কেন আমাদের শিশুরা এভাবে লাশ হয়ে ফিরছে?

দীপু মাহমুদ

মতামত

পুরো শহর অস্থির হয়ে তিন বছরের শিশু মাহাদীকে খুঁজছে। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তার হাসিমাখা

2026-06-25T16:13:21+00:00
2026-06-25T16:13:21+00:00
  শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬,
১২ আষাঢ় ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ২৬ জুন ২০২৬
মতামত
কেন আমাদের শিশুরা এভাবে লাশ হয়ে ফিরছে?
দীপু মাহমুদ
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬, ৪:১৩ পিএম 
ছবি: ভোরের ডাক
পুরো শহর অস্থির হয়ে তিন বছরের শিশু মাহাদীকে খুঁজছে। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তার হাসিমাখা ছবি, অচেনা মানুষও তাকে খুঁজতে রাস্তায় নেমে এসেছেন। সবাই বিশ্বাস করতে চাইছেন- মাহাদী ফিরবে। সে হয়তো কোনো প্রতিবেশীর বাসায় গেছে, কিংবা পথ হারিয়ে ফেলেছে। কিছুক্ষণের ভেতর শিশু মাহাদী মায়ের কোলে ফিরে আসবে।

মাহাদী ফিরল। তবে জীবিত নয়, লাশ হয়ে।

বাংলাদেশে এই কথাটি বা এমন ঘটনা এখন আর নতুন নয়। সংবাদপত্রের পাতায়, টেলিভিশনের স্ক্রলে, ফেসবুকের নিউজফিডে আমরা বারবার একই দৃশ্য দেখছি- নিখোঁজ শিশু, নির্যাতিত শিশু, ধর্ষণের শিকার শিশু, পানিতে ভেসে ওঠা শিশু, পরিবারের ভেতরে নিহত শিশু, কিংবা পরিচিত কারও হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারানো শিশু।

সংবাদগুলো আলাদা, কিন্তু তাদের শেষ বাক্য একটাই- ‘শিশু আর বেঁচে নেই।’

উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান
শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বাংলাদেশে বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা এখন জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে।

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৫ সালের প্রথম সাত মাসেই দেশে অন্তত ২৫৯ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে এবং ৩০৬ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে অন্তত ৬৪০ শিশু।

আরও উদ্বেগজনক তথ্য পাওয়া গেছে সাম্প্রতিক শিশু সুরক্ষা বিষয়ক গবেষণায়। ২০২৪ সালে দেশে ৪৮২ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছিল এবং ২০২৫ সালেও প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৩৭জন শিশু হত্যার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে জাতীয় শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮-এ নির্যাতনসংক্রান্ত কলের সংখ্যা ২০২২ সালের ৮ হাজারের কিছু বেশি থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২৬ হাজারেরও বেশি হয়েছে।

সংখ্যাগুলো কেবল পরিসংখ্যান নয়, এগুলো ৪৮২টি পরিবার, ৪৮২টি অসমাপ্ত শৈশব, ৪৮২টি ভেঙে পড়া পৃথিবীর কাহিনি।

সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সত্য: বিপদ ঘরের ভেতরেই
আমাদের সমাজে এখনো অনেক বাবা-মা মনে করেন, শিশুর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বাইরে- অপরিচিত মানুষ, অন্ধকার গলি কিংবা নির্জন রাস্তা। বাস্তবতা আরও ভয়ঙ্কর।

সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে শিশু হত্যার প্রায় ৬৬ শতাংশ এবং যৌন নির্যাতনের প্রায় ৫৯ শতাংশ ঘটনা ঘটেছে ঘর বা পারিবারিক পরিবেশের ভেতরে। অনেক ক্ষেত্রে হত্যাকারী বা নির্যাতনকারী বাবা, আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক, গৃহশিক্ষক, নিরাপত্তাকর্মী কিংবা পরিবারের পরিচিত কেউ। গবেষণা বলছে, প্রতি ১০ জন শিশুনির্যাতনকারীর মধ্যে প্রায় ৯ জনই শিশুর পরিচিত মানুষ।

অর্থাৎ শিশুদের সবচেয়ে বড় বিপদ অপরিচিতের নয়, পরিচিতের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে।

কেন শিশুরা টার্গেট হয়ে উঠছে?
শিশুরা দুর্বল, প্রতিরোধ করতে পারে না, সামাজিকভাবে তাদের কণ্ঠস্বরও নাজুক। অপরাধীরা এই দুর্বলতাকেই ব্যবহার করে।

শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার পেছনে কয়েকটি কারণ ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

প্রথমত, আমাদের সমাজে সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ ঘটেছে। শিশুকে মারধর করা, অপমান করা, ভয় দেখানো কিংবা কঠোর শাস্তি দেওয়া এখনো অনেক পরিবারে স্বাভাবিক শিক্ষাপদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৯ জনই প্রতি মাসে কোনো না কোনো ধরনের সহিংস শাসন বা শারীরিক শাস্তির মুখোমুখি হয়। সংখ্যার হিসেবে এটা প্রায় সাড়ে চার কোটি শিশু।

একজন শিশু যখন ছোটবেলা থেকেই শেখে যে শক্তি প্রয়োগ করে সমস্যা সমাধান করা যায়, তখন সেই সহিংসতা পরবর্তী প্রজন্মেও ছড়িয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের সাহসী করে তুলছে। বহু ক্ষেত্রে শিশু হত্যা ও নির্যাতনের বিচার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যায়, সাক্ষ্যপ্রমাণ দুর্বল হয়ে পড়ে, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে। ফলে অপরাধীরা মনে করে তারা শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যাবে।

তৃতীয়ত, দ্রুত নগরায়ণ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। আগে একজন শিশু পুরো পাড়ার সন্তান ছিল, এখন অনেক শহুরে পরিবার ফ্ল্যাটের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ। প্রতিবেশীকে না চেনা, সামাজিক সম্পর্কের দুর্বলতা এবং একক পরিবারব্যবস্থা শিশুদের নিরাপত্তার অনানুষ্ঠানিক বলয়কে সংকুচিত করে ফেলেছে।

চতুর্থত, ডিজিটাল যুগে অনলাইন পর্নোগ্রাফি, সহিংস কনটেন্ট এবং বিকৃত যৌনতার সহজলভ্যতা কিছু মানুষের আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন। শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতা অনেক ক্ষেত্রে যৌনতার নয়, বরং ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

শিশু কি আমাদের সমাজে মানুষ, নাকি সম্পত্তি?
এই প্রশ্নটি অস্বস্তিকর, কিন্তু জরুরি।

আমাদের সংস্কৃতিতে এখনো শিশুদের অনেক সময় পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে নয়, পরিবারের সম্পত্তি হিসেবে দেখা হয়। ‘আমার সন্তান, আমি যেভাবে খুশি মানুষ করব’- এই ধারণা শিশুর অধিকারকে অস্বীকার করে।

একজন শিশুকে মারধর করা, অপমান করা, ভয় দেখানো কিংবা তার মতামতকে অগ্রাহ্য করা যদি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়, তবে সেই সমাজে শিশুর প্রতি বড় ধরনের সহিংসতার জন্যও নীরব পরিবেশ তৈরি হয়।

বড় অপরাধ হঠাৎ করে জন্ম নেয় না, ছোট ছোট সহিংসতার ওপর দাঁড়িয়েই তার বিকাশ ঘটে।

রাষ্ট্রের ব্যর্থতা কোথায়?
বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার জন্য আইন আছে, নীতিমালা আছে, শিশু সহায়তা হেল্পলাইন আছে। কিন্তু আইন আর বাস্তবতার মধ্যে এখনো বিশাল দূরত্ব।

অনেক বিদ্যালয়ে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা নেই। অধিকাংশ এলাকায় প্রশিক্ষিত শিশু কাউন্সেলর নেই। স্থানীয় সরকার, বিদ্যালয়, পুলিশ ও সমাজকর্মীদের মধ্যে সমন্বিত শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

ফলে কোনো শিশু ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও অনেক সময় কেউ তা বুঝতে পারে না, কিংবা বুঝলেও কোথায় জানাবে তা জানে না।

কী করা জরুরি?
প্রথমত, শিশু হত্যা ও শিশু নির্যাতনের মামলার দ্রুত বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, প্রতিটি বিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা এবং কাউন্সেলিং সেবা চালু করতে হবে।

তৃতীয়ত, শিশুদের ‘গুড টাচ-ব্যাড টাচ’, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, অনলাইন ঝুঁকি এবং সাহায্য চাওয়ার উপায় সম্পর্কে বয়সোপযোগী শিক্ষা দিতে হবে।

চতুর্থত, স্থানীয় সরকার, পুলিশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং কমিউনিটিকে একসঙ্গে যুক্ত করে স্থানীয় শিশু নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে।

পঞ্চমত, জাতীয় শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮ সম্পর্কে প্রতিটি পরিবার ও প্রতিটি বিদ্যালয়ে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

সভ্যতার পরীক্ষা
সভ্য সমাজকে বিচার করা হয় সে তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের কতটা নিরাপত্তা দিতে পারে, তার ওপর।

শিশুরা নিজেদের জন্য আইন লিখতে পারে না, সংসদে যেতে পারে না, টেলিভিশনের টকশোতে কথা বলতে পারে না, আদালতে দাঁড়িয়ে নিজেদের অধিকার দাবি করতে পারে না। তাদের হয়ে কথা বলার দায়িত্ব আমাদের।

ছোট্ট মাহাদী আর ফিরবে না।
ধোবাউড়ার সেই পাঁচ বছরের শিশুও ফিরবে না।
রামিসাও ফিরবে না।

কিন্তু তাদের মৃত্যু যদি আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তোলে, এর ফলে অন্য শিশু বেঁচে যায়, আরেকটি পরিবার সন্তানের লাশ বুকে নিয়ে হাসপাতালের বারান্দায় দাঁড়িয়ে না থাকে, তাহলে এই শোকের ভেতর থেকেও আমরা কিছু শিখতে পারব।

নইলে আগামীকাল আবার কোনো সংবাদপত্রের শিরোনামে লেখা থাকবে- 

‘ছোট্ট আরেকজনও ফিরল লাশ হয়ে।’

আমরা তা চাই না। শিশু হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। দেশ হবে শিশুবান্ধব।


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: