২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। দীর্ঘদিনের একদলীয় আধিপত্য, রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে এই আন্দোলন শুধু একটি সরকারের পতনই ঘটায়নি, বরং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতরেও একটি নতুন বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। সেই বাস্তবতার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো তরুণ নেতৃত্বের উত্থান। যে তরুণরা প্রথমে কোটাবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, পরে গণঅভ্যুত্থানের মুখ হয়ে উঠেছিলেন, আজ তাঁদের অনেকেই জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। একই সঙ্গে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের তরুণ নেতারাও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ছাত্রনেতাদের জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসার ইতিহাস নতুন নয়। ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান কিংবা নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন—প্রতিটি যুগেই ছাত্রসমাজ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করেছে। তবে ২৪-এর জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এই প্রজন্ম শুধু রাজপথে নয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও নিজেদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে। ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব, এক্স, অনলাইন ক্যাম্পেইন এবং বিকল্প গণমাধ্যম ব্যবহার করে তারা জনমত গঠনের নতুন পদ্ধতি তৈরি করেছে। ফলে তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাব দলীয় কাঠামোর বাইরে গিয়েও বিস্তৃত হয়েছে।
গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্বে থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাংশ পরে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) গঠন করেন। নাহিদ ইসলাম, আখতার হোসেন, হাসনাত আবদুল্লাহ, হান্নান মাসউদ, নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারী, সারজিস আলমের মতো তরুণ নেতারা অল্প সময়ের মধ্যেই জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। সংসদীয় কার্যক্রম, সাংগঠনিক তৎপরতা এবং জনসম্পৃক্ত রাজনীতির মাধ্যমে তাঁরা একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে বিএনপিও নতুন বাস্তবতা উপলব্ধি করে তরুণ নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে এসেছে। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দল পুনর্গঠনেও নতুন প্রজন্মের নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ছাত্রদলসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের তরুণ নেতারা এখন রাজনৈতিক বিতর্ক, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত সক্রিয়। একইভাবে জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেও নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব দৃশ্যমান হয়েছে। ইসলামী ছাত্রশিবির থেকে উঠে আসা অনেক তরুণ নেতা এখন দলটির গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ও সংসদীয় ভূমিকায় রয়েছেন।
তবে রাজনীতির নতুন এই চিত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। দীর্ঘ বিরতির পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ায় নতুন নেতৃত্ব তৈরির একটি গণতান্ত্রিক ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। নির্বাচিত ভিপি ও জিএসরা আর শুধু ক্যাম্পাস রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নন; জাতীয় ইস্যুতে মতামত, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ, গণমাধ্যমে উপস্থিতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনমত গঠনের মাধ্যমে তাঁরা জাতীয় আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছেন। বাংলাদেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ অনেক সময়ই ভবিষ্যতের জাতীয় নেতৃত্বের সূতিকাগার হয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, যে আন্দোলনের মূল স্লোগান ছিল ‘বৈষম্যহীন বাংলাদেশ’, দুই বছর পর সেই স্বপ্ন আজ কতটা বাস্তবায়ন হয়েছে?
সত্যিই কি আজ আমরা একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ পেয়েছি? এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। রাজনৈতিক পরিবর্তন অবশ্যই এসেছে, নতুন মুখ এসেছে, নতুন দল এসেছে এবং ক্ষমতার কাঠামোতেও পরিবর্তন ঘটেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা শুধু ক্ষমতার পালাবদল ছিল না; তারা চেয়েছিল রাষ্ট্রের আচরণে পরিবর্তন, আইনের সমান প্রয়োগ, রাজনৈতিক সহনশীলতা, কর্মসংস্থানের সুযোগ, দুর্নীতির লাগাম টানা এবং নাগরিক মর্যাদার নিশ্চয়তা। বাস্তবতা হলো—এসব ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি থাকলেও বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়েছে, এমন দাবি করা কঠিন। অর্থনৈতিক চাপ, কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক বিভাজন এবং সামাজিক মেরুকরণ এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। অর্থাৎ, আন্দোলনের স্বপ্ন এখনও একটি চলমান প্রকল্প; তার পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়নি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রাজনৈতিক সহনশীলতা। যে প্রজন্ম পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে রাজনীতিতে এসেছে, তাঁদের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হচ্ছে ভিন্নমতকে কতটা সম্মান জানানো যায়। গণতন্ত্রে প্রতিপক্ষকে শত্রু নয়, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা—এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে নতুন নেতৃত্বও পুরোনো রাজনৈতিক চক্রের অংশ হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে। ক্ষমতার পরিবর্তন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে নিষিদ্ধ ঘোষিত বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মীর বিচ্ছিন্ন মিছিল কিংবা বিক্ষোভের চেষ্টাও দেখিয়েছে যে রাজনৈতিক মতাদর্শের সংঘাত এখনও শেষ হয়ে যায়নি। এই সংঘাতে সামনের সারিতে রয়েছেন তরুণরাই। ফলে আগামী দিনের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অনেকাংশেই নির্ভর করবে তরুণ নেতৃত্ব কতটা সংলাপ, সহনশীলতা এবং সাংবিধানিক রাজনীতির পথ অনুসরণ করতে পারে, তার ওপর।
আমি মনে করি, বর্তমান প্রজন্মের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষমতা। তবে অভিজ্ঞতা, প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতির জ্ঞান, দীর্ঘমেয়াদি কৌশল এবং আপস-সমঝোতার রাজনৈতিক সংস্কৃতি অর্জন করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রাজনীতি কেবল আন্দোলনের নাম নয়, এটি রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থ রক্ষারও শিল্প।
তবে এটা বলতে দ্বিধা নেই যে, ২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতিতে তরুণদের উত্থান নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কিন্তু ইতিহাস কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন দিয়ে লেখা হয় না; ইতিহাস লেখা হয় প্রতিশ্রুতি রক্ষার মধ্য দিয়ে। যে প্রজন্ম বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক এবং গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, তাঁদের সামনে এখন সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়ার কঠিন দায়িত্ব। আগামী কয়েক বছরই নির্ধারণ করবে এই তরুণ নেতৃত্ব কেবল একটি গণঅভ্যুত্থানের নায়ক হয়ে থাকবে, নাকি তাঁরা সত্যিই বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারবেন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে সেই উত্তরটির ওপর।
লেখক: সাংবাদিক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, পলিটিক্যাল রিপোর্টার্স ফোরাম।