সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে কিশোর গ্যাং, শিশু-কিশোর সহিংসতা, মাদকাসক্তি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি কিংবা অনলাইন অপরাধে শিশুদের সম্পৃক্ততা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বেড়েছে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয় শহর, জেলা শহর, এমনকি উপজেলা পর্যায়েও কিশোর গ্যাং এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো নগর সমস্যার নাম নয়, এটা ধীরে ধীরে সামাজিক বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। প্রতিবার কোনো ঘটনা ঘটার পর আমরা আইনশৃঙ্খলা, পারিবারিক ভাঙন, প্রযুক্তির অপব্যবহার, সামাজিক অবক্ষয় কিংবা মাদকের বিস্তার নিয়ে আলোচনা করি। কিন্তু একটি প্রশ্ন প্রায় সবসময়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়- একটি সমাজ তার শিশুদের কাছ থেকে কী কেড়ে নিয়েছে?
কারণ কিশোর অপরাধের জন্ম সাধারণত কিশোর বয়সে হয় না। তার বীজ রোপিত হয় আরও আগে, শিশু বয়সে। একজন শিশু যখন নিয়মিত বই পড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, যখন তার আশপাশে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কোনো পরিবেশ থাকে না, যখন সে নিজেকে প্রকাশ করার জন্য কোনো মঞ্চ পায় না, যখন তার বিকেলগুলো অর্থপূর্ণ সামাজিক সম্পৃক্ততার বদলে উদ্দেশ্যহীনভাবে কেটে যায়, তখন সেই শূন্যতা কোনো না কোনো কিছু দিয়ে পূরণ হয়। সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় শূন্যতা কখনো দীর্ঘ সময় খালি থাকে না, সেটা দখল করে অন্য কোনো শক্তি, অন্য কোনো পরিচয়, অন্য কোনো আকর্ষণ।
এই জায়গায় বাটারফ্লাই ইফেক্ট বা প্রজাপতি প্রভাবের ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। বিশৃঙ্খলা তত্ত্বের এই ধারণা বলে, ছোট একটি পরিবর্তন অনেক সময় বহু দূরের এবং অনেক বড় একটি ফলাফল তৈরি করতে পারে। বাস্তব সমাজেও আমরা প্রায়ই একই বিষয় দেখি। একটি উপজেলার লাইব্রেরি বন্ধ হয়ে যাওয়া, একটি শিশু সংগঠনের কার্যক্রম থেমে যাওয়া, একটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের প্রাণশক্তি হারিয়ে ফেলা কিংবা শিশুদের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের দুর্বল হয়ে পড়া- এসব ঘটনাকে আলাদাভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এগুলোর সম্মিলিত প্রভাব একটি প্রজন্মের মানসিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক গঠনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
একজন শিশু বিকেলে কোথায় যায়, কাদের সঙ্গে সময় কাটায়, কী নিয়ে ভাবে, কী নিয়ে স্বপ্ন দেখে- এই প্রশ্নগুলো কোনোভাবেই ছোট প্রশ্ন নয়। কারণ শিশুর ব্যক্তিত্ব, মূল্যবোধ এবং সামাজিক পরিচয় তৈরির বড় অংশ গড়ে ওঠে বিদ্যালয়ের বাইরের সময়গুলোতে। যে শিশু বিকেলে আবৃত্তি শেখে, নাটকের মহড়ায় অংশ নেয়, ছবি আঁকে, বই পড়ে কিংবা বিজ্ঞান ক্লাবে যায়, সে কেবল একটি দক্ষতা অর্জন করে না, সে দলগতভাবে কাজ করা শেখে, মতবিনিময় শেখে, ব্যর্থতা মেনে নেওয়া শেখে, নিজের আবেগ প্রকাশ করা শেখে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে অন্য মানুষের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি বুঝতে শেখে।
অন্যদিকে, যে শিশু তার সমস্ত অবসর সময় অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল পরিবেশে, উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরিতে অথবা নেতিবাচক প্রভাববলয়ের মধ্যে কাটায়, তার সামাজিকীকরণের ধরন ভিন্ন হয়। এখানে আবারও ভুল বোঝার সুযোগ নেই। স্মার্টফোন বা প্রযুক্তি নিজে কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন প্রযুক্তি শিশুদের একমাত্র সামাজিক ও মানসিক আশ্রয়ে পরিণত হয় এবং তার বিকল্প হিসেবে পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র কোনো ইতিবাচক পরিসর তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।
একসময় বাংলাদেশের শহর ও মফস্বলে শিশুদের জন্য পাঠচক্র, নাট্যদল, আবৃত্তি সংগঠন, শিশু সংগঠন, খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তৃত পরিসর ছিল। বিদ্যালয়ের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পাড়ার ক্লাব, স্থানীয় লাইব্রেরি কিংবা জেলা পর্যায়ের শিশু সংগঠন অনেক শিশুর জীবনে পরিচয় ও সম্পৃক্ততার অনুভূতি তৈরি করত। আজও সেসব উদ্যোগ পুরোপুরি বিলীন হয়নি, কিন্তু তার ব্যাপ্তি ও সামাজিক গুরুত্ব নিঃসন্দেহে কমেছে। একই সময়ে বেড়েছে স্ক্রিন-নির্ভর একাকিত্ব, দ্রুত উত্তেজনার প্রতি আকর্ষণ এবং তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি পাওয়ার সংস্কৃতি।
কিশোর গ্যাংয়ের সামাজিক মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই গোষ্ঠীগুলো শিশু ও কিশোরদের তিনটি মৌলিক চাহিদাকে লক্ষ্য করে- পরিচয়, গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্ষমতার অনুভূতি। একজন কিশোর চায় সে কোনো একটি দলের অংশ হোক, সে গুরুত্বপূর্ণ বোধ করুক এবং তার উপস্থিতির মূল্য থাকুক। সমাজ যদি তাকে এই অনুভূতি একটি নাট্যদল, স্কাউট দল, ক্রীড়া সংগঠন কিংবা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দিতে না পারে, তাহলে সে অন্য কোথাও সেটা খুঁজবে। অনেক সময় কিশোর গ্যাং সেই অপূর্ণ সামাজিক চাহিদার বিকৃত প্রতিস্থাপন হিসেবে কাজ করে।
একটি নাট্যদলে যেমন দলনেতা থাকে, তেমনি গ্যাংয়েও নেতা থাকে। একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের যেমন নিজস্ব পরিচয় ও প্রতীক থাকে, গ্যাংয়েরও থাকে। একটি বিতর্ক সংগঠন যেমন সদস্যদের আত্মপরিচয় তৈরি করে, গ্যাংও একই কাজ করে- তবে ভিন্ন উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ সমস্যাটি কেবল অপরাধের নয়, এটা বিকল্প সামাজিক পরিচয়েরও প্রশ্ন।
এই বাস্তবতায় শিশু-কিশোরদের জন্য রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। কারণ রাষ্ট্রের পক্ষে পরিবারকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তেও হস্তক্ষেপ করা সম্ভব নয়, কিন্তু রাষ্ট্র চাইলে শিশুদের জন্য ইতিবাচক সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরিতে বিনিয়োগ করতে পারে। একটি জাতীয় শিশু প্রতিষ্ঠান যদি দেশের প্রতিটি উপজেলায় বইপড়া আন্দোলন, শিশু নাট্যচর্চা, বিজ্ঞান ক্লাব, সৃজনশীল লেখালেখি, সংগীত ও চিত্রাঙ্কনের মতো কার্যক্রমকে সক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে, তাহলে সেটি শুধু সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাবে না, এটা সামাজিক সুরক্ষারও একটি পরোক্ষ ব্যবস্থা হয়ে উঠবে।
এই জায়গাতেই নেতৃত্বের প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি শিশু-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানকে কেবল প্রশাসনিক দপ্তর হিসেবে দেখা এবং সেটাকে একটি জাতীয় শিশু-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কেন্দ্র হিসেবে দেখার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। একটি দৃষ্টিভঙ্গি ফাইল, সভা, বাজেট এবং রুটিন কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেয়, অন্যটি অগ্রাধিকার দেয় শিশুর কল্পনাশক্তি, সৃজনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক বিকাশকে।
এখানে কোনো পেশা বা গোষ্ঠীকে ছোট করার প্রশ্ন নেই। একজন দক্ষ প্রশাসক একটি প্রতিষ্ঠান দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারেন। কিন্তু একটি শিশু প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি প্রয়োজন শিশুমন, শিশু সাহিত্য, শিশু সংস্কৃতি এবং শিশুর বিকাশগত চাহিদা সম্পর্কে গভীর বোঝাপড়া। কারণ শিশুদের জন্য কাজ করা মানে কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালনা করা নয়, এটা মূলত একটি প্রজন্মের কল্পনা, মূল্যবোধ এবং সামাজিক চরিত্র গঠনের সঙ্গে যুক্ত একটি দায়িত্ব।
একজন শিশু-মনস্ক নেতৃত্ব হয়তো একটি বন্ধ লাইব্রেরিকে শুধু অব্যবহৃত অবকাঠামো হিসেবে দেখবেন না, তিনি দেখবেন সেখানে হারিয়ে যাওয়া শত শত বিকেল। একটি বাতিল নাট্যকর্মশালাকে তিনি কেবল একটি অনুষ্ঠান বাতিল হওয়া হিসেবে দেখবেন না, তিনি দেখবেন সেখানে কিছু শিশুর আত্মবিশ্বাস তৈরির সুযোগ নষ্ট হয়ে গেছে। একটি উপজেলা পর্যায়ে বইপড়া কার্যক্রম না থাকাকে তিনি শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখবেন না, তিনি বুঝবেন যে এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক প্রভাব আছে।
অবশ্যই এটা বলা যাবে না যে শিশু একাডেমির নেতৃত্বে একজন শিশুসাহিত্যিক বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব থাকলেই কিশোর গ্যাং সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তেমনি এটাও বলা যাবে না যে প্রশাসনিক নেতৃত্বের কারণেই কিশোর অপরাধ বাড়ছে। সামাজিক বাস্তবতা কখনো এত সরল নয়। কিন্তু এটুকু বলা যায় যে, শিশুদের সাংস্কৃতিক বিকাশকে যদি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা না হয়, যদি শিশুদের জন্য রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ কেবল অবকাঠামো বা আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার সামাজিক মূল্য দিতে হয়।
বিশ্বের বহু দেশ কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পৃক্ততাকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে। কমিউনিটি লাইব্রেরি, স্কুল-পরবর্তী কার্যক্রম, শিল্প ও সংস্কৃতি শিক্ষা, খেলাধুলা এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে অংশগ্রহণকে তারা অপরাধ প্রতিরোধের নীতির অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কারণ গবেষণা বারবার দেখিয়েছে, যে শিশুদের ইতিবাচক সামাজিক সম্পৃক্ততা বেশি, তাদের ঝুঁকিপূর্ণ আচরণে জড়িয়ে পড়ার আশংকা তুলনামূলক কম।
বাংলাদেশেও হয়তো সময় এসেছে শিশুদের সাংস্কৃতিক অধিকারকে নতুনভাবে ভাবার। আমরা যখন কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করি, তখন আমাদের একই সঙ্গে প্রশ্ন করা দরকার- আমরা কি যথেষ্ট সংখ্যক লাইব্রেরি তৈরি করেছি? আমরা কি প্রতিটি উপজেলায় শিশুদের জন্য নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিশ্চিত করতে পেরেছি? আমরা কি শিশুদের জন্য পর্যাপ্ত মঞ্চ, পাঠাগার, বিজ্ঞান ক্লাব এবং সৃজনশীল চর্চার জায়গা তৈরি করেছি?
কারণ রাষ্ট্র যখন একজন শিশুর হাতে বই তুলে দিতে ব্যর্থ হয়, তখন কোনো না কোনো শক্তি তার হাতে অন্য কিছু তুলে দেওয়ার চেষ্টা করে। সেটা হতে পারে মাদক, সহিংসতা, উগ্রতা কিংবা অপরাধী পরিচয়ের মোহ। আর এই কারণেই শিশুদের জন্য সংস্কৃতি, সাহিত্য ও সৃজনশীলতা কোনো বিলাসিতা নয়, এটা একটি সমাজের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কৌশলের অংশ।
আমরা প্রায়ই অপরাধের শেষ দৃশ্যটি দেখি- গ্রেপ্তার, বিচার, কারাগার, অভিযান। কিন্তু একটি সমাজের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য আমাদের আরও আগে ফিরে যাওয়া দরকার, সেই হারিয়ে যাওয়া বিকেলগুলোর কাছে, যখন একজন শিশু বই পড়তে পারত, নাটক করতে পারত, গান শিখতে পারত, অথবা কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের দরজা দিয়ে প্রবেশ করে নিজের জন্য একটি ভিন্ন ভবিষ্যৎ আবিষ্কার করতে পারত।
কারণ প্রতিটি সমাজ শেষ পর্যন্ত তার শিশুদের কাছ থেকেই নিজের ভবিষ্যৎ ধার নেয়। আর সেই ভবিষ্যৎ কেমন হবে, তার সিদ্ধান্ত অনেক সময় শুরু হয় একটি লাইব্রেরির দরজা খোলা থাকবে কিনা, একটি নাট্যকর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে কিনা, কিংবা একটি শিশু প্রতিষ্ঠান সত্যিই শিশুদের স্বপ্নকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখবে কিনা- এই আপাত ছোট কিন্তু গভীরভাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর মধ্য দিয়ে।