গলিত মায়ের লাশ, পচন ধরেছে মানবিকতার

সুজন দে

মতামত

৩ জুন রাতে নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ঘরের মেঝে খুঁড়ে মারুফা বেগম নামে এক নারীর অর্ধ গলিত লাশ উদ্ধার করেছে

2026-06-06T11:43:53+00:00
2026-06-06T11:43:53+00:00
  সোমবার, ৮ জুন ২০২৬,
২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
 
  ই-পেপার   
           
সোমবার, ৮ জুন ২০২৬
মতামত
গলিত মায়ের লাশ, পচন ধরেছে মানবিকতার
সুজন দে
শনিবার, ৬ জুন, ২০২৬, ১১:৪৩ এএম 
সুজন দে
৩ জুন রাতে নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ঘরের মেঝে খুঁড়ে মারুফা বেগম নামে এক নারীর অর্ধ গলিত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের বড় ছেলেকে সন্দেহ করছে পরিবার। একই দিন রাজধানীর পল্লবীতে সেলিনা আফরোজ (৫৫) নামে এক নারীর অর্থ গলিত লাশ উদ্ধার হয়েছে।  কয়েকদিন আগেই মরে বাসায় পড়েছিলেন তিনি।  খবর পেয়ে  ৩ জুন বুধবার ভোরে পল্লবীর ৬ নম্বর সেকশনের ১০ নম্বর সড়কের একটি বাসার তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে  নারীর পচা-গলা লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

যার স্বামী ও সন্তানেরা সবাই কানাডায়। নিঃসঙ্গতার ভার বুকে চেপে রাজধানীতে একাই দিন অতিবাহিত করতেন সেলিনা আফরোজ। কানাডাপ্রবাসী স্বামী মমিনুল হক ও সন্তানরা তার খোঁজ নিতেন না। এর আগে  পল্লবীর একই সেকশনে ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের নিঃসঙ্গ মৃত্যু নিয়ে দেশজুড়ে তোলপাড় হয়ে।  নূরজাহান বেগমের চার সন্তান হলেন মোংলা সমুদ্রবন্দরের যুগ্ম সচিব এ কে এম আনিসুর রহমান, বুয়েটের অধ্যাপক এ কে এম আশিকুর রহমান, কানাডাপ্রবাসী কে এম আতিকুর রহমান এবং স্কুলশিক্ষিকা ফাতিমা নাসরিন সুলতানা। তার  পচা গলা লাশ প্রায় সাত দিন পর উদ্ধার হয়েছিল বলে জানা গেছে।

মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে তিন নারীর অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার হওয়ার ঘটনা পুরো জাতিকে স্তম্ভিত করেছে। তিনজনই মা। এই মায়েদের অর্ধগলিত লাশ আমাদের মানবিক মূল্যবোধের গভীর সংকটকেও সামনে নিয়ে এসেছে। আমাদের মানবিকতার যে পচন ধরেছে সেটিও আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে।

বেদনাদায়ক বিষয় হলো, এই তিন মায়ের মধ্যে একজনের সন্তানেরা উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত, আরেকজনের স্বামী সন্তানেরা বিদেশে থাকেন। অথচ জীবনের শেষ সময়ে এই নারীরা এমন নিঃসঙ্গ ও অবহেলিত অবস্থায় ছিলেন যে মৃত্যুর পরও দীর্ঘ সময় তাদের খোঁজ নেওয়ার কেউ ছিল না।

একজন মা দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখান। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেন, অসংখ্য ত্যাগ স্বীকার করেন। সন্তানের সামান্য কষ্টেও যার হৃদয় কেঁপে ওঠে, সেই মায়েরই বার্ধক্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় সন্তানের স্নেহ, যত্ন ও পাশে থাকার আশ্বাস।

কিন্তু আজ আমরা এমন এক সমাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মা, বিশেষ করে মায়েরা, অবহেলার শিকার হচ্ছেন। সন্তানরা নিজেদের পরিবার, কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে, আর বৃদ্ধ মা-বাবা একাকীত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এটি শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয়, এটি আমাদের সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধেরও অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি।

একজন মা যখন বৃদ্ধ হন, তখন তিনি খুব বেশি কিছু চান না। তিনি শুধু চান সন্তানের একটু খোঁজখবর, একটু সময়, একটু ভালোবাসা। যেভাবে তিনি শৈশবে সন্তানকে আগলে রেখেছিলেন। যে ব্যক্তি নিজের মায়ের প্রতি ন্য্যনতম দায়িত্ববোধ অনুভব করে না, তার মানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। কারণ মানুষের প্রথম ও সবচেয়ে বড় দায়িত্বগুলোর একটি হলো নিজের বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য পালন করা। একজন মানুষের মনুষ্যত্বের অন্যতম বড় পরিচয় হলো তিনি তার অসহায় ও বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে কতটা দাঁড়াতে পারেন। আরও একটি বিষয় আমাদের ভাবতে হবে। যখন কোনো সন্তান নিজের মায়ের খোঁজখবর নেয় না, তখন তার পরিবারও কি কোনো প্রশ্ন তোলে? তার স্ত্রী, সন্তান বা নিকটজনরা কি তাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে একজন বৃদ্ধ মা তার অপেক্ষায় আছেন? অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সবাই নিজেদের স্বাচ্ছন্দ্য ও সুখ নিয়ে ব্যস্ত। আত্মকেন্দ্রিকতার এই সংস্কৃতি সমাজকে আরও অমানবিক করে তুলছে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শুধু নৈতিক আহ্বান যথেষ্ট নয়। বাবা-মায়ের ভরণপোষণ ও দেখাশোনার দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইন আরও কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। প্রয়োজনে আইনগত কাঠামো আরও শক্তিশালী করতে হবে, যাতে কোনো বৃদ্ধ মা-বাবা অবহেলার শিকার না হন।

একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। সমাজে এমন একটি সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালনকে সম্মানের বিষয় হিসেবে দেখা হবে এবং অবহেলাকে নৈতিকভাবে নিন্দনীয় কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। প্রয়োজন বোধে যে সন্তান তার মাকে দেখাশোনা করবে না সেই সন্তানকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে।

মানুষের বিবেককে জাগ্রত করতে হবে, পরিবারে পরিবারে এই মূল্যবোধ চর্চা করতে হবে। আমরা কেমন সমাজ গড়তে চাই, এ প্রশ্নের উত্তর আজ আমাদেরই দিতে হবে। এমন সমাজ চাই, যেখানে বৃদ্ধ মা-বাবা নিরাপদ, সম্মানিত ও ভালোবাসার পরিবেশে জীবন কাটাতে পারবেন। কারণ যে সমাজ তার মা-বাবার মর্যাদা রক্ষা করতে পারে না, সে সমাজ কখনোই প্রকৃত অর্থে মানবিক সমাজ হতে পারে না।

আসুন, আমরা সবাই আমাদের বাবা-মা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি আরও যত্নশীল হই। কারণ তাদের ভালোবাসা, ত্যাগ ও অবদানের ঋণ কোনোদিন শোধ করা সম্ভব নয়। তবে সম্মান, সেবা ও ভালোবাসার মাধ্যমে অন্তত কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সম্ভব।

লেখক : সাংবাদিক।


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: