সম্ভাবনার আলোকবর্তিকা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ

সুজন দে

মতামত

দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা

2026-06-13T11:34:23+00:00
2026-06-13T11:34:23+00:00
  শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬,
৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
 
শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
মতামত
বাজেট
সম্ভাবনার আলোকবর্তিকা বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ
সুজন দে
শনিবার, ১৩ জুন, ২০২৬, ১১:৩৪ এএম 
সুজন দে
দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের আন্দোলন-সংগ্রাম, ত্যাগ ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তী সময়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনা করে। এরপর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ভোটে ক্ষমতায় আসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। দীর্ঘ ১৭ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে এসে দলটির সামনে ছিল জনগণের বিপুল প্রত্যাশা।

সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটানোর প্রথম বড় সুযোগ আসে জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে। ১১ জুন দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট ঘোষণা করে বিএনপি সরকার। বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ঘাটতি পূরণে সরকারকে দেশীয় ও বৈদেশিক ঋণের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভর করতে হবে।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সরকার এই বাজেটকে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাজেট হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে বড় ঘাটতি, ঋণনির্ভর অর্থায়ন এবং উন্নয়ন ব্যয়ের দ্রুত বৃদ্ধি ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে কর আদায় বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের ওপর। এসব ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি না হলে বাজেটের অনেক লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।

এ কথা দ্বিধাহীনভাবে বলা যায়, এবারের বাজেটে উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়েছে। অর্থনীতিকে গতিশীল করার পাশাপাশি জনগণকে নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর চেষ্টা স্পষ্টভাবেই লক্ষ করা যায়।

পাশাপাশি বাজেট নিয়ে যেমন আশার আলো দেখা যাচ্ছে, তেমনি রয়েছে বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন। রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, অর্থনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষের একটি অংশ বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলোকে স্বাগত জানালেও ঘাটতি, রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং বাস্তবায়ন দক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, কাগজে-কলমে পরিকল্পনা যতই আকর্ষণীয় হোক না কেন, সফলতা নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

বাংলাদেশের মানুষ দীর্ঘদিন পর একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। তাই এই বাজেট শুধু সংখ্যার হিসাব নয়; এটি জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা, পরিবর্তনের প্রত্যাশা এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের একটি প্রতীকও বটে। একদিকে নতুন স্বপ্ন, অন্যদিকে বাস্তবতার কঠিন পরীক্ষা এই দুইয়ের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে দেশের অর্থনীতি।
বাজেটে ইতিবাচক দিক : এবারের বাজেটে সবচেয়ে ইতিবাচক দিকগুলো হলো

১.বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন উৎসাহ : ব্যবসা সহজীকরণ, শিল্প খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিভিন্ন সুবিধা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে।
২. শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি : শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে সহায়ক হবে।
৩. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য : উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এটি সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।
৪. কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ : নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা গেলে কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।
৫. স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষা : দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপত্তা বলয় শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা ইতিবাচক।
৬. নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাত : ভবিষ্যতমুখী অর্থনীতি গড়তে এ ধরনের প্রণোদনা গুরুত্বপূর্ণ।
৭. করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি : মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত আয়কারীদের ওপর করের চাপ কিছুটা কমতে পারে।
৮. ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ওপর জোর : আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বার্তা।

বাজেটের প্রধান দুর্বলতা ও উদ্বেগজনক দিকগুলো হলো

১.ঘাটতি ও ঋণনির্ভরতা : বাজেটে ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে দেখানো হলেও তা এখনও বড় আকারের। ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি রয়েছে। রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে ভবিষ্যতে ঋণ ও সুদের বোঝা আরও বাড়তে পারে।

২. রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন : গত কয়েক বছর ধরে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও উচ্চ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কর প্রশাসন ও রাজস্ব ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।

৩. বাস্তবায়ন পরিকল্পনার অস্পষ্টতা : বাজেটে অনেক ইতিবাচক উদ্যোগ ঘোষণা করা হলেও সেগুলো বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা স্পষ্ট নয়।

কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বাস্তবায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যার ঘাটতি রয়েছে।

৪. আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বাধা : ব্যাংক হিসাব খোলার জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করায় নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের মধ্যে অনীহা তৈরি হতে পারে। এটি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং ক্যাশলেস অর্থনীতি গঠনের লক্ষ্যের সঙ্গে কিছুটা সাংঘর্ষিক বলে সমালোচনা রয়েছে।

৫. ক্ষুদ্র ও ছোট উদ্যোক্তাদের উদ্বেগ : ব্যবসায়িক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নথিপত্র ও শনাক্তকরণ শর্ত ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। অনানুষ্ঠানিক খাতের উদ্যোক্তারা ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

৬. কাঠামোগত সংস্কারের ঘাটতি : ব্যাংকিং খাত, কর ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের সংস্কার বিষয়ে বড় ধরনের পদক্ষেপ স্পষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো অনেকাংশে অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।

৭. নিয়মিত করদাতাদের ওপর চাপ বৃদ্ধির আশঙ্কা : নতুন করদাতা বাড়ানোর পরিবর্তে বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
করের ভিত্তি সম্প্রসারণের পরিবর্তে একই শ্রেণির মানুষের ওপর নির্ভরতা বাড়লে তা অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে।

সামগ্রিক মূল্যায়ন এই বাজেটকে একদিকে বিনিয়োগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিমুখী একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট বলা যায়। অন্যদিকে, এর প্রধান দুর্বলতা হলো রাজস্ব আহরণের অনিশ্চয়তা, বড় ঘাটতি, ঋণনির্ভর অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন পরিকল্পনার অস্পষ্টতা।

তবে নিঃসন্দেহে সার্বিক বিবেচনায়, এ বাজেট জনগণকে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন কতটা বাস্তবে রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে সরকারের দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের সক্ষমতার ওপর। ২০২৬২৭ অর্থবছরের এই বাজেট তাই একই সঙ্গে সম্ভাবনার আলোকবর্তিকা এবং বাস্তবায়নের এক কঠিন পরীক্ষার নাম।

লেখক : সাংবাদিক, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক
পলিটিক্যাল রিপোর্টার্স ফোরাম।



Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: