বাংলাদেশে প্রতিবছর জুলাই-আগস্ট মাসে বর্ষা মৌসুম তীব্র আকার ধারণ করে। এ সময় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বর্ষণ, বন্যা, পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা এবং সড়ক যোগাযোগে বিঘ্ন একটি নিয়মিত বাস্তবতা। এমন পরিস্থিতিতে এস.এস.সি, এইচ.এস.সি কিংবা সমমানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষা আয়োজন করলে পরীক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক এবং প্রশাসন—সবার জন্যই বাড়তি চাপ ও দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়।
চলতি বছরের এইচ.এস.সি পরীক্ষায় এর বাস্তব উদাহরণ দেখা গেছে। বন্যা ও পাহাড়ধসের কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন পাঁচ জেলার একাধিক বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে। এতে শুধু ওই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি; বরং অভিন্ন প্রশ্নপত্রভিত্তিক জাতীয় পরীক্ষা ব্যবস্থাপনায়ও অতিরিক্ত জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে ভবিষ্যতে অতি ভারী বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে। তাই পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণে শুধু শিক্ষাবর্ষ নয়, দেশের আবহাওয়া, ভৌগোলিক বৈচিত্র্য ও দুর্যোগের বাস্তবতাকেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
বর্ষাকালে পাবলিক পরীক্ষা আয়োজনের ফলে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বন্যা, পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক পরীক্ষার্থী সময়মতো পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারে না। বিশেষ করে দুর্গম ও পার্বত্য এলাকার (বান্দরবান) মতো পাহাড়ি এলাকার শিক্ষার্থীরা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। সড়ক ও নৌ যোগাযোগ ব্যাহত হলে পরীক্ষা পরিচালনা, প্রশ্নপত্র পরিবহন এবং তদারকিতেও জটিলতা তৈরি হয়।
এছাড়া কোনো একটি অঞ্চলে পরীক্ষা স্থগিত হলে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, পরীক্ষার নিরপেক্ষতা, বিকল্প প্রশ্নপত্র ব্যবস্থাপনা, বিকল্প সেটের এক্সামে রেজাল্টে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বজায় রাখা এবং ফল প্রকাশের নির্ধারিত সময়সূচি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর প্রভাব শুধু প্রশাসনের ওপর নয়, শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতির ওপরও পড়ে।
বিশ্বের বিভিন্ন দুর্যোগপ্রবণ দেশ শিক্ষা ক্যালেন্ডার নির্ধারণে স্থানীয় আবহাওয়া ও প্রাকৃতিক ঝুঁকিকে গুরুত্ব দেয়। জাপান, ফিলিপাইনসহ বিভিন্ন দেশ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে শিক্ষা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশেও নিজস্ব জলবায়ু ও ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি দীর্ঘমেয়াদি পাবলিক পরীক্ষা ক্যালেন্ডার প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
এসব বাস্তবতা বিবেচনায় এস.এস.সি পরীক্ষার জন্য ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে মার্চের ২য় সপ্তাহ পর্যন্ত সময়টি তুলনামূলকভাবে উপযোগী হতে পারে। এ সময় শীতের তীব্রতা থাকে না, আবার বর্ষা বা তীব্র তাপপ্রবাহও শুরু হয় না। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে।
অন্যদিকে এইচ.এস.সি পরীক্ষার জন্য অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে নভেম্বর মাস অধিক উপযোগী হতে পারে। এ সময় বর্ষা বিদায় নেয়, অধিকাংশ অঞ্চলের বন্যার পানি নেমে যায় এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাও স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে আরও একটি বিকল্প গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। সেটি হলো—এসএসসি এবং এইচএসসি —উভয় পরীক্ষাই ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে মার্চে অতিরিক্ত গরম পড়ার আগেই পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করা। এতে হল ব্যবস্থাপনা ও জনবল সমন্বয়ে অতিরিক্ত পরিকল্পনার প্রয়োজন হলেও এর ব্যাপক সুফলও রয়েছে। এর ফলে, বছরের অন্যান্য সময়ে স্কুল-কলেজে নিয়মিত পাঠদান অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে এবং বর্ষাকালজনিত অনিশ্চয়তাও অনেকাংশে এড়ানো যাবে।
বি. দ্র. অবশ্য কোনো বিকল্পই শতভাগ নিখুঁত নয়। প্রতিটি ব্যবস্থারই কিছু সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সময় পরিবর্তনের সঙ্গে শিক্ষাবর্ষ, ভর্তি কার্যক্রম, শিক্ষক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়ের প্রয়োজন হবে। তবে প্রতিবছর দুর্যোগের কারণে পরীক্ষা স্থগিত, পুনঃসূচি নির্ধারণ এবং শিক্ষার্থীদের অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাওয়াও একটি বড় সমস্যা।
এবার সারা দেশে ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলিয়ে মোট পরীক্ষার্থী ছিলেন ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত একটি জাতীয় পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণে আরও দূরদর্শী পরিকল্পনা প্রয়োজন।
পাবলিক পরীক্ষা শুধু শিক্ষার্থীর মেধা মূল্যায়নের মাধ্যম নয়; এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তাই পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণে দেশের জলবায়ু, ভৌগোলিক বৈচিত্র্য এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার বাস্তবতাকে সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
দুর্যোগকে নিয়ন্ত্রণ করা সব সময় সম্ভব নয়, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে দুর্যোগের ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তাই পাবলিক পরীক্ষার সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি সময়ের বাস্তব দাবি। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও প্রশাসনের দুর্ভোগ কমবে এবং দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থা হবে আরও নিরাপদ, কার্যকর ও নিরবচ্ছিন্ন।
লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠাতা, কক্স কেয়ার (Cox's Care)
সহকারী তথ্য অফিসার, তথ্য অফিস, লামা