ত্রাণের ব্যাগে স্থানীয় মৌসুমি ফলও থাকুক

দীপু মাহমুদ

মতামত

বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আগাম সতর্কতা, আশ্রয়কেন্দ্র, উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণ- এসব ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা

2026-07-11T15:16:13+00:00
2026-07-11T15:16:13+00:00
  রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬,
২৮ আষাঢ় ১৪৩৩
 
রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬
মতামত
ত্রাণের ব্যাগে স্থানীয় মৌসুমি ফলও থাকুক
দীপু মাহমুদ
শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৩:১৬ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আগাম সতর্কতা, আশ্রয়কেন্দ্র, উদ্ধার ও ত্রাণ বিতরণ- এসব ক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনে বন্যার ধরন ও ব্যাপ্তি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। ফলে দুর্যোগ মোকাবিলার কৌশলও বদলাতে হবে। শুধু মানুষকে বাঁচিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়, তাদের সুস্থ রাখার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে শিশুদের পুষ্টি ও সুরক্ষাকে ত্রাণ ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনার সময় এখনই।

চলমান বন্যায় চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকাসহ দেশের উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে। কোথাও কৃষিজমি তলিয়ে গেছে, কোথাও যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। দুর্গত মানুষের কাছে পৌঁছাতে প্রশাসন, সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ নিরলসভাবে কাজ করছে। এই মানবিক উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

তবে প্রতিটি বন্যার মতো এবারও সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে শিশুরা। তাদের জন্য নিরাপদ পানির সংকট দেখা দিয়েছে, তাদের স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাব আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুষ্টিকর খাদ্যের ঘাটতি। দুর্যোগের সময় শিশুদের শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজের ঘাটতি দ্রুত তৈরি হয়। ফলে ডায়রিয়া, শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণসহ নানা রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অপুষ্টির প্রভাব আবার তাৎক্ষণিক অসুস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটা শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, মস্তিষ্কের বিকাশ এবং শেখার সক্ষমতার ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।

আমাদের ত্রাণ ব্যবস্থাপনার শক্তিশালী ঐতিহ্য আছে। চাল, ডাল, আলু, চিড়া, মুড়ি, গুঁড়, বিস্কুট ও নিরাপদ পানি- এসব ছাড়া জরুরি ত্রাণের কথা কল্পনাই করা যায় না। কিন্তু একটি প্রশ্ন এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ত্রাণ কি শুধু ক্ষুধা নিবারণের জন্য, নাকি মানুষের পুষ্টি নিশ্চিত করার জন্যও?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে একটি সহজ অথচ কার্যকর ধারণা সামনে আসে। ত্রাণসামগ্রীর সঙ্গে স্থানীয় মৌসুমি ফল অন্তর্ভুক্ত করা। যেমন- পেয়ারা, লটকন, জামরুল, কাঁঠাল, পাকা তাল কিংবা যে অঞ্চলে যে ফল সহজলভ্য। এসব ফল শুধু ভিটামিন ও খনিজের উৎস নয়, এগুলো রান্না ছাড়াই খাওয়া যায়, শিশুদের জন্য উপযোগী এবং স্থানীয় বাজার থেকেই দ্রুত সংগ্রহ করা সম্ভব। অর্থাৎ এগুলো একই সঙ্গে পুষ্টিকর, সহজলভ্য এবং বাস্তবসম্মত।

এই প্রস্তাবের আরেকটি বড় শক্তি এর অর্থনৈতিক তাৎপর্য। বন্যার সময় বহু ফলচাষি কার্যত বাজার হারিয়ে ফেলেন। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, পরিবহন ব্যাহত হয়, পাইকাররা পৌঁছাতে পারেন না। ফলে গাছে ঝুলে থাকা বা বাগানে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ ফল নষ্ট হয়। অন্যদিকে কয়েক কিলোমিটার দূরের বন্যার্ত  শিশুরা পুষ্টিকর খাবারের অভাবে দিন কাটায়। এই বৈপরীত্য দূর করা অসম্ভব নয়। সরকার, স্থানীয় প্রশাসন কিংবা ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো যদি স্থানীয় কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি মৌসুমি ফল সংগ্রহ করে ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করে, তাহলে একই উদ্যোগে তিনটি সুফল মিলবে। দুর্গত মানুষ পাবে পুষ্টিকর খাদ্য, কৃষক পাবেন তাঁর উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য, আর স্থানীয় অর্থনীতির চাকা সচল থাকবে।

বাংলাদেশে কাঁঠাল, পেয়ারা, লটকন, জামরুল বা পাকা তাল কেবল ফল নয়, এগুলো আমাদের স্থানীয় কৃষির অংশ, গ্রামীণ অর্থনীতির অংশ। দুর্যোগের সময় এই সম্পদকে কাজে লাগাতে না পারা একধরনের অপচয়। ত্রাণের জন্য দূর-দূরান্ত থেকে সবকিছু বহন করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার আশপাশের উৎপাদনকেও পরিকল্পনার মধ্যে আনা উচিত। এতে পরিবহন ব্যয় কমবে, বিতরণ দ্রুত হবে এবং স্থানীয় উৎপাদকরাও দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধারে কিছুটা শক্তি পাবেন।

শিশু সুরক্ষার প্রশ্নেও এই ভাবনার গুরুত্ব আছে। আমরা সাধারণত শিশু সুরক্ষা বলতে আশ্রয়, নিরাপত্তা, চিকিৎসা কিংবা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া ঠেকানোর বিষয়গুলোকে বুঝি। কিন্তু পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করাও শিশু সুরক্ষার মৌলিক উপাদান। ক্ষুধার্ত শিশু যেমন ঝুঁকিতে থাকে, তেমনি অপুষ্ট শিশুও ঝুঁকিতে থাকে। তাই ত্রাণ ব্যবস্থাপনাকে শুধু খাদ্য বিতরণের কর্মসূচি হিসেবে নয়, শিশু সুরক্ষার সমন্বিত কর্মসূচি হিসেবে দেখতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় বাংলাদেশে বন্যা আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হবে- এমন পূর্বাভাস বহুদিন ধরেই দেওয়া হচ্ছে। তাই আমাদের নীতিগত চিন্তায়ও নতুনত্ব আনতে হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পরবর্তী ধাপ হওয়া উচিত ‘ক্যালরি থেকে পুষ্টির দিকে’ অগ্রসর হওয়া। অর্থাৎ শুধু মানুষকে খাওয়ানো নয়, তাদের সুস্থ রাখার জন্য কী প্রয়োজন, সেটিও সমান গুরুত্ব দেওয়া।

ত্রাণের ব্যাগে স্থানীয় মৌসুমি ফল যুক্ত করার প্রস্তাব কোনো বিলাসী ধারণা নয়, কোনো ব্যয়বহুল কর্মসূচিও নয়। বরং এটা এমন একটি উদ্ভাবনী উদ্যোগ, যা একই সঙ্গে শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে পারে, স্থানীয় কৃষকের পাশে দাঁড়াতে পারে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও মানবিক ও কার্যকর করে তুলতে পারে। বাংলাদেশের মতো দুর্যোগপ্রবণ দেশে এমন ছোট কিন্তু দূরদর্শী নীতিগত পরিবর্তনই বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। এখন প্রয়োজন এই ভাবনাকে পরীক্ষামূলকভাবে হলেও বাস্তবে প্রয়োগ করার সাহস। কারণ, দুর্যোগের সময়ে একটি পুষ্টিকর ফলও কখনো কখনো একজন শিশুর সুস্থ ভবিষ্যতের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হয়ে উঠতে পারে।

লেখক : কথাসাহিত্যিক 


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: