স্বাধীনতার পর থেকে গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে একটি বিতর্ক বিভিন্ন মাত্রায় বারবার ফিরে এসেছে। ক্ষমতাসীন দল সব সময় দাবি করে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আর বিরোধী দল অভিযোগ করে দেশে আইনের শাসন নেই, চলছে শাসকের শাসন। সরকার পরিবর্তন হয়, রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলায়, কিন্তু আইনের শাসন নিয়ে প্রশ্ন ও আলোচনা কখনো থেমে থাকেনি।
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা এবং গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য আইনের শাসন অপরিহার্য। আইনের শাসন বলতে এমন একটি পরিস্থিতিকে বোঝায়, যেখানে রাষ্ট্রের সকল নাগরিক, প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা সমানভাবে আইনের অধীন থাকবে। সেখানে ব্যক্তি বা দলের ইচ্ছা নয়, আইনের বিধানই হবে চূড়ান্ত নিয়ামক।
বাস্তবতা হলো, সাধারণ মানুষের কাছে আইনের শাসনের মূল্য সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি হয় তখন, যখন তারা কোনো অন্যায়, নির্যাতন বা বৈষম্যের শিকার হয়। বিপদের মুহূর্তে একজন নাগরিক প্রথমে পুলিশের কাছে যান এবং পরে আদালতের দ্বারস্থ হন। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিচার বিভাগই আইনের শাসনের প্রধান বাহক। মানুষ যদি সেখানে নিরপেক্ষতা, ন্যায়বিচার এবং আইনি সুরক্ষা পায়, তবে রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আস্থা দৃঢ় হয়। আর যদি সে আস্থা ক্ষুণ্ন হয়, তবে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সম্পর্কও দুর্বল হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক মামলার ব্যবহার, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এসব বিতর্কের অনেকগুলো রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করা হলেও কিছু প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। কারণ আইনের শাসনের বিষয়টি কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক স্বার্থের বিষয় নয়, এটি রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক শর্ত।
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গেও আইনের শাসনের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। যেখানে আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য, সেখানে বিনিয়োগকারীরা নিরাপত্তা অনুভব করেন, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসার লাভ করে এবং নাগরিকদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে আইনের প্রয়োগে বৈষম্য, বিচারহীনতা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি প্রবণতা লক্ষ করা যায়, তা হলো ক্ষমতায় থাকলে একটি দল যে ব্যবস্থাকে গ্রহণযোগ্য মনে করে, বিরোধী দলে গেলে সেই একই ব্যবস্থার সমালোচনায় মুখর হয়। ফলে আইনের শাসনের প্রশ্নটি অনেক সময় রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশে পরিণত হয়। কিন্তু প্রকৃত অর্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তার বিচার হওয়া উচিত নাগরিকের অভিজ্ঞতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং মানবাধিকার সুরক্ষার বাস্তব অবস্থার ভিত্তিতে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দীর্ঘদিন ধরে একটি অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে যে, ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে তুলনামূলক নমনীয়তা দেখা গেলেও বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা অধিক মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা প্রশাসনিক চাপের মুখোমুখি হন। একইভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের ক্ষেত্রেও ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের জন্য ভিন্ন বাস্তবতা পরিলক্ষিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের সভা-সমাবেশ তুলনামূলকভাবে সহজে আয়োজন করা গেলেও বিরোধী দলের ক্ষেত্রে নানা প্রশাসনিক ও আইনগত বাধার কথা প্রায়ই শোনা যায়।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এ ধরনের বৈষম্যের কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। অপরাধের বিচার হবে ব্যক্তির কর্ম ও আচরণের ভিত্তিতে, তার রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়। একইভাবে সভা-সমাবেশ, মতপ্রকাশ এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে সকল রাজনৈতিক দলের জন্য সমান সুযোগ ও সমান আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আইনের শাসনের প্রকৃত অর্থই হলো—কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এবং কেউ আইনের দৃষ্টিতে বৈষম্যের শিকার হবে না। যখন এই নীতি বাস্তবে প্রতিষ্ঠিত হবে, তখনই জনগণের মধ্যে রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।
আইনের শাসনের পথে ইতিবাচক অগ্রযাত্রা: তবে আশার কথা হচ্ছে, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানের একটি বিশেষ দিক জনমনে ইতিবাচক প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছে। বিভিন্ন জনসভা, সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তিনি বারবার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান এবং সামাজিক সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের গুরুত্ব তুলে ধরছেন। তাঁর বক্তব্যে প্রতিপক্ষের প্রতি বিদ্বেষ, অসহিষ্ণুতা কিংবা উসকানিমূলক ভাষার ব্যবহার নেই বললেই চলে, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি ধরনের ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।
রাজনীতিতে ভাষা ও আচরণের গুরুত্ব অপরিসীম। একজন রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য কেবল তাঁর ব্যক্তিগত অবস্থানকেই প্রকাশ করে না, বরং তাঁর দলের কর্মী-সমর্থকদের জন্যও একটি বার্তা হিসেবে কাজ করে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিভিন্ন বক্তব্যে সংযম, সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি গুরুত্বারোপ লক্ষ করা যায়। একই সঙ্গে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি বা দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনায় নিজ দলের নেতাকর্মীদের প্রতিও কঠোর অবস্থান গ্রহণের ইঙ্গিত তিনি দিয়ে যাচ্ছেন, যা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
তবে রাজনীতিতে বক্তব্যের চেয়ে বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত অধিক গুরুত্বপূর্ণ। জনগণ দেখতে চায়, ঘোষিত নীতি ও প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়। যদি আইনের শাসন, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং সুশাসনের যে অঙ্গীকার প্রধানমন্ত্রী করছেন, তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বিকাশের জন্য একটি ইতিবাচক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। একই সঙ্গে আইনের শাসনের পথে ইতিবাচক অগ্রযাত্রা সূচিত হবে।
অপরদিকে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া কিছু মামলায় নানা ধরনের প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে যে, কিছু মামলায় এমন ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের বাস্তব ভিত্তি দুর্বল কিংবা ঘটনার সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততার সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই। কোথাও কোথাও এমন ব্যক্তির নামও মামলায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যাদের সামান্যতম সংশ্লিষ্টতা ছিল না।
এই তালিকায় বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, সাংবাদিক, পুলিশ প্রশাসন ও সিভিল প্রহসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, ব্যবসায়ীসহ অগণিত সাধারণ মানুষের নাম রয়েছে।
তবে এ পরিস্থিতির মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক লক্ষ করা যাচ্ছে। তদন্ত প্রক্রিয়ায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ প্রশাসন, অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে নিরপরাধ বা সংশ্লিষ্টতাহীন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাহার কিংবা অব্যাহতি প্রদান অব্যাহত রেখেছে। এ ব্যাপারে বর্তমান সরকার, বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পুলিশ, অত্যন্ত আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত অপরাধী ও নির্দোষ ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ের এই প্রচেষ্টা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইনের শাসনের মূল দর্শনই হলো—কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন শাস্তির শিকার না হন এবং কোনো অপরাধী যেন আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে। সে কারণে নিরপেক্ষ তদন্ত, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবমুক্ত বিচারিক প্রক্রিয়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য শর্ত।
বাংলাদেশে আইনের শাসনকে আরও শক্তিশালী করতে হলে এই ধরনের ন্যায়নিষ্ঠ ও পেশাদার তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহিতা যত বৃদ্ধি পাবে, ততই বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা সুদৃঢ় হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে।
এ ছাড়া সম্প্রতি রাজধানীতে শিশু রামিশা ধর্ষণ-হত্যা মামলা দ্রুত বিচার ত্বরান্বিত করে সরকার প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তারা জনগণের নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
লেখক: সাংবাদিক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, পলিটিক্যাল রিপোর্টার্স ফোরাম