সরকারকে ইমিডিয়েট বলতে হবে, এ দেশে গান-বাজনা হবে কি হবে না! যদি সংবিধানে নিষেধ থাকে বলে দেন, শিল্পীরা সবাই বিদেশ চলে যাই। ইতোমধ্যে অনেকেই গেছে। যে সরকারই থাকুক, আমার মুখ কখনও বন্ধ হবে না।
জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী আসিফ আকবরের এই বক্তব্যকে শুধু একজন শিল্পীর ব্যক্তিগত ক্ষোভ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবেশ নিয়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের প্রতি ইতিবাচক অবস্থানের জন্য পরিচিত একজন জনপ্রিয় শিল্পী যখন প্রকাশ্যে সরকারের কাছেই জানতে চান—এ দেশে গান-বাজনা হবে কি না—তখন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে কনসার্ট ও সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ হয়ে যাওয়া, শিল্পীদের হুমকি কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তির ঘটনা সামনে এসেছে। কোথাও ধর্মীয় অনুভূতির কথা বলা হয়েছে, কোথাও সামাজিক আপত্তির কথা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—কোনো অনুষ্ঠান কারও পছন্দ না হলেই কি সেটি বন্ধ করে দেওয়ার অধিকার কেউ পেতে পারেন?
কারও গান ভালো না লাগলে তিনি গান শুনবেন না। কোনো অনুষ্ঠান পছন্দ না হলে সেখানে যাবেন না। কিন্তু নিজের পছন্দ-অপছন্দ অন্যের ওপর চাপিয়ে দিয়ে একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ করে দেওয়ার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর থাকতে পারে না।
কোনো অনুষ্ঠানে আইনবিরোধী কিছু ঘটলে সেটি দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। প্রয়োজন হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন। কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের সামাজিক বা ধর্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করবে—এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বাভাবিক হতে পারে না।
বাংলাদেশের সমাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি হলো এর বহুত্ববাদ। এ দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ, আবার একই সঙ্গে সংস্কৃতিমনস্ক। মসজিদে নামাজ পড়া বা মন্দিরে পূজা করা মানুষটিই সন্ধ্যায় বাউলগান শুনেছেন। ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি এ দেশের মানুষ মেলা, নৌকাবাইচ, পালাগান, যাত্রা, জারি-সারি, ভাটিয়ালি কিংবা লোকগানের আসরেও অংশ নিয়েছেন।
ধর্ম ও সংস্কৃতিকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানো বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গেও যায় না।
বাংলাদেশের সংস্কৃতি নিছক বিনোদনের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের জীবন, ইতিহাস ও জাতীয় পরিচয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় গান ছিল মানুষের মনোবল বাড়ানোর অন্যতম শক্তি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। কবিতা, নাটক, সংগীত ও শিল্প মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তাই একটি কনসার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা কোনো শিল্পীকে গান গাওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর মাধ্যমে শিল্পীদের মধ্যে যদি ভয় তৈরি হয়, সাংস্কৃতিক সংগঠকদের মধ্যে যদি অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তাহলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো সাংস্কৃতিক পরিবেশের ওপর পড়বে। এখানেই সরকারের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অনেকের প্রত্যাশা ছিল, নাগরিক অধিকার ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রেও একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হবে। কারণ বিএনপির রাজনৈতিক বক্তব্যে গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ ও নাগরিক অধিকারের কথা দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে।
কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পরও যদি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নিয়ে একই ধরনের বাধা ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ সামনে আসে, তাহলে সরকারের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা।
এই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কিছু প্রকাশ্য কর্মকাণ্ডও আলোচনায় আসতে পারে। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে সিনেমা দেখতে গেছেন। পরে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে মঞ্চ নাটকও দেখেছেন। একজন সরকারপ্রধানের ব্যক্তিগত বিনোদনের বিষয় হিসেবে এগুলো দেখা যেতে পারে। কিন্তু এর একটি প্রতীকী দিকও আছে।
একজন প্রধানমন্ত্রী যখন সাধারণ দর্শকের মতো সিনেমা হলে যান কিংবা মঞ্চ নাটক দেখতে যান, তখন সেটি সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ইতিবাচক মনোভাবের একটি বার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
কিন্তু একই সময়ে দেশের কোনো প্রান্তে যদি একজন শিল্পীকে গান গাওয়ার জন্য হুমকির মুখে পড়তে হয় কিংবা কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে রাষ্ট্রীয় বার্তা ও মাঠের বাস্তবতার মধ্যে একটি দূরত্ব তৈরি হয়। সেই দূরত্ব দূর করার দায়িত্ব সরকারের।
আসিফ আকবরের বক্তব্য তাই নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
তিনি সরকারের বিরোধী কোনো রাজনৈতিক অবস্থান থেকে এই প্রশ্ন তুলছেন না। বরং সরকারের প্রতি ইতিবাচক অবস্থান থাকা একজন জনপ্রিয় শিল্পীই যখন বলছেন, সরকারকে অবিলম্বে বলতে হবে—এ দেশে গান-বাজনা হবে কি না,তখন সরকারকে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
সংস্কৃতির স্বাধীনতা কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়। এটি নাগরিক অধিকারের অংশ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং কোথাও আইন লঙ্ঘন হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া।
কোনো গোষ্ঠীর আপত্তিকে রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞার বিকল্প বানানো হলে শুধু শিল্পীর স্বাধীনতাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, রাষ্ট্রের কর্তৃত্বও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
বাংলাদেশ ধর্মপ্রাণ মানুষের দেশ। একই সঙ্গে এটি গান, কবিতা, সাহিত্য, নাটক ও লোকসংস্কৃতির দেশ। এই দুই পরিচয়ের মধ্যে কোনো মৌলিক বিরোধ নেই। বরং এই সহাবস্থানই বাংলাদেশের সমাজের দীর্ঘদিনের বাস্তবতা।
কেউ ওয়াজ শুনবেন, কেউ বাউলগান শুনবেন। কেউ ধর্মীয় আলোচনা করবেন, কেউ কবিতা আবৃত্তি করবেন। কেউ মসজিদে যাবেন, কেউ মন্দিরে যাবেন, কেউ আবার নাট্যমঞ্চে বসবেন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—সব নাগরিকের আইনসম্মত অধিকার নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির প্রশ্নটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের গান, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, চারুকলা ও লোকসংস্কৃতি শুধু দেশের মানুষের বিনোদন নয়; এগুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের পরিচয় বহন করে।
সেই দেশের শিল্পী যদি গান গাওয়ার আগে ভাবতে বাধ্য হন—কেউ আপত্তি করবে কি না, তাহলে সেটি শুধু শিল্পীর সংকট নয়; রাষ্ট্রের জন্যও একটি সতর্ক সংকেত।
আসিফ আকবর বলেছেন, যে সরকারই থাকুক, আমার মুখ কখনও বন্ধ হবে না।
এই কথাটির গুরুত্ব এখানেই। একজন শিল্পীর মুখ বন্ধ করার প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত শুধু একজন শিল্পীর প্রশ্ন থাকে না। এটি হয়ে ওঠে একটি সমাজের মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশের প্রশ্ন।
সরকারের কাছে তাই এখন একটি স্পষ্ট অবস্থান প্রত্যাশিত—বাংলাদেশে আইন মেনে গান হবে, নাটক হবে, সিনেমা হবে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হবে। কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে আইনগত সমস্যা থাকলে রাষ্ট্র ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের হাতে আইন তুলে নিয়ে শিল্প-সংস্কৃতির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে না।
কারণ গান বন্ধ হলে শুধু শিল্পীর কণ্ঠ বন্ধ হবে না। বন্ধ হবে বাংলার মানুষের হাজার বছরের জীবন, স্মৃতি ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ।
তাই প্রশ্নটি আসিফ আকবরের একার নয়—গান বন্ধ হলে বাংলাদেশ কোথায় যাবে?