গালির অভিধানে যে সমাজ বাস করে

অনলাইন ডেস্ক

মতামত

ফরিদা আপার (ফরিদা আখতার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা) এক ফেসবুক পোস্ট পড়ে ঘটনার সন্ধান করতে গিয়ে চমকে গেছি।চমকে ওঠার মতো ঘটনা

2026-09-07T20:33:58+00:00
2026-09-07T20:33:58+00:00
  মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৪ ভাদ্র ১৪৩৩
 
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মতামত
গালির অভিধানে যে সমাজ বাস করে
দীপু মাহমুদ
অনলাইন ডেস্ক
সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৮:৩৩ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
ফরিদা আপার (ফরিদা আখতার, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা) এক ফেসবুক পোস্ট পড়ে ঘটনার সন্ধান করতে গিয়ে চমকে গেছি। 

চমকে ওঠার মতো ঘটনা হচ্ছে, ২০২৬ সালের এক গবেষণায় বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজের ৫,৯২৯টি মন্তব্য বিশ্লেষণ করে ৪৬.৫৭ শতাংশকে নারীবিদ্বেষী বুলিং হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আক্রমণাত্মক স্ল্যাং ও অপমানজনক মন্তব্যের ৯৪.৯৮ শতাংশই পুরুষ ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে এসেছে।

ফরিদা আপা তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, "ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাতে 'অশ্লীল গালি' দেয়া মত প্রকাশের স্বাধীনতা বলা হচ্ছে। ক্ষুব্ধ হলে যেভাবেই হোক ক্ষোভ প্রকাশ করবেন এতে আপত্তির কিছু থাকতে পারে না। বরং সমর্থন করতে হবে। কিন্তু একবার লক্ষ্য করে দেখেন এই গালিগুলো প্রায় সবই নারী-কেন্দ্রিক, মা-বোনকে উদ্দেশ্য করেই দেয়া হয়। এবং এটাই গালির ভাষার অংশ হয়ে গেছে। কাউকে গালি দিলে তার মা-বোন তুলে গালি দিতে হবে, এবং সেটাই সবচেয়ে মোক্ষম গালি হিশেবে বিবেচিত হচ্ছে। নারী বিরোধী, নারীর প্রতি অবমাননাকর কোন ভাষা কি আমাদের প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে? পুরুষের অপরাধে গালির লক্ষ্যবস্তু মা আর বোন?"

রাগের সময় মানুষ যে শব্দগুলো উচ্চারণ করে, সেগুলোকে আমরা প্রায়ই গুরুত্ব দিই না। বলি, রাগের মাথায় মানুষ অনেক কিছুই বলে। গালি তো গালিই- কথা শেষ। কিন্তু কথাটি এত সহজ নয়। মানুষ রাগের সময়ও শূন্য থেকে শব্দ খুঁজে নেয় না। তার মাথায়, মনে, সংস্কৃতিতে, পরিবারে, সমাজে যে শব্দগুলো আগে থেকেই জমা থাকে, সেখান থেকেই গালি বেরিয়ে আসে। আর সেই গালির দিকে একটু মন দিয়ে তাকালে একটি সমাজের গোপন মুখ দেখা যায়।

বাংলাদেশে প্রচলিত গালাগালির বড় একটি অংশ নারীকে অপমান করার ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কাউকে হেয় করতে গিয়ে তার সঙ্গে সম্পর্কিত নারীকে টেনে আনা, নারীর যৌনতা ও শরীরকে অপমানের উপকরণ বানানো, নারীর চরিত্রকে একজন পুরুষকে আঘাত করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা- এসব এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে আমরা এর মধ্যে থাকা ভয়াবহ সামাজিক সত্যটিই আর দেখতে পাই না।

অথচ এখানেই প্রশ্নটি সবচেয়ে বড়: কাউকে অপমান করতে গিয়ে কেন নারীকে অপমান করতে হবে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে গালির অভিধান থেকে বেরিয়ে সমাজের অভিধানে যেতে হবে।

কারণ, যে সমাজ মনে করে একজন পুরুষের সম্মান কোনো নারীর আচরণ, শরীর, যৌনতা বা ‘চরিত্রের’ সঙ্গে বাঁধা, সেই সমাজ আসলে নারীকে মানুষ হিসেবে নয়, পুরুষের সম্মানের বাহক হিসেবে দেখে। একজন নারীর স্বাধীনতা তখন তার নিজের বিষয় থাকে না। তার আচরণ হয়ে ওঠে পরিবারের, স্বামীর, বাবার, ভাইয়ের কিংবা পুরো বংশের সম্মানের বিষয়। ফলে নারীকে অপমান করা যায়, আবার একজন পুরুষকেও অপমান করা যায় তার সঙ্গে যুক্ত নারীকে অপমান করে।

এখানে গালি কেবল অশালীন ভাষা নয়। এটা ক্ষমতার ভাষা। আর ক্ষমতার ভাষা কখনো নিরীহ হয় না। কোনো সমাজে কাকে সহজে ছোট করা যায়, কাকে নিয়ে কৌতুক করা যায়, কার শরীরকে অপমানের বিষয় বানানো যায়, কার যৌনতা নিয়ে বিচার করা যায়- এসবের মধ্যেই সেই সমাজের ক্ষমতার সম্পর্কগুলো লুকিয়ে থাকে। আমাদের গালাগালির ভেতর তাই নারীর প্রতি গভীর অসম্মান যেমন আছে, তেমনি আছে পুরুষত্বের ভঙ্গুর ধারণাও। যেন পুরুষকে ছোট করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো তাকে এমন কোনো কিছুর সঙ্গে যুক্ত করা, যাকে সমাজ ‘নারীসুলভ’, ‘যৌন’ কিংবা ‘অশুচি’ বলে হেয় করতে শিখিয়েছে।

অর্থাৎ এখানে একই সঙ্গে নারীকে ছোট করা হচ্ছে এবং নারীর সঙ্গে যুক্ত হওয়াকেও পুরুষের জন্য অপমান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ এতে শুধু নারীর মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় না, নারী-পুরুষ উভয়ের সম্পর্কে অসুস্থ ধারণা তৈরি হয়। ছেলেরা শিখতে থাকে, নারীকে ছোট করা পুরুষত্বের প্রকাশ। মেয়েরা শিখতে থাকে, তাদের শরীর ও চরিত্র নিয়ে অন্যের মন্তব্য করার অধিকার আছে। শিশুরা শিখতে থাকে, কাউকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করতে হলে তার সঙ্গে কোনো নারীকে জড়িয়ে দাও।

এই শিক্ষা কোনো বিদ্যালয়ের পাঠ্যবইয়ে লেখা থাকে না। কিন্তু সমাজ প্রতিদিন তা পড়িয়ে যায়। ফলে গালি একসময় ব্যক্তিগত রাগের ভাষা থেকে সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়। এ কারণেই বিষয়টি কেবল ভাষার শুদ্ধতা দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে। একজন মানুষ কেন নারীর শরীরকে অপমানের শব্দ হিসেবে ব্যবহার করে, কেন নারীর যৌনতা দিয়ে অন্যকে আঘাত করতে স্বস্তি বোধ করে, কেন একজন নারীর ব্যক্তিগত জীবনকে প্রকাশ্যে বিচার করা তার কাছে স্বাভাবিক মনে হয়- এসব প্রশ্নের উত্তর ভাষাবিজ্ঞানের চেয়ে সমাজবিজ্ঞানে বেশি পাওয়া যাবে।

আর সেই উত্তরটি খুব সুখকর নয়। আমরা এমন একটি সমাজে বাস করি, যেখানে নারীর ওপর নিয়ন্ত্রণ এখনো বহু ক্ষেত্রে ভালোবাসা, নিরাপত্তা, পারিবারিক সম্মান কিংবা নৈতিকতার নামে বৈধতা পায়। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জাতীয় নারী নির্যাতন জরিপে ৭৬ শতাংশ নারী জীবনে কোনো না কোনো ধরনের অন্তরঙ্গ সঙ্গীর সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন; গত এক বছরেও ৪৯ শতাংশ নারী এমন সহিংসতার মুখোমুখি হয়েছেন। এসব সহিংসতার মধ্যে শারীরিক বা যৌন নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক, অর্থনৈতিক নির্যাতন এবং নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণও রয়েছে।

গালির ভাষা সেই বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং অনেক সময় গালি তার সবচেয়ে সহজ, সস্তা এবং দৈনন্দিন প্রকাশ। একজন নারী যখন নিজের মত প্রকাশ করেন, নিজের পছন্দে পোশাক পরেন, একা চলেন, রাজনীতিতে সক্রিয় হন, কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেন কিংবা পুরুষের কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করেন, তখন তার যুক্তির জবাব না দিয়ে তার চরিত্র, শরীর বা যৌনতা নিয়ে আক্রমণ করার প্রবণতা দেখা যায়। সাম্প্রতিক গবেষণায় বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের রাজনৈতিক দৃশ্যমানতাকে যৌনতা ও ‘নৈতিকতা’র প্রশ্নে পরিণত করে তাদের বৈধতা খর্ব করার এই প্রবণতাও উঠে এসেছে।

এখানে গালি আসলে যুক্তির বিকল্প। যেখানে যুক্তি শেষ, সেখানে চরিত্রহনন শুরু। যেখানে রাজনৈতিক বিতর্ক দুর্বল, সেখানে ব্যক্তিগত অপমান শক্তিশালী। যেখানে একজন নারীকে তার কাজ দিয়ে মোকাবিলা করা কঠিন, সেখানে তাকে নারী হিসেবেই আক্রমণ করা সহজ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই পুরোনো সংস্কৃতিকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। আগে গালি হয়তো কয়েকজন মানুষের কানে পৌঁছাত, এখন তা হাজার, লাখ মানুষের সামনে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গালি খুবই সহজ ও স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে।এখানে আরেকটি বিপজ্জনক পরিবর্তন ঘটছে। গালি শুধু কাউকে অপমান করছে না, গালি এখন দর্শক তৈরি করছে। মানুষ দেখছে, হাসছে, শেয়ার করছে, সমর্থন করছে, যোগ দিচ্ছে। ফলে অপমান ব্যক্তিগত আচরণ না থেকে এক ধরনের সামাজিক বিনোদনে পরিণত হয়ে যাচ্ছে।

যে অপমানের সঙ্গে লাভ, লাইক বা হাসির ইমোজি জুড়ে দেওয়া যায়, সেটাও কিন্তু অপমানই। আর যে সমাজ অপমান দেখে হাসে, সে সমাজ ধীরে ধীরে অপমান করার অধিকারও তৈরি করে নেয়। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়, এই ভাষা শুধু নারীর ক্ষতি করে না, পুরুষকেও বিকৃত করে। একজন পুরুষকে যদি ছোট করার জন্য বারবার নারীকে ব্যবহার করতে হয়, তাহলে তাকে শেখানো হচ্ছে- নারীর সঙ্গে যুক্ত হওয়া, নারীর মতো হওয়া, নারীর গুণ ধারণ করা কিংবা নারীর দ্বারা সংজ্ঞায়িত হওয়াই অপমান। ফলে পুরুষত্বও এক ধরনের কারাগারে বন্দী হয়। তাকে সব সময় প্রমাণ করতে হয় যে সে ‘পুরুষ’, সে দুর্বল নয়, সে সংবেদনশীল নয়, সে নারীর মতো নয়।

তাই নারীবিদ্বেষী গালি শেষ পর্যন্ত শুধু নারীর বিরুদ্ধে নয়, এটা মানুষের বিরুদ্ধে। এটা মানুষকে তার ব্যক্তিসত্তা থেকে সরিয়ে লিঙ্গের খাঁচায় ঢুকিয়ে দেয়। আমাদের সবচেয়ে বেশি ভাবা দরকার এখানেই। আমরা গালিকে এত স্বাভাবিক করে ফেলেছি যে গালির ভেতরের দর্শনটি আর শুনি না। অথচ প্রতিটি গালি আমাদের বলে দেয়, আমরা কাকে নিচে নামাতে চাই, কাকে নিচে নামালে সবচেয়ে বেশি আঘাত লাগে এবং কোন অপমানকে সমাজ এখনো সবচেয়ে কার্যকর বলে মনে করে।

সেই জায়গা থেকেই আমাদের নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। কারণ নারীকে অপমান করে যে গালি দেওয়া হয়, সেটা মুখ থেকে বের হওয়ার মুহূর্তে শুধু একজন মানুষকে আঘাত করে না। সেটা একই সঙ্গে একটি পুরোনো বিশ্বাসকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করে- নারী কম মর্যাদার, নারীর শরীর বিচারযোগ্য, নারীর যৌনতা অপমানের বস্তু, নারীর সম্মান পুরুষের সম্পত্তি এবং নারীকে হেয় করা স্বাভাবিক।

একটি সমাজের পরিবর্তন শুধু আইন করে হয় না। মানুষের মুখের ভাষা বদলালেও পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ চিহ্ন পাওয়া যায়। তাই আমাদের গালির দিকে নতুন করে তাকানো দরকার। কোন শব্দটি অশ্লীল- প্রশ্নটি শুধু তা নয়। কেন সেই শব্দটি অপমানজনক বলে আমরা মনে করি- প্রশ্নটি আদতে সেটা।

সেই উত্তর খুঁজতে গেলে আমরা শুধু আমাদের ভাষাকে নয়, নিজেদের সমাজকেও চিনতে পারব। হয়তো তখন বুঝব, আমাদের মুখের অনেক গালি আমাদের নিজেরই আয়না। আর সেই আয়নায় যে মুখটি দেখা যায়, সেটা খুব একটা সুন্দর নয়।


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: