দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের কল্যাণ সাধন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, সামাজিক অগ্রগতি, সাংস্কৃতিক উন্নয়ন এবং সদস্য দেশগুলোর মধ্যে যৌথ আত্মনির্ভরশীলতা জোরদার করার লক্ষে যাত্রা শুরু হয়েছিল দক্ষিণ এশিয়া আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্কের। ১৯৮৫ সালের ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা-সার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা- এই সাতটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের স্বাক্ষরিত সনদের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে আফগানিস্তান এর অষ্টম সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়।
বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির জন্য একটি আঞ্চলিক সংস্থা গঠনের উদ্যোগ নেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও আঞ্চলিক সংহতি ছাড়া এই অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেই প্রেক্ষিতে ১৯৮০ সালের মে মাসে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সার্ক গঠনের প্রস্তাব ৭টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে পেশ করে।
এতে সাড়া দিয়ে ১৯৮১ সালে শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্র সচিবদের প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮৫ সালের ৭ ও ৮ ডিসেম্বর ঢাকায় সার্কের প্রথম শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনেই ‘সার্ক সনদ’ গৃহীত হয় এবং সংস্থাটি পূর্ণাঙ্গ রূপ লাভ করে। ওই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
তার শাসনামলেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দারিদ্র্য, অনুন্নয়ন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মতো অভিন্ন সমস্যাগুলো মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে। ফলে জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে যাত্রা শুরু করা সার্ককে কার্যকর ও গতিশীল করার প্রচেষ্টায় এরশাদও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
দক্ষিণ এশিয়া বিশ্বের অন্যতম জনবহুল অঞ্চল। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মানুষ এই অঞ্চলে বসবাস করে। সার্ক একসময় এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতার প্রধান প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধ ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে সংস্থাটি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রতিষ্ঠার চার দশক পরও সার্ক তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক বিরোধ সংস্থাটির কার্যক্রমকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। ফলে আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং নিরাপত্তা সহযোগিতার বহু সম্ভাবনা অপূর্ণ থেকে গেছে।
সা¤প্রতিক সময়ে সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করার প্রশ্নটি আবারও আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশের তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে সার্ককে সক্রিয় করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। তিনি এ ব্যাপারে পাকিস্তান, নেপাল ও মালদ্বীপের সরকার প্রধানের সঙ্গে আলোচনা করেন। যদিও বিভিন্ন দেশের অনাগ্রহ ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে সেই উদ্যোগ প্রত্যাশিত অগ্রগতি লাভ করেনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করলে আবারও সার্ককে সক্রিয় করার উদ্যোগ দেখা যায়। সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা যেহেতু প্রয়াত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ছিলেন, স্বাভাবিকভাবেই সন্তান হিসেবে পিতার স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করেন তারেক রহমান। এর বাস্তবতা দেখা যায়, পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন যমুনায় আয়োজিত এক ইফতার অনুষ্ঠানে।
ওই ইফতার অনুষ্ঠানে সার্কভুক্ত দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতদের মূল মঞ্চে স্থান দেওয়া হয়। অনেকের মতে, এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার এবং সার্ককে পুনরায় সক্রিয় করার একটি ইতিবাচক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, সার্কের প্রতি তাঁর এই আগ্রহের পেছনে ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক উভয় কারণই রয়েছে। কারণ তার পিতা, বাংলাদেশের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে সার্ক প্রতিষ্ঠার প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং সার্ককে কার্যকর করার বিষয়ে বর্তমান সরকারের আন্তরিকতা অনেকের কাছেই স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত বলে মনে হয়।
গত ৪ জুন রাজধানীর প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) অডিটোরিয়ামে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমাননের শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে তথ্য মন্ত্রণালয় ও পিআইবি আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশীয় ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় কোনো শত্রæ তৈরি না করে সর্বত্র মিত্র তৈরি করেছিলেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত সরকারের কাছে শহীদ জিয়ার সার্কের নীতি এবং বহুপক্ষীয় স্বার্থের ভিত্তিতে এগিয়ে চলার নির্জোট রাজনীতিই প্রধান পররাষ্ট্রনীতি।
সার্ককে পুনরায় সক্রিয় করার প্রশ্নে বাংলাদেশের পাশাপাশি নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের মধ্যেও আগ্রহ রয়েছে বলে বিভিন্ন সময়ে প্রতীয়মান হয়েছে। কারণ আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে এসব দেশ অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সার্কের কার্যকারিতার প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার দুই বৃহৎ ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস।
সার্কের শেষ বা ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন ২০১৪ সালের ২৬ ও ২৭ নভেম্বর নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ২০১৫ বা ২০১৬ সালে পাকিস্তানে ১৯তম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। তখন থেকে সার্কের শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের প্রক্রিয়াটি এক রকম থমকে আছে। মধ্য দিয়ে বিগত এক যুগ ধরে সার্ক পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে রয়েছে বলা চলে।
বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় কোনো দেশ একা চলতে পারে না। অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। সার্ক সক্রিয় হলে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বৃদ্ধি পাবে, জনগণের যোগাযোগ সহজ হবে, পর্যটন স¤প্রসারিত হবে এবং সাংস্কৃতিক বিনিময় আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের সঙ্গেই বাংলাদেশের সুসম্পর্ক থাকা প্রয়োজন। একইভাবে নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও আফগানিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার হলে পুরো অঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে। আঞ্চলিক সংহতি যত বাড়বে, বাইরের পরাশক্তিগুলোর ওপর নির্ভরশীলতা তত কমবে এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আরও শক্তিশালী অবস্থান নিতে পারবে।
তাছাড়া সার্কের পুনর্জাগরণ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও রাজনৈতিক বিরোধ রাতারাতি দূর হবে না, তবুও নিয়মিত সংলাপ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক যোগাযোগ পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।
আজকের বিশ্বে আঞ্চলিক সহযোগিতাই উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান কিংবা আফ্রিকান ইউনিয়নের অভিজ্ঞতা আমাদের সেই শিক্ষা দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকেও নিজেদের স্বার্থে বিভেদ নয়, সহযোগিতার পথ বেছে নিতে হবে। সেই লক্ষ্য অর্জনে সার্ককে পুনরায় সক্রিয় ও কার্যকর করে তোলার বিকল্প নেই।
সুতরাং, দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির স্বার্থে সার্ককে নতুন করে প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে সদস্য রাষ্ট্রগুলো যদি আন্তরিকতা প্রদর্শন করে, তবে সার্ক আবারও এই অঞ্চলের জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্ল্যাটফর্মে পরিণত হতে পারে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ তথা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্যোগ সফলতার মুখ দেখার প্রত্যাশায় রয়েছে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রায় ২০০ কোটি মানুষ।
লেখক : সাংবাদিক, সাধারণ সম্পাদক, সার্ক কালচারাল সোসাইটি, বাংলাদেশ।