পার্বত্য চট্টগ্রামে বন্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এই বন্যা এখন আরও ঘন ঘন, আরও তীব্র এবং আরও দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে। বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনপদে বন্যা মানেই শুধু রাস্তা ভেঙে যাওয়া, সেতু বিচ্ছিন্ন হওয়া কিংবা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নয়; এর সবচেয়ে গভীর আঘাতটি পড়ে শিশুদের শিক্ষাজীবনে। প্রতিবার দুর্যোগের পর সংবাদমাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব প্রকাশিত হয়, কিন্তু খুব কমই আলোচনায় আসে—এই কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাসে কত হাজার শিশু শেখার সুযোগ হারাল, কতজনের শিক্ষাজীবন পিছিয়ে গেল, আর কতজন হয়তো আর কোনো দিনই শ্রেণিকক্ষে ফিরে এল না।
পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা এমনিতেই ভৌগোলিক বৈষম্যের মুখোমুখি। অনেক শিশুকে প্রতিদিন দীর্ঘ পাহাড়ি পথ হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে হয়। কোথাও ঝিরি, কোথাও খাল, কোথাও নৌকা পার হয়ে পৌঁছাতে হয় স্কুলে। বন্যা এলে এসব পথ মুহূর্তেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়, আবার অনেক বিদ্যালয়ের ভবন ও শিক্ষাসামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও শিশুদের শেখার কোনো কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে ওঠে না।
এই পরিস্থিতিকে শুধু ‘ক্লাস বন্ধ’ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে লার্নিং লস বা শেখার ক্ষতি। UNESCO, UNICEF এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায় দেখানো হয়েছে, দীর্ঘদিন বিদ্যালয়ের বাইরে থাকলে শিশুদের পড়া, লেখা ও গণিতের মৌলিক দক্ষতা দ্রুত কমে যায়। ছোট শ্রেণির শিশুদের ক্ষেত্রে এই ক্ষতি আরও বেশি, কারণ এই সময়েই ভাষা, সংখ্যা ও চিন্তাশক্তির ভিত্তি তৈরি হয়। একবার সেই ভিত্তি দুর্বল হয়ে গেলে পরবর্তী শ্রেণির পাঠ আয়ত্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বজুড়ে যে শিক্ষাবিরতি ঘটেছিল, তা থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা ছিল—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যত দ্রুত বন্ধ হয়, শেখার ক্ষতি পূরণ করতে তার চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে। বাংলাদেশও সেই অভিজ্ঞতার বাইরে নয়।
পাহাড়ি শিশুদের জন্য সংকটটি আরও গভীর। বন্যার পর অনেক পরিবার জীবিকা পুনর্গঠনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শিশুরা পরিবারের কাজে যুক্ত হয়—কেউ কৃষিকাজে, কেউ জ্বালানি কাঠ সংগ্রহে, কেউ ছোটখাটো আয়ের কাজে। ফলে বিদ্যালয়ে ফেরার পথ দীর্ঘ হয়। বিশেষ করে কিশোরীদের ক্ষেত্রে অল্প বয়সে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া, বাল্যবিবাহ কিংবা স্থায়ীভাবে ঝরে পড়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য এই সংকট আরও জটিল, কারণ ভাষাগত ও ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা তাদের বিদ্যালয়ে ফিরে আসাকে আরও কঠিন করে তোলে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে পার্বত্য চট্টগ্রামে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। অর্থাৎ আজকের বন্যাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আগামী বছর, তার পরের বছর—এ ধরনের দুর্যোগ আবারও আসতে পারে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা পরিকল্পনায় এখনো দুর্যোগ-পরবর্তী শিক্ষা পুনরুদ্ধারকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আমরা ত্রাণ নিয়ে ভাবি, পুনর্বাসন নিয়ে ভাবি, কিন্তু শিশুদের হারিয়ে যাওয়া শিক্ষাসময় ফিরিয়ে আনার জন্য সুস্পষ্ট কোনো কাঠামোগত উদ্যোগ খুব একটা দেখা যায় না। অথচ শিক্ষা শুধু একটি সেবা নয়; এটি দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধারের অন্যতম ভিত্তি। একটি শিশু যত দ্রুত বিদ্যালয়ে ফিরতে পারে, তার মানসিক সুস্থতা, সামাজিক সংযোগ এবং ভবিষ্যতে ঝরে পড়ার ঝুঁকি তত কমে।
তাই এখন সময় এসেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য একটি পৃথক দুর্যোগ-সহনশীল শিক্ষা পরিকল্পনা গ্রহণের। বন্যার পর শুধু বিদ্যালয় খুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের শেখার ঘাটতি মূল্যায়ন করে লার্নিং রিকভারি প্রোগ্রাম, অতিরিক্ত পাঠদান, ক্যাচ-আপ ক্লাস, স্থানীয় ভাষা-সংবেদনশীল শিক্ষাসামগ্রী, মোবাইল শিক্ষা কার্যক্রম এবং প্রয়োজনে অস্থায়ী শেখার কেন্দ্র চালু করতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি শিশুদের মানসিক সহায়তাকেও শিক্ষা পুনরুদ্ধারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে দুর্যোগপ্রবণ বিদ্যালয়গুলোর জন্য আগাম প্রস্তুতি, বিকল্প পাঠদান ব্যবস্থা এবং দ্রুত শিক্ষা পুনরুদ্ধারের একটি জাতীয় নির্দেশিকাও প্রয়োজন।
সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং বেসরকারি সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যেমন খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসা অপরিহার্য, তেমনি শিক্ষাকেও জরুরি সেবার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ একটি হারিয়ে যাওয়া শিক্ষাবর্ষ শুধু একটি শ্রেণির ক্ষতি নয়; এটি একটি প্রজন্মের সম্ভাবনার ক্ষয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বন্যা একদিন নেমে যাবে। নদীর পানি সরে যাবে, ভাঙা রাস্তা মেরামত হবে, ঘরবাড়িও আবার গড়ে উঠবে। কিন্তু আজ যে শিশু শেখার সুযোগ হারাচ্ছে, তার হারিয়ে যাওয়া সময় আর কখনোই পুরোপুরি ফিরে আসবে না। তাই পাহাড়ে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি গণনার সময় ঘরবাড়ি, সড়ক আর ফসলের পাশাপাশি আমাদের আরেকটি হিসাবও রাখতে হবে—কতটি শিশুর শিক্ষাসময় হারিয়ে গেল। কারণ হারিয়ে যাওয়া শিক্ষাসময়ই ভবিষ্যতে হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার অন্য নাম। আজ পাহাড়ের একজন শিশুর খাতা বন্ধ হয়ে গেলে, আগামী দিনের বাংলাদেশের সম্ভাবনারও একটি পাতা বন্ধ হয়ে যায়।
লেখক: কথাসাহিত্যিক