তিতাস নদীর মতোই প্রবহমান কবির জীবন

আবদুর রহমান মল্লিক

মতামত

বাংলা সাহিত্যের বিস্ময় আল মাহমুদ। কবি আল মাহমুদ। ছিটেফোঁটা সান্নিধ্য পাবার সুযোগ হয়েছিল তাঁর জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে। এক

2026-07-11T15:09:24+00:00
2026-07-11T15:09:24+00:00
  রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬,
২৮ আষাঢ় ১৪৩৩
 
রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬
মতামত
কবি আল মাহমুদের জন্মদিন আজ
তিতাস নদীর মতোই প্রবহমান কবির জীবন
আবদুর রহমান মল্লিক
শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬, ৩:০৯ পিএম 
কবি আল মাহমুদ
বাংলা সাহিত্যের বিস্ময় আল মাহমুদ। কবি আল মাহমুদ। ছিটেফোঁটা সান্নিধ্য পাবার সুযোগ হয়েছিল তাঁর জীবনের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে। এক সন্ধ্যায় আমরা ‘সারেঙ’-এর ক’জন কবির সাথে কাটিয়েছিলাম বেশ কিছু সময়। তার কথা শুনে সীমাহীন মুগ্ধতায় মনপ্রাণ ভরে গিয়েছিল। কী সুন্দর করে কথা বলেন। একজন বড় কবির ভেতর বাহির এত সুন্দর হয়, আগে ততটা বুঝতে পারিনি। নিজেকে জাহির করার বিন্দুমাত্র প্রবণতা তার মাঝে লক্ষ করিনি। কোনো প্রশ্ন করলে উত্তর দিতেন ছোট্ট করে, অথচ তা ছিল পরিপূর্ণ।

সেদিন তাকে প্রশ্ন করেছিলাম, ‘যা সৃষ্টি করলেন; তা নিয়ে কি আপনি তৃপ্ত?’ বলেছিলেন, ‘পেটপুরে খেয়েছি বলে আর খাব না, তা তো নয়।’ কোনো সম্পূরক প্রশ্ন করার যেন জো-ই থাকে না। লেখা আর কথার জাদুতে তিনি মুগ্ধ করেছেন সবাইকে। তিতাস নদীর মতোই তাঁর জীবনে বয়ে গেছে প্রবহমান এই বাংলাদেশ পালতোলা নৌকার মতো। মৃত্তিকার কবি হিসেবে জীবনকে দেখেছেন একেবারে সহজ করে। যতটুকু বুঝেছি, কবির জীবনে কোনো সংশয় কিংবা দ্বিধা ছিল না। তাই নিজেকে মেলে ধরতে পেরেছেন বিলের শাপলার মতো বিকশিত করে। বার্ধক্যে এসে যখন বয়সের ভারে ন্যূব্জ, অন্যের সাহায্য ছাড়া চলতে পারেন না। তখনো তিনি তাঁর জীবনের সব ঘটনা প্রবাহ অকপটে বলে যেতে পারতেন। সোনালি কাবিনের চল্লিশ বছর অনুষ্ঠানে তিনি যে বক্তব্য প্রদান করেন, তা কবি জীবনের মহিমাকেই তুলে ধরেছে। বয়সের কারণে আলোচনার ধারাবাহিকতায় এতটুকু ছেদ পড়েনি। যেখানে অনেক তরুণ ও বোদ্ধারাও খেই হারিয়ে ফেলেন।

তিনি বলে গেলেন, ‘আমি বলব না যে আমি ক্লান্ত, তবে বয়সের কারণে চোখে দেখতে পাই না। কানে শুনতে পাই না, এসব। যখন যুবক ছিলাম; মনে করতাম পড়তে পড়তে কাটিয়ে দেব। কখনো সেটা হয় না। একদিন দেখা গেল চোখে দেখতে পাই না। চোখে দেখতে পাই না, পাগল হয়ে যাবার অবস্থা। চোখে দেখতে পাই না সারা দুনিয়া। এই পৃথিবীতে যতবড় শহর আছে লন্ডন নিউইয়র্ক প্যারিস কোনোটি কি আর বাদ রেখেছি। সব ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চলে এসেছি।’

ভার দ্রোহের উচ্চারণ, ‘আল্লাহর রহমত যে হায়াত আমাকে তিনি দিয়েছেন। এই হায়াতের প্রকৃতপক্ষে খুব বেশি অপব্যয় করিনি। আমি লিখেছি ভালো হোক বা মন্দ হোক। আমি তো লিখে গেছি। শুধু যে পদ্য লিখেছি, কাব্য করেছি; তা নয়। আমিও গদ্য লিখেছি। আপনারা যারা আমার গদ্য পড়েছেন; তারা বুঝতে পারবেন যে আমি গদ্যেও সমানভাবে কাজ করতে পেরেছি। কাজ করতে আমার কোমরে দুইটা তলোয়ার ছিল—গদ্য এবং পদ্য। আমি দুটোকেই কাজে লাগিয়েছি।’

আল মাহমুদকে ব্যাখ্যা করেছেন সমসাময়িক বাংলা ভাষার বহু কবি ও সাহিত্যিক। সেখানে তাঁর সাহিত্য প্রতিভার যথার্থ মূল্যায়ন তারা করেছেন। তাঁর সারা জীবনের সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতি মিলেছে জীবদ্দশায়ই। অনেকের বক্তব্য ও নিবন্ধ এই সংখ্যায় (সারেঙ) প্রকাশিত হয়েছে।

স্বনামধন্য বাঙালি চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ, দার্শনিক এবং সাহিত্য সমালোচক শিব নারায়ন রায় বলেছেন, ‘পঁচাত্তর সালে আল মাহমুদের সঙ্গে প্রথম চাক্ষুষ পরিচয় হবার আগে থেকেই আমি তাঁর কবিতার একজন মুগ্ধ পাঠক। সমকালীন যে দুজন বাঙালি কবির মৌলিকতা এবং বহমানতা আমাকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে; তাঁদের মধ্যে একজন হলেন বাংলাদেশের আল মাহমুদ, অন্যজন পশ্চিমবঙ্গের শক্তি চট্টোপাধ্যায়।’

কবি আল মাহমুদের যে বিষয়টি আমাকে সবচাইতে চমৎকৃত করে—সেটি হচ্ছে, নবীন লেখকদের তিনি অকাতরে প্রেরণা জুগিয়েছেন, নির্দেশনা দিয়েছেন। কাজী জহিরুল ইসলাম যেমন করে বলেছেন, আল মাহমুদ একদিন বলেন, তোমাকে স্বার্থপর হতে হবে, বুঝলে কবি। আমি তো অবাক। স্বার্থপর না হওয়ার চেষ্টাই তো আমি সারাজীবন করছি। তিনি বলেন, ‘তোমাকে বুঝতে হবে, কখন আড্ডা ছেড়ে উঠে আসতে হয়। বন্ধুরা টেনে ধরবে কিন্তু তোমাকে উঠে যেতে হবে। তোমাকে লিখতে হবে। না লিখে শুধু আড্ডাবাজী করে কেউ সাহিত্যে টিকে থাকতে পারে না। কবি শহীদ কাদরীও একদিন আড্ডা ছেড়ে উঠে আসা প্রসঙ্গে বলছিলেন, শামসুর রাহমান তাঁকে বলেছিলেন, আড্ডা ছেড়ে উঠে যান, লিখতে বসুন। না হলে কবিতা চলে যাবে।’

সোনালি কাবিন শুধু নয়, আল মাহমুদ লিখে গেছেন রাশি রাশি অমিয় কবিতা, লিখেছেন গল্প-উপন্যাস। শেষমেষ মহাকাব্য। ‘জীবন যখন বাঁক ঘোরে’ গল্পগ্রন্থটি সম্ভবত কবির জীবদ্দশায় প্রকাশিত শেষ সাহিত্যকর্ম। যেটি পড়ে গভীরভাবে আপ্লুত হয়েছি। আর মনে মনে ভেবেছি, বিয়ের আগে কেন এমন একটা বই পড়তে পারলাম না। প্রেমিক-প্রেমিকার সাথে শুধু নয়, মানুষে মানুষে ভালোবাসার মেলবন্ধন সৃষ্টির সাধনাই যেন তিনি করে গেছেন সারাজীবন। ঠিক যেন রবীন্দ্রনাথের মতো, ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে তরী/ আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।’ সৃষ্টিতে মননে রবীন্দ্রনাথ যেমন জীবনের পরিপূর্ণতা নিয়ে চলে গেছেন। আল মাহমুদ যেন তাকেই ধারণ করেছেন। তারই অনুগামী হয়েছেন।

নবীন লেখকদের জন্য আল মাহমুদ প্রেরণার স্থল। কারণ তিনি তার চারপাশের মানুষগুলোর মাঝে স্বপ্ন জাগিয়েছেন, ভালোবাসতে শিখিয়েছেন, দেশমাতৃকার জন্য হৃদয়টাকে মেলে ধরতে শিখিয়েছেন। তার রচনার পরতে পরতে বিধৃত হয়েছে প্রকৃতি প্রেম, দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ, অধ্যাত্মবোধ ও মহান মুক্তিযুদ্ধের শানিত চেতনা। ইংরেজ কবি যেমন বলেছিলেন, ‘আই ওয়ান্ট টু ড্রিঙ্ক লাইফ টু দ্য লি।’ কবি আল মাহমুদও আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে পান করেছেন জীবনের তলানি পর্যন্ত। সৃষ্টির নেশা তার ছিল, অতৃপ্তি ছিল না কোনো। তিতাস নদীর মতোই বহমান ছিল তাঁর জীবন।

লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক ও সারেঙ সম্পাদক


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: