প্রতি বছর ১২ আগস্ট বিশ্বজুড়ে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক যুব দিবস’। যেকোনো রাষ্ট্র ও জাতির সামাজিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আধুনিকতার মূল চালিকাশক্তি হলো তরুণ প্রজন্ম। জনমিতিক লভ্যাংশ বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুবর্ণ যুগে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ যখন একটি সমৃদ্ধ, প্রগতিশীল ও বৈষম্যহীন ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, ঠিক তখন সেই স্বপ্নের পথকে প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত ও রুদ্ধ করে দিচ্ছে রোডক্র্যাশ। আমাদের দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো যেন আজ একেকটি স্থায়ী মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন সকালের খবরের কাগজের পাতা খুললেই আমাদের চোখ আটকে যায় মর্মান্তিক সব দুর্ঘটনার খবরে, যেখানে অকালে ঝরে পড়ছে শত শত সম্ভাবনাময় তাজা প্রাণ। আন্তর্জাতিক যুব দিবসের এই মাহেন্দ্রক্ষণে আবেগ, ফাঁকা বুলি কিংবা স্লোগানের ঊর্ধ্বে উঠে সড়ক নিরাপত্তায় তরুণদের প্রকৃত দায়বদ্ধতা, পরিসংখ্যানগত ভয়াবহ বাস্তবতা এবং তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ নিয়ে গভীরভাবে আলোকপাত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে তরুণদের বারবার জোরালো প্রতিবাদ, রাজপথের আন্দোলন ও নানামুখী প্রশাসনিক প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও দেশের সড়কগুলোর সার্বিক চিত্রে দৃশ্যমান কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ প্যাসেঞ্জার ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সাম্প্রতিক বিভিন্ন উপাত্ত ও জরিপ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে রোডক্র্যাশে নিহতদের মধ্যে প্রায় ৪২ থেকে ৪৫ শতাংশই তরুণ বা উদীয়মান বয়সের জনগোষ্ঠী, যাদের বয়স ১৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সড়কে প্রতিদিন প্রাণ হারানো এই তরুণদের একটি সিংহভাগই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সরাসরি শিকার হচ্ছেন।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই রোডক্র্যাশের পরিণাম আরও ভয়াবহ ও করুণ। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সড়ক দুর্ঘটনার কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ২ দশমিক ৭ থেকে ৩ শতাংশ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ও বিনষ্ট হয়। একজন কর্মক্ষম তরুণ কেবল একটি পরিবারের অর্থনৈতিক ভরসাস্থল বা একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নন, বরং পুরো দেশের অর্থনীতির একজন সম্ভাবনাময় কারিগর। যখন একজন উদীয়মান তরুণ সড়কে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন কিংবা অকালে প্রাণ হারান, তখন কেবল একটি পরিবারই দেউলিয়া বা ধ্বংস হয় না, বরং রাষ্ট্র তার একজন চরম সম্ভাবনাময় ও দক্ষ মানবসম্পদকে চিরতরে হারিয়ে ফেলে।
মনোবিজ্ঞান, সামাজিক বিজ্ঞান ও সড়ক প্রকৌশলসংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, তরুণ বয়সের মানসিক কাঠামোর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো ‘উচ্চ ঝুঁকি গ্রহণ’। বিশ্বখ্যাত দুর্ঘটনা প্রতিরোধ গবেষক এইচ. ডব্লিউ. হেইনরিখের প্রবর্তিত দুর্ঘটনা তত্ত্ব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শতকরা ৮৮ ভাগ দুর্ঘটনার মূল কারণই হলো মানুষের অনিরাপদ আচরণ।
তবে তত্ত্ব আমাদের এ-ও শেখায় যে, তরুণ সমাজই হলো যেকোনো সমাজের সবচেয়ে বড় সংস্কারক। সমাজের যেকোনো স্থবিরতা, দুর্নীতি ও অনিয়ম দূর করতে মানব ইতিহাসের প্রতিটি মোড়ে তরুণ সমাজই নেতৃত্বের অগ্রভাগে অবস্থান করেছে। সুতরাং, সড়কের দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর করে অনিরাপদ আচরণকে নিয়মানুবর্তিতার সংস্কৃতিতে রূপান্তর করার প্রকৃত চাবিকাঠি ও সামাজিক ক্ষমতা তরুণদের নিজেদের হাতেই নিহিত রয়েছে।
সড়কে নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে উন্নত অবকাঠামো নির্মাণ, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কিন্তু সচেতন নাগরিক হিসেবে দেশের তরুণ সমাজ তাদের নিজস্ব নৈতিক দায়বদ্ধতা কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারে না।
প্রথমত, ট্রাফিক আইন মেনে চলার সংস্কৃতি নিজেদের ভেতর থেকেই শুরু করতে হবে। হেলমেট পরা, নির্দিষ্ট গতিসীমা মেনে চলা কিংবা লাল সিগন্যালে গাড়ি থামানোকে কোনো বাড়তি আইনি বাধ্যবাধকতা হিসেবে নয়, বরং একজন সভ্য ও আধুনিক নাগরিকের আত্মমর্যাদা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া যানবাহন চালানো থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকা এবং হেলমেটহীন কোনো আরোহীকে মোটরসাইকেলে না তোলা তরুণদের নৈতিক অভ্যাস হওয়া উচিত।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও তথ্যপ্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। টিকটক, ফেসবুক বা ইউটিউবের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিপজ্জনক ড্রাইভিং বা বাইক স্টান্টের ভিডিও শেয়ার করে সস্তা জনপ্রিয়তা না খুঁজে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক সচেতনতামূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচার করা সময়ের দাবি।
তৃতীয়ত, পথচারী হিসেবে নিজেদের শতভাগ সচেতন করতে হবে। রাস্তা পারাপারে ওভারব্রিজ ও জেব্রা ক্রসিং ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে হবে এবং মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে হাঁটার বিপজ্জনক অভ্যাস চিরতরে ত্যাগ করতে হবে।
২০১৮ সালে বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’ পুরো বিশ্বকে চাক্ষুষ দেখিয়ে দিয়েছিল যে, তরুণ প্রজন্ম রুখে দাঁড়ালে ট্রাফিক ব্যবস্থায় কতটা অভূতপূর্ব শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব। সড়ক আইন পরীক্ষা করা থেকে শুরু করে জরুরি সেবার যানবাহনের জন্য রাজপথে ‘ইমার্জেন্সি লেন’ তৈরির সেই উদ্ভাবনী চেতনা কেবল দেশে নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছিল।
আজকের যুব দিবসে আমাদের মনে রাখতে হবে, সেই আন্দোলন থেকে শেখা সচেতনতাকে কেবল রাজপথের সাময়িক ক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, প্রতিদিনের ব্যক্তিগত জীবনযাত্রায় তার নিয়মিত চর্চা করতে হবে। তরুণদের মননে এই সত্য গভীরভাবে গেঁথে নিতে হবে যে, আইন অমান্য করায় কোনো বীরত্ব বা বাহাদুরি নেই, বরং ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে মেনে চলার মাধ্যমেই নিজের ও অপরের অমূল্য জীবন সুরক্ষিত থাকে।
একটি দেশের যুবসমাজ যদি সড়কে বেপরোয়া ও দায়িত্বহীন হয়ে পড়ে, তবে সেই দেশের ভবিষ্যৎ প্রগতির পথচলাও বেপরোয়া ও মারাত্মক অনিরাপদ হতে বাধ্য। আন্তর্জাতিক যুব দিবস আমাদের প্রতি বছর সতর্কবার্তার মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, তারুণ্যের ভেতরের অসীম শক্তিকে সঠিক, মানবিক ও শৃঙ্খলিত পথে পরিচালিত করা রাষ্ট্র ও ব্যক্তিসত্তা উভয়েরই যৌথ কর্তব্য।
আজকের উদীয়মান তরুণদের দীপ্ত অঙ্গীকার হওয়া উচিত, ‘আমি নিজে ট্রাফিক আইন মেনে চলব, অন্যকে উৎসাহিত করব এবং একটি দুর্ঘটনাহীন, মানবিক বাংলাদেশ গড়ে তুলব।’ তরুণ প্রজন্মের জাগ্রত বিবেক এবং সরকারের সুদৃঢ় পদক্ষেপের যুগপৎ সমন্বয়েই আমাদের দেশের সড়কগুলো ঘাতক না হয়ে উঠে দাঁড়াবে উন্নত ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের নিরাপদ সোপান হিসেবে।
কর্মী, ক্লাইমেট কানেক্ট, মোবাইল: ০১৫৪০০৫৬৮২৩