সেদিন মুদির দোকানে এক মায়ের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি তাঁর শিশুটির আবদার পূরণ করতে একটি প্যাকেটের আইসক্রিম কিনে দিলেন। কথায় কথায় তাঁর সঙ্গে আলোচনা হলো, এটির উপাদান, পুষ্টিগুণ এবং মেয়াদ সম্পর্কে তিনি অবগত কি না। হাসতে হাসতে তিনি উত্তর দিলেন, আমি তো ভাই শিক্ষিত না, এত কিছু কেমনে বুঝমু?
ভাবতেই অবাক লাগে, কিছুটা থমকেও যাই—কতটা সরল মনে এই মা তাঁর শিশুর মুখে বিষ তুলে দিচ্ছেন! শুধুমাত্র তিনি একা নন, আমাদের দেশের শিক্ষিত অনেক মানুষও প্যাকেটজাত খাবারের উপাদান কিংবা এর ভালো-মন্দ দিক সম্পর্কে জানেন না।
সকালে আপনার বাচ্চার স্কুলের টিফিন বক্সে চিপস বা জুসের প্যাকেটটি দেওয়ার সময় একবারও কি ভাবেন, আসলে তার হাতে কী তুলে দিচ্ছেন? কিংবা বিকালের আড্ডায় যে চানাচুর বা বিস্কুটের প্যাকেটটি আমরা পরম তৃপ্তিতে খুলছি, তা আমাদের নিঃশব্দে হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে কি না?
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে এখন পুষ্টির অভাবের চেয়ে ‘ভুল পুষ্টির’ মহামারি বেশি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ঐতিহ্যবাহী তাজা খাবারের জায়গা দখল করে নিয়েছে চকচকে প্যাকেটে মোড়ানো অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার। এক সাম্প্রতিক সমীক্ষার ভয়ংকর তথ্য বলছে, দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার হলেও এই প্যাকেটজাত খাবার খাচ্ছেন। আর এর খেসারত আমরা দিচ্ছি আমাদের জীবন দিয়ে।
সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা মৃত্যু
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২০ সালের প্রাক্কলন ও হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর অসংক্রামক রোগে প্রায় ৫ লাখ ৭২ হাজার মানুষ মারা যান। সহজ কথায়, দেশের মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশই ঘটছে হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার বা ডায়াবেটিসের মতো রোগে।
একসময় ভাবা হতো, এগুলো ‘ধনী মানুষের রোগ’ বা ‘বার্ধক্যের রোগ’। কিন্তু আজ দেশের ১ কোটি ৩১ লাখ ডায়াবেটিস রোগী এবং প্রতি ৫ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে ১ জন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য প্রমাণ করে, এই নীরব ঘাতক আমাদের প্রতিটি ঘরে হানা দিয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। শহরাঞ্চলে স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের হার প্রতি বছর ১০ শতাংশ করে বাড়ছে, যা তাদের শৈশবেই ডায়াবেটিস (টাইপ-২) ও হৃদরোগের ঝুঁকিতে ফেলছে।
অথচ এই রোগগুলোর পেছনে চিকিৎসা ব্যয়ের ৭০ শতাংশই নাগরিকদের পকেট থেকে দিতে হচ্ছে। একটি মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারে একজন হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের রোগী থাকা মানে পুরো পরিবারটি অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়া।
প্যাকেটের পেছনের গোলকধাঁধা এবং ‘৩ সেকেন্ডের’ সত্য
তাহলে ভোক্তাদের সচেতন হওয়ার উপায় কী?
যেকোনো প্যাকেটজাত পণ্যের পেছনে তাকালে অত্যন্ত ছোট অক্ষরে ক্যালরি, সোডিয়াম, স্যাচুরেটেড ফ্যাটের একটি জটিল তালিকা দেখা যায়। একজন সাধারণ ক্রেতা, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারী একজন মানুষের পক্ষেও ওই জটিল পুষ্টিবিজ্ঞান বা মিলিগ্রামের হিসাব বুঝে দোকানে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া অসম্ভব।
তাছাড়া, কেনাকাটার সময় একজন ক্রেতা একটি পণ্যের দিকে গড়ে মাত্র ৩ থেকে ৫ সেকেন্ড সময় দেন। এই ৩ সেকেন্ডে ক্রেতাকে সতর্ক করার একমাত্র উপায় হলো ‘ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং’ (এফওপিএল) বা প্যাকেটের সামনের অংশের সহজ সতর্কবার্তা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বাংলাদেশের জন্য চিলির সফল মডেল অনুসরণ করে ‘কালো অষ্টভুজাকৃতি সতর্কবার্তা’ প্রবর্তনের কথা বলছেন। প্যাকেটের সামনে যদি বড় করে লেখা থাকে—‘অতিরিক্ত মাত্রায় চিনিযুক্ত’, ‘অতিরিক্ত মাত্রায় লবণযুক্ত’ এবং ‘অতিরিক্ত মাত্রায় সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত’—তবে একজন স্বল্পশিক্ষিত মানুষ বা শিশুও এক নজরেই বুঝে যাবে খাবারটি তার স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
এখানে কোনো খাবার নিষিদ্ধ করার কথা বলা হচ্ছে না, বরং ক্রেতাকে সত্য জানার অধিকার দেওয়া হচ্ছে।
আইন ও অধিকারের মেলবন্ধন
বাংলাদেশে এই সতর্কবার্তা চালু করা কোনো বাড়তি চাওয়া নয়, এটি আমাদের আইনি অধিকার। ‘নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩’ এবং ‘ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯’ খুব স্পষ্টভাবে বলে যে, পণ্যের উপাদান ও তার ক্ষতিকর দিক ভোক্তাকে স্পষ্টভাবে জানানো বাধ্যতামূলক।
তথ্য গোপন করে চটকদার বিজ্ঞাপনের ফাঁদে ফেলে ক্ষতিকর খাবার বিক্রি করা প্রকারান্তরে নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে এ-সংক্রান্ত একটি খসড়া প্রবিধানমালা প্রণয়ন করেছে, যা ‘মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং প্রবিধানমালা, ২০২৬’ নামে অভিহিত হবে। আনন্দের বিষয় হলো, এটি বাস্তবায়নে কেবল সরকারের একটি চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে অন্যতম সেরা ও সাশ্রয়ী উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং বিশ্বের ৪৪টি দেশে এটি সফলভাবে চলমান রয়েছে। চিলিতে এই লেবেল চালুর পর খাবারে চিনির ব্যবহার ২৪ শতাংশ এবং লবণের ব্যবহার ৩৭ শতাংশ কমে গেছে।
শিল্পের ভয় বনাম জাতীয় স্বার্থ
স্বাভাবিকভাবেই, বড় বড় খাদ্য উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো ব্যবসায়িক ক্ষতির অজুহাতে এই নিয়মের বিরোধিতা করছে। কিন্তু ইতিহাস বলে, যখনই জনস্বার্থে কোনো কঠোর নিয়ম করা হয়, শিল্প খাত নিজেকে টিকিয়ে রাখতে আরও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
এফওপিএল বাধ্যতামূলক হলে আমাদের দেশের কোম্পানিগুলোও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পণ্যে চিনি, লবণ কিংবা অতিরিক্ত মাত্রায় সম্পৃক্ত চর্বির পরিমাণ কমিয়ে আরও স্বাস্থ্যসম্মত পণ্য তৈরি করতে বাধ্য হবে। এতে করে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যই সমৃদ্ধ হবে।
ব্যবসায়িক মুনাফার চেয়ে কোটি কোটি মানুষের জীবনের মূল্য অনেক বেশি। আমরা যদি একটি সুস্থ ও কর্মক্ষম জাতি হিসেবে টিকে থাকতে চাই, তবে আমাদের থালায় কী যাচ্ছে, তা জানার অধিকার নিশ্চিত করতেই হবে।
২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে সরকারের উচিত হবে খাদ্যশিল্পের কোনো রকম অজুহাত বা চাপ উড়িয়ে দিয়ে অবিলম্বে এই ‘ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং সতর্কবার্তা’ প্রবিধানমালা চূড়ান্ত করা। এটি কেবল একটি স্টিকার বা লেবেল নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচানোর এক অপরিহার্য স্তম্ভ।
তরুণদের সাবধানতাই আগামীর প্রজন্ম রক্ষার মূল হাতিয়ার
একটি জাতির শারীরিক সুস্থতাই আগামীর জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। আগামীর প্রজন্ম রক্ষা এবং একটি সুস্থ, কর্মক্ষম জাতি গঠনে তরুণদের ভূমিকা বহুমুখী। কেবল নিজেদের স্বাস্থ্য রক্ষা করাই নয়, বরং সামাজিকভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতেও তারা বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাবে তরুণসমাজ আজ এক কঠিন স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি। প্রক্রিয়াজাত খাবারের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার, অতিরিক্ত ফাস্টফুড গ্রহণ এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে অল্প বয়সেই অতিরিক্ত ওজন, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো মারাত্মক অসংক্রামক ব্যাধি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
এই নীরব মহামারি থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম হতে পারে প্যাকেটের সামনের সতর্কবার্তাযুক্ত খাদ্য লেবেল বা ‘ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং’ নীতির দ্রুত বাস্তবায়ন।
খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর চর্বি, অতিরিক্ত চিনি ও লবণের উপস্থিতি সহজ সংকেতের মাধ্যমে তুলে ধরাই এফওপিএল-এর মূল উদ্দেশ্য। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, চিলি, মেক্সিকো ও আর্জেন্টিনায় এই নীতি বাধ্যতামূলক হওয়ায় সেখানে অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের হার লক্ষণীয়ভাবে কমেছে।
এই জাতীয় স্বাস্থ্যসংকটে তরুণেরাই পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি হতে পারে। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় তরুণদের প্রধান দায়িত্ব ও ভূমিকাগুলো হলো, সচেতন খাদ্য নির্বাচন, স্বাস্থ্যকর জীবনধারা, পরিবার ও সহপাঠীদের সচেতনতা, ডিজিটাল আন্দোলন এবং নীতি নির্ধারণে ভূমিকা।
তরুণদের সচেতন সিদ্ধান্ত ও সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি সুস্থ ও স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে।
নীরব মহামারি রোধে গণমাধ্যম: প্রলোভন নয়, সঠিক তথ্যে বাঁচুক জীবন
একটি সুস্থ ও সচেতন জাতি গঠনে গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অনিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়াজাত খাবারের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জনগণকে সতর্ক করতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম।
তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রচার ও গুজব প্রতিরোধের মাধ্যমে গণমাধ্যম জনগণের কাছে সঠিক ও বিজ্ঞানসম্মত তথ্য পৌঁছে দেওয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে ব্যবহৃত অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও ক্ষতিকর চর্বির স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নিয়মিত গবেষণা প্রতিবেদন ও ফিচার প্রকাশ করে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা সম্ভব। এতে প্রলোভনমূলক বিজ্ঞাপনের বিভ্রান্তি দূর হয়।
‘ফ্রন্ট-অফ-প্যাক লেবেলিং’ নিয়ে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা এবং প্যাকেটের সামনের সহজ ও স্পষ্ট সতর্কবার্তা বা এফওপিএল কেন জরুরি, তা সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে গণমাধ্যম।
টেলিভিশনে টকশো, পত্রিকায় বিশেষ নিবন্ধ এবং সংবাদ বুলেটিনে এই লেবেলের সংকেতগুলো চেনার উপায় তুলে ধরে জনগণকে কেনাকাটায় সচেতন করা যায়।
নীতি নির্ধারণে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ
জনস্বার্থ রক্ষায় নীতিভিত্তিক আইন প্রণয়নে গণমাধ্যম অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। খাদ্যপণ্যে বাধ্যতামূলক এফওপিএল আইন বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে অস্বাস্থ্যকর ফাস্টফুডের সহজলভ্যতা বন্ধে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে নীতি নির্ধারকদের ওপর ইতিবাচক চাপ তৈরি করা সম্ভব।
স্বাস্থ্যকর জীবনধারায় জনগণকে উৎসাহিতকরণ
কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলে ধরা নয়, বরং সুস্থ জীবনযাপনের উপায় দেখানোও গণমাধ্যমের দায়িত্ব। ঘরে তৈরি খাবার গ্রহণ, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের গুরুত্ব এবং তামাক ও মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে ইতিবাচক কনটেন্ট প্রচার করে গণমাধ্যম জনগণকে সঠিক জীবনযাত্রায় উদ্বুদ্ধ করতে পারে।
জনগণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণ ও নীতি নির্ধারণী আইন বাস্তবায়নে গণমাধ্যম যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তবেই একটি রোগমুক্ত ও কর্মক্ষম ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
সময় এখনই সাবধানতার। আজকের দিনে সুষম খাদ্য নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমিয়ে আনতে পারলেই যেমন একটি পরিবার অর্থনৈতিক ও পারিবারিক দিক দিয়ে নিরাপদ হবে, তেমনই একটি দেশ ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনের দিকেও আমরা আরও বেশি অগ্রসর হতে পারব।
লেখক: প্রোগ্রাম অফিসার (মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন), স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সেক্টর, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন।