্নটা তাই খুব সাধারণ—আমরা কি তাঁর মৃত্যুর খবরটা একটু আগেই জানতে পারতাম না?
হয়তো পারতাম। একবার দরজায় কড়া নেড়ে। একবার জিজ্ঞেস করে—কেমন আছেন? হয়তো সেই ছোট্ট খোঁজ নেওয়াটাই একজন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শেষ সুযোগ হতে পারত।
লেখক: সাংবাদিক