বার্ধক্যের নিরাপত্তা কি শুধু সন্তানের দায়িত্ব!

অনলাইন ডেস্ক

মতামত

একজন বাবা-মা সন্তানের জন্য জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময়টুকু ব্যয় করেন। সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, ভবিষ্যৎ- সবকিছুর জন্য নিজের প্রয়োজনকে পিছিয়ে দেন।

2026-08-20T18:27:53+00:00
2026-08-20T18:27:53+00:00
  শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬,
৭ ভাদ্র ১৪৩৩
 
শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
মতামত
বার্ধক্যের নিরাপত্তা কি শুধু সন্তানের দায়িত্ব!
দীপু মাহমুদ
অনলাইন ডেস্ক
বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ৬:২৭ পিএম 
দীপু মাহমুদ
একজন বাবা-মা সন্তানের জন্য জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময়টুকু ব্যয় করেন। সন্তানের শিক্ষা, চিকিৎসা, ভবিষ্যৎ- সবকিছুর জন্য নিজের প্রয়োজনকে পিছিয়ে দেন। তাই সন্তান বড় হলে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে থাকবে- এটা আমাদের সমাজের গভীর নৈতিক প্রত্যাশা। কিন্তু এই প্রত্যাশার আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ক্রমেই সামনে আসছে: একজন মানুষের বার্ধক্যের নিরাপত্তা কি শেষ পর্যন্ত শুধু তাঁর সন্তানের সামর্থ্য, সদিচ্ছা ও উপস্থিতির ওপর নির্ভর করবে?

প্রশ্নটি এখন আর কেবল পারিবারিক মূল্যবোধের প্রশ্ন নয়, এটা বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও সামাজিক নিরাপত্তার ভবিষ্যতের প্রশ্ন।

বাংলাদেশ দ্রুত বয়স্ক জনগোষ্ঠীর দেশে পরিণত হচ্ছে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, ৬০ বছর ও তার বেশি বয়সী মানুষের অনুপাত ২০১১ সালের ৭.৪৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯.২৯ শতাংশ হয়েছে। ২০২২ সালে দেশে ৬০ ঊর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ। ২০৫০ সালে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছাতে পারে।

অর্থাৎ, বার্ধক্য বাংলাদেশের ভবিষ্যতের কোনো দূরের বিষয় নয়। আজকের কর্মক্ষম প্রজন্মই আগামী কয়েক দশকে দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীতে পরিণত হবে। অথচ এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের পারিবারিক কাঠামোও বদলে যাচ্ছে। বড় পরিবার ছোট হচ্ছে, সন্তানরা পড়াশোনা ও কর্মসংস্থানের জন্য অন্য শহর বা দেশে চলে যাচ্ছে, নগরজীবনে একসঙ্গে কয়েক প্রজন্মের বসবাস কমছে। ফলে যে পারিবারিক কাঠামো এতদিন বৃদ্ধ মানুষের প্রধান নিরাপত্তাবলয় হিসেবে কাজ করেছে, সেটাই ক্রমে দুর্বল হচ্ছে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। সন্তানের দায়িত্ব অস্বীকার করার প্রশ্ন নেই। বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের নৈতিক ও পারিবারিক দায়িত্ব থাকবে। বাংলাদেশ সেই দায়িত্বকে আইনেও স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু সন্তানের দায়িত্বকে রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তার বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানো যায় না।

কারণ সব সন্তানের সামর্থ্য এক নয়। কেউ বেকার, কেউ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত, কেউ নিজের সংসার চালাতেই হিমশিম খান। কেউ বিদেশে থাকেন, কেউ অন্য শহরে। কারও বাবা-মা নিঃসন্তান, কারও সন্তান নেই, আবার কারও পারিবারিক সম্পর্ক ভেঙে গেছে। সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের বয়স্ক ভাতা কর্মসূচির অগ্রাধিকার তালিকাতেই বিধবা, বিপত্নীক, নিঃসন্তান এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন প্রবীণদের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ আছে।

তাহলে তাঁদের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে?
রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানেই।
বাংলাদেশের সংবিধানের সামাজিক নিরাপত্তার নীতিতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তার কথা বলা হয়েছে। জাতীয় বয়স্ক নীতি ২০১৩-তেও প্রবীণ মানুষের মর্যাদা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও অধিকারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাও বলছে, বার্ধক্যে আয়-নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা সামাজিক নিরাপত্তার মৌলিক অংশ।

বাংলাদেশ ইতিমধ্যে কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি শুরু হয়েছিল প্রতি মাসে ১০০ টাকা দিয়ে। এখন ৬১ লাখ মানুষ এই কর্মসূচির আওতায় আছেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাসিক ভাতার পরিমাণ ৬৫০ টাকা এবং এ কর্মসূচির বাজেট ৪ হাজার ৭৯১ কোটি ৩১ লাখ টাকা।

এটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- ৬৫০ টাকা কি একজন প্রবীণ মানুষের বার্ধক্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে?

বার্ধক্যের নিরাপত্তা শুধু মাসের শেষে কিছু টাকা হাতে পাওয়া নয়। একজন প্রবীণের প্রয়োজন হতে পারে নিয়মিত ওষুধ, চিকিৎসা, পুষ্টিকর খাবার, নিরাপদ বাসস্থান, চলাচলের সুবিধা, মানসিক সহায়তা, সামাজিক যোগাযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা। কর্মক্ষমতা হারালে তাঁর আয় কোথা থেকে আসবে- সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। সন্তান পাশে থাকলেও এসব ব্যয়ের চাপ পরিবারের ওপর পড়ে, সন্তান পাশে না থাকলে পরিস্থিতি আরও কঠিন।

এই বাস্তবতাই দেখায়, বয়স্ক ভাতা একটি নিরাপত্তাবলয় হতে পারে, কিন্তু পুরো নিরাপত্তাব্যবস্থা নয়।

সরকারের নতুন সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোতেও এই সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা হয়েছে। জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলের প্রস্তাবিত কাঠামোয় প্রবীণদের জন্য তিন স্তরের পেনশনব্যবস্থার কথা রয়েছে- দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রবীণদের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে ন্যূনতম আয়-নিরাপত্তা, আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক অবদানভিত্তিক পেনশন এবং অতিরিক্ত সঞ্চয়ের জন্য স্বেচ্ছাভিত্তিক পেনশন।

এটা সঠিক দিকের চিন্তা। কিন্তু নীতির কাগজে কাঠামো থাকা আর মানুষের জীবনে তার সুফল পৌঁছানো এক বিষয় নয়। ২০২৬-২০৩৫ মেয়াদের নতুন সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল নিয়েও সরকার নিজেই স্বীকার করেছে যে সামাজিক সুরক্ষায় বরাদ্দ এখনো কম, অনেক কর্মসূচির সুবিধার পরিমাণ সীমিত, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তা নিয়মিত সমন্বিত হয় না এবং দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রেও বাদ পড়ার সমস্যা আছে।

আরেকটি বড় ঘাটতি স্বাস্থ্যসেবায়। মানুষ যত বেশি দিন বাঁচবে, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ও পরিচর্যার প্রয়োজনও তত বাড়বে। কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় বার্ধক্যবান্ধব চিকিৎসা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার অবকাঠামো এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মতে, সুস্থ বার্ধক্যের জন্য শুধু পেনশন নয়, স্বাস্থ্যসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যবস্থাও সামাজিক সুরক্ষার অংশ হওয়া প্রয়োজন।

তাই বাংলাদেশের সামনে এখন একটি বড় নীতিগত পরিবর্তনের প্রয়োজন। বয়স্ক মানুষকে ‘পরিবারের দায়িত্ব’ হিসেবে দেখার পাশাপাশি তাঁকে ‘রাষ্ট্রের নাগরিক’ হিসেবেও দেখতে হবে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে এমন একটি ন্যূনতম নিরাপত্তাব্যবস্থা তৈরি করা, যাতে একজন মানুষের বার্ধক্য তাঁর সন্তানের আয় বা পারিবারিক সম্পর্কের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না হয়। বয়স্ক ভাতার প্রকৃত মূল্য মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। পেনশনব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করতে হবে। অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের পেনশনের আওতায় আনার পথ তৈরি করতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে প্রবীণবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একা বসবাসকারী প্রবীণদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সহায়তা ও নিয়মিত খোঁজ নেওয়ার ব্যবস্থা প্রয়োজন। শহর ও গ্রাম- দুই জায়গাতেই তাঁদের চলাচল ও জনপরিসরকে আরও বয়স্কবান্ধব করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, বার্ধক্যকে করুণা বা পারিবারিক অনুগ্রহের বিষয় হিসেবে দেখা বন্ধ করতে হবে।

একজন মানুষ সারা জীবন দেশের অর্থনীতি ও সমাজে অবদান রাখেন। কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন, শ্রমিক অবকাঠামো নির্মাণ করেন, শিক্ষক প্রজন্ম তৈরি করেন, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী অর্থনীতিকে সচল রাখেন, গৃহস্থালি ও সন্তান প্রতিপালনের অদৃশ্য শ্রমও সমাজকে টিকিয়ে রাখে। কর্মক্ষমতার শেষ সীমায় পৌঁছানোর পর তাঁদের নিরাপত্তা তাই কোনো দান নয়, এটা সামাজিক ন্যায়বিচারের অংশ।

সন্তান অবশ্যই বাবা-মায়ের পাশে থাকবে। পরিবার থাকবে প্রথম নিরাপত্তাবলয় হিসেবে। কিন্তু সেই নিরাপত্তাবলয় দুর্বল হয়ে গেলে একজন নাগরিক যেন একেবারে শূন্যে পড়ে না যান- সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

কারণ 'ভালো সন্তান' পাওয়া ভাগ্যের বিষয় হতে পারে, কিন্তু নিরাপদ বার্ধক্য পাওয়া নাগরিক অধিকার হওয়া উচিত।

তাই প্রশ্নটির উত্তরও স্পষ্ট: বার্ধক্যের নিরাপত্তা শুধু সন্তানের দায়িত্ব নয়। সন্তান দায়িত্ব পালন করবে ভালোবাসা ও নৈতিকতার জায়গা থেকে, রাষ্ট্র দায়িত্ব পালন করবে নাগরিক অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের জায়গা থেকে। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের সাফল্য শুধু তার শিশু ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার মধ্যে নয়, যারা জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম সময়টি সমাজকে দিয়েছেন, তাঁদের জীবনের শেষ অধ্যায় কতটা নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও মানবিক- তার মধ্যেও সেই রাষ্ট্রের চরিত্র প্রকাশ পায়।


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: