ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর একটি। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলন, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ধারাবাহিক চাপ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহির দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত তিনি দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এই ঘটনাকে কেউ রাজনৈতিক পরাজয় বলছেন, কেউ সরকারের কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন। তবে একটি বিষয় অস্বীকার করার সুযোগ নেই—এই পদত্যাগ আবারও প্রমাণ করেছে যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের কণ্ঠস্বরকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা সহজ নয়।
ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত হয় জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষায় অনিয়ম, শিক্ষাব্যবস্থায় দুর্নীতি এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ থেকে। প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা দিল্লির যন্তর মন্তরকে কেন্দ্র করে গণআন্দোলনে রূপ নেয়। পরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে কলকাতা, মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, আহমেদাবাদ, গুয়াহাটি, তিরুবনন্তপুরমসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী রাজপথে নেমে একটাই স্লোগান তুলেছিল- শিক্ষাব্যবস্থায় জবাবদিহি চাই, দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চাই এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ চাই।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে ছিল তিনটি। সেগুলো হলো:
১. মেডিকেল ও ডেন্টাল ভর্তিসহ (নিট) বিভিন্ন জাতীয় পরীক্ষায় ধারাবাহিক প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অনিয়ম বন্ধ করার দাবি।
২. প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষাব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ বা বরখাস্ত এবং এ সংক্রান্ত জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
৩. পরীক্ষা সংক্রান্ত কেলেঙ্কারি ও মানসিক চাপে আত্মহননকারী শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে আটক অধিকারকর্মী ও শিক্ষার্থীদের মুক্তি দেওয়া।
বিরোধী দল কংগ্রেসসহ একাধিক রাজনৈতিক দল প্রকাশ্যে এই দাবিগুলোর প্রতি সমর্থন জানায় এবং সংসদ ও রাজপথে শিক্ষার্থীদের পক্ষে অবস্থান নেয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার শুরুতে পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন সংস্কারের আশ্বাস দেয়। কিন্তু আন্দোলন থামেনি। শেষ পর্যন্ত ধর্মেন্দ্র প্রধান নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের স্বার্থে নৈতিক দায় স্বীকারের কথাও উল্লেখ করেন। এই সিদ্ধান্তের পর দিল্লিসহ বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি কোথায়? সেটি কেবল নির্বাচন আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত গণতন্ত্র তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন সাধারণ নাগরিক, বিশেষ করে তরুণ সমাজ, রাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করতে পারে, শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করতে পারে। বিরোধী রাজনৈতিক দল সেই দাবিকে রাজনৈতিক পরিসরে তুলে ধরতে পারে। সে দাবি সরকার শেষ পর্যন্ত জনমতের গুরুত্ব উপলব্ধি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
ভারতের এই ঘটনাটি সেই অর্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। কারণ এখানে ছাত্রদের দাবি শুধু শোনা হয়নি, বরং তা জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। সরকার সমালোচিত হয়েছে, বিরোধীরা আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক জবাবদিহির একটি দৃশ্যমান উদাহরণ সৃষ্টি হয়েছে।
অবশ্যই এটিও সত্য যে ভারতের গণতন্ত্র নিয়েও নানা সমালোচনা রয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, পুলিশি আচরণ, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কিংবা রাজনৈতিক মেরুকরণ নিয়ে দেশ-বিদেশে প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও বাস্তবতা যে ভারতের মতো বৃহৎ গণতন্ত্রে ছাত্র আন্দোলন জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হতে পারে, সরকারকে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত একজন মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতেও বাধ্য করতে পারে। গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি এখানেই।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে এই ঘটনাটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। এই অঞ্চলের বহু দেশ নিজেদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে দাবি করলেও বাস্তবে বিরোধী মত প্রকাশ, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কিংবা সরকারের সমালোচনার পর্যাপ্ত সুযোগ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। কোথাও প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে, কোথাও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার সমালোচনা শোনা যায়। ফলে গণতন্ত্রের মূল্যায়ন কেবল সংবিধানের ভাষায় নয়, বাস্তব রাজনৈতিক আচরণেও হওয়া উচিত।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ তাই শুধু একজন মন্ত্রীর বিদায় নয়, এটি তরুণ সমাজের বার্তা—রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করলে সেই প্রশ্নের উত্তর সরকারকে দিতেই হবে। এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্রে ক্ষমতার আসল মালিক জনগণ। জনগণের বিশ্বাস হারালে কোনো পদই চিরস্থায়ী নয়।
ছাত্রসমাজ ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে পরিবর্তনের অনুঘটক হয়েছে। ভারতের সাম্প্রতিক আন্দোলন সেই ইতিহাসে আরেকটি নতুন অধ্যায় যোগ করল। মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে, রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু একটি সত্য অস্বীকার করা কঠিন যে রাষ্ট্রে তরুণদের কণ্ঠস্বর শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার করিডোরে প্রতিধ্বনিত হয়, সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি এখনও জীবন্ত।
আজকের ভারতের এই অধ্যায় দক্ষিণ এশিয়ার সব রাষ্ট্রের জন্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা—গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি ক্ষমতায় থাকা নয়, জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে পারা।
লেখক: সাংবাদিক