অন্তরের পশুত্ব বিসর্জন ও কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা

হাফেজ এবিএম গোলাম রব্বানী

মতামত

‘কুরবান’ শব্দের অর্থ নৈকট্য অর্জন করা বা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা। ইসলামি পরিভাষায় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে

2026-05-28T16:48:35+00:00
2026-05-28T16:48:35+00:00
  শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬,
৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
 
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
মতামত
অন্তরের পশুত্ব বিসর্জন ও কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা
হাফেজ এবিএম গোলাম রব্বানী
বৃহস্পতিবার, ২৮ মে, ২০২৬, ৪:৪৮ পিএম 
প্রতীকী ছবি
‘কুরবান’ শব্দের অর্থ নৈকট্য অর্জন করা বা আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা। ইসলামি পরিভাষায় মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পশু জবেহ করাকে কুরবানি বলা হয়। কুরবানি কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মুসলিম উম্মাহর জন্য ত্যাগ, আনুগত্য, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য শিক্ষা। প্রতি বছর ঈদুল আজহা আমাদের সামনে ফিরে আসে আত্মত্যাগ, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও মানবিকতার মহান বার্তা নিয়ে।

কুরবানির ইতিহাস মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। আদি পিতা হযরত আদম (আ.)-এর যুগ থেকেই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কুরবানির বিধান চালু রয়েছে। তবে আজ মুসলিম বিশ্বে প্রচলিত কুরবানির মূল শিক্ষা নিহিত রয়েছে হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-এর অসীম আত্মত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্যের স্মৃতিতে। আল্লাহর নির্দেশে নিজের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ সন্তানকেও কুরবানি করতে প্রস্তুত হয়ে হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাকওয়া, ধৈর্য ও আত্মসমর্পণের যে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, তা কেয়ামত পর্যন্ত বিশ্ব মুসলিমের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

একদা সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “হে আল্লাহর রাসূল! এই কুরবানি কী?” উত্তরে তিনি বলেন, “এটি তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত।” (ইবনে মাজাহ, মিশকাত)। অর্থাৎ কুরবানি কেবল পশু জবেহের নাম নয়; বরং এটি আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের ইচ্ছা, স্বার্থ ও ভালোবাসাকে বিসর্জন দেওয়ার এক মহান শিক্ষা।

কুরবানি কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত হলো শুদ্ধ নিয়ত ও তাকওয়া। সমাজে অনেক সময় পশুর আকার, দাম বা সৌন্দর্য নিয়ে প্রতিযোগিতা দেখা যায়, অথচ ইসলামে এসব বাহ্যিক বিষয় মুখ্য নয়। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, “আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের গোশত ও রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া।” (সূরা হজ : ৩৭)। অর্থাৎ কুরবানির মূল উদ্দেশ্য বাহ্যিক প্রদর্শন নয়; বরং অন্তরের পরিশুদ্ধি ও আল্লাহভীতি অর্জন।

কুরবানির বাহ্যিক রূপ পশু জবেহ করা হলেও এর প্রকৃত শিক্ষা হলো মানুষের অন্তরের পশুত্বকে বিসর্জন দেওয়া। মানুষের হৃদয়ে লুকিয়ে থাকা অহংকার, হিংসা, লোভ, স্বার্থপরতা, পরনিন্দা ও অন্যায় প্রবৃত্তিগুলো দমন করতে না পারলে কুরবানির আসল তাৎপর্য অর্জিত হয় না। প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রবৃত্তি, স্বার্থ ও প্রিয় বস্তু ত্যাগ করতে সদা প্রস্তুত থাকেন।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সমাজে কুরবানিকে কেন্দ্র করে কিছু অপসংস্কৃতি ও ভুল মানসিকতা গড়ে উঠেছে। অনেকেই পশুর দাম, আকার বা বিরলতা নিয়ে অহংকার ও প্রদর্শনে লিপ্ত হন, যা কুরবানির চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পশুর সঙ্গে ছবি তুলে আত্মপ্রচার করা কিংবা কুরবানির গোশত নিয়ে অতিরিক্ত গর্ব প্রকাশ করাও অনুচিত। অথচ কুরবানির শিক্ষা মানুষকে বিনয়ী, সহানুভূতিশীল ও দায়িত্বশীল হতে শেখায়। তাই দরিদ্র, অসহায় ও আত্মীয়-স্বজনের মাঝে কুরবানির গোশত বণ্টনের মাধ্যমে সমাজে ভ্রাতৃত্ব ও সাম্যের বন্ধন আরও সুদৃঢ় করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে কুরবানির পর পশুর রক্ত, বর্জ্য ও পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা আমাদের নৈতিক ও নাগরিক দায়িত্ব। ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে ঈমানের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছে। তাই কুরবানির আনন্দ যেন কখনো জনদুর্ভোগ বা পরিবেশদূষণের কারণ না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

পরিশেষে বলা যায়, কুরবানি কোনো লোকদেখানো উৎসব নয়; এটি আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ, তাকওয়া ও আত্মশুদ্ধির এক মহিমান্বিত ইবাদত। বাহ্যিক পশু জবেহের পাশাপাশি মানুষের অন্তরের পশুত্ব, অহংকার ও কুপ্রবৃত্তিকেও বিসর্জন দিতে পারলেই কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা বাস্তবায়িত হবে। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে শুদ্ধ নিয়ত, তাকওয়া ও আন্তরিকতার সঙ্গে কুরবানি আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমীন।

হাফেজ এবিএম গোলাম রব্বানী
ছাত্র, চুনতি হাকিমিয়া কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদ্রাসা।


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: