অনিরাপদ শৈশবের বাংলাদেশ: শিশুদের রক্ষা করবে কে?

দীপু মাহমুদ

মতামত

যেকোনো সমাজকে বিচার করার বহু মানদণ্ড আছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কিংবা মাথাপিছু আয়- সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সভ্যতার

2026-06-18T20:25:43+00:00
2026-06-18T20:25:43+00:00
  শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬,
৫ আষাঢ় ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ১৯ জুন ২০২৬
মতামত
অনিরাপদ শৈশবের বাংলাদেশ: শিশুদের রক্ষা করবে কে?
দীপু মাহমুদ
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬, ৮:২৫ পিএম 
ছবি : ভোরের ডাক
যেকোনো সমাজকে বিচার করার বহু মানদণ্ড আছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি কিংবা মাথাপিছু আয়- সবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সভ্যতার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচক সম্ভবত অন্য কোথাও। রাষ্ট্র কতটা মানবিক, কতটা ন্যায়ভিত্তিক এবং কতটা নিরাপদ- তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় শিশুদের জীবন দেখে। কারণ শিশুরাই সমাজের সবচেয়ে দুর্বল, সবচেয়ে নির্ভরশীল এবং সবচেয়ে সুরক্ষাপ্রার্থী মানুষ। যে দেশে শিশুরা নিরাপদ নয়, সে দেশের উন্নয়নের গল্প যত উজ্জ্বলই হোক না কেন, তার ভেতরে গভীর অন্ধকার থেকেই যায়।

বাংলাদেশ আজ এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় নিয়মিত শিশু ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, শারীরিক নির্যাতন, অনলাইন শোষণ এবং হত্যার খবর সামনে আসছে। প্রতিটি ঘটনা কিছুদিনের জন্য জনমনে আলোড়ন সৃষ্টি করে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভের ঝড় ওঠে, দ্রুত বিচারের দাবি উচ্চারিত হয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষোভ স্তিমিত হয়ে যায়, নতুন কোনো ঘটনা পুরোনো ক্ষতকে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম থেকে সরিয়ে দেয়। অথচ ভুক্তভোগী শিশু ও তার পরিবারের জীবনে সেই ট্র্যাজেডি থেকে যায় স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে।

উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সহিংসতার চরিত্র বদলাচ্ছে। শুধু সংখ্যা নয়, ঘটনাগুলোর নিষ্ঠুরতা এবং ভুক্তভোগীদের বয়সও সমাজকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের পর্যবেক্ষণ বলছে, যৌন সহিংসতার শিকার শিশুদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশের বয়স ১২ বছরের নিচে। এমনকি ছয় বছরের কম বয়সী শিশুরাও এই ভয়াবহতার শিকার হচ্ছে। যে বয়সে একজন শিশুর পৃথিবী হওয়ার কথা খেলাধুলা, গল্প, রংপেন্সিল আর স্বপ্নে ভরা, সেই বয়সেই তাকে সহ্য করতে হচ্ছে অকল্পনীয় সহিংসতা।

এই সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা অপরিচিত কেউ নয়। বরং প্রতিবেশী, আত্মীয়, শিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়ক, পরিবহনকর্মী কিংবা পরিবারের পরিচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ বেশি দেখা যায়। অর্থাৎ শিশুর নিরাপত্তার জন্য যে সামাজিক বৃত্তকে আমরা সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করি, অনেক ক্ষেত্রে সেই বৃত্তই পরিণত হচ্ছে ঝুঁকির উৎসে।

দীর্ঘদিন ধরে শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক আলোচনায় অপরিচিত ব্যক্তির ভয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিশুদের শেখানো হয়েছে অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে কিছু না নিতে, কোথাও না যেতে। কিন্তু বাস্তবতা দেখাচ্ছে, বিপদের বড় অংশ লুকিয়ে আছে পরিচিত সম্পর্কের ভেতরে। এ কারণে শিশু সুরক্ষার ধারণাকেও নতুনভাবে ভাবতে হবে। নিরাপত্তা কেবল বাইরের হুমকি থেকে রক্ষা পাওয়া নয়- বরং পরিবার, প্রতিবেশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সম্পর্কের ভেতরেও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, পরিচিত মানুষের হাতে নির্যাতনের মানসিক অভিঘাত অনেক বেশি গভীর হয়। কারণ শিশুর নিরাপত্তাবোধ গড়ে ওঠে বিশ্বাসের ওপর। যখন সেই বিশ্বাসের মানুষই সহিংসতার উৎস হয়ে ওঠে, তখন শিশুর মানসিক জগৎ ভেঙে পড়ে। অনেক শিশু দীর্ঘদিন ভয়, উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভোগে। কারও কারও ক্ষেত্রে এই ট্রমা প্রাপ্তবয়স্ক জীবন পর্যন্ত বহন করতে হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায় উপেক্ষিত বাস্তবতা হলো ছেলেশিশুদের প্রতি যৌন সহিংসতা। আমাদের সামাজিক আলোচনায় শিশু নির্যাতনের প্রসঙ্গ এলে প্রায়শই কেবল মেয়েশিশুর কথা উঠে আসে। কিন্তু ছেলেশিশুরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা আরও বেশি নীরব থাকে। কারণ সামাজিক ধারণা এখনো এমন যে, ছেলেশিশু দুর্বল বা ভুক্তভোগী হতে পারে- এ কথা অনেক পরিবার স্বীকার করতে চায় না। ফলে বহু ঘটনা প্রকাশই পায় না।

এই নীরবতা অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করে। যে অপরাধ দৃশ্যমান নয়, তার বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধও গড়ে ওঠে না। ফলে ছেলেশিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নটিও শিশু সুরক্ষার আলোচনায় সমান গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ কিংবা আবাসিক প্রতিষ্ঠানকে শিশুদের জন্য নিরাপদ স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতনের অভিযোগ সমাজকে নাড়া দিয়েছে। এসব ঘটনায় শিক্ষক, তত্ত্বাবধায়ক কিংবা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উঠে এসেছে।

এ বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এখনো কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা নেই। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা নেই, শিশুদের জন্য কাউন্সেলিং সেবা নেই, শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য বাধ্যতামূলক আচরণবিধি নেই। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য অভিযোগ আড়াল করার প্রবণতাও দেখা যায়। ফলে শিশুরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় এবং অপরাধীরা পার পেয়ে যায়।

ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের জ্ঞান ও যোগাযোগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করেছে নতুন ঝুঁকি। অনলাইন গ্রুমিং, সাইবার হয়রানি, ব্যক্তিগত ছবি সংগ্রহ করে ব্ল্যাকমেইল, ভুয়া পরিচয়ে প্রতারণা এবং ডিপফেক প্রযুক্তির অপব্যবহার এখন বাস্তব উদ্বেগের বিষয়।

সমস্যা হলো, অধিকাংশ পরিবারই এখনো ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতন নয়। অনেক অভিভাবক সন্তানের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিলেও অনলাইন ঝুঁকি সম্পর্কে তাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেন না। ফলে শিশুরা এমন এক ভার্চুয়াল জগতে প্রবেশ করছে, যেখানে বিপদ অনেক সময় দৃশ্যমানও নয়।

তবে শিশু নির্যাতনের ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলা বা প্রযুক্তিগত সমস্যার ফল নয়। এর পেছনে রয়েছে বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংকট। সমাজবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, যে সমাজে ক্ষমতার অপব্যবহার, নারীবিদ্বেষ, সহিংসতা, বৈষম্য এবং দুর্বল মানুষের প্রতি অবজ্ঞা স্বাভাবিক হয়ে যায়, সেখানে শিশুদের প্রতিও সহিংসতা বাড়ে। শিশু নির্যাতন আসলে সমাজের গভীর নৈতিক সংকটের প্রতিফলন।

পরিবারে সহিংসতা, মাদকাসক্তি, বিকৃত পৌরুষবোধ, অনিয়ন্ত্রিত অশ্লীল কনটেন্টের বিস্তার এবং সামাজিক অসহিষ্ণুতার মতো বিষয়গুলোও এই সংকটকে জটিল করে তুলছে। শিশুদের প্রতি সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, এটা বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতারই অংশ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি। বহু ক্ষেত্রে তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা, সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা, সামাজিক চাপ এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পায় না। গ্রামাঞ্চলে স্থানীয় প্রভাবশালীদের মাধ্যমে আপস-মীমাংসার চেষ্টা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে অপরাধীরা একটি বিপজ্জনক বার্তা পায়- শাস্তি এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।

কিন্তু শিশু সুরক্ষার প্রশ্নে কোনো আপসের সুযোগ নেই। কারণ এখানে কেবল একটি মামলার বিচার নয়, পুরো সমাজের ভবিষ্যৎ জড়িত।

তাই এখন প্রয়োজন বিচ্ছিন্ন প্রতিক্রিয়া নয়, একটি সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য শিশু সুরক্ষাবিষয়ক প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও গোপন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিশুদের বয়সোপযোগী নিরাপত্তা শিক্ষা দিতে হবে, যাতে তারা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ শনাক্ত করতে পারে এবং সাহায্য চাইতে শেখে।

একই সঙ্গে পরিবারকে আরও সচেতন হতে হবে। সন্তানদের সঙ্গে বিশ্বাসভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা ভয় বা সংকোচ ছাড়াই নিজেদের অভিজ্ঞতা ভাগ করতে পারে। শিশুর কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা, তার আচরণের পরিবর্তন লক্ষ করা এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত সহায়তা নেওয়া- এসব বিষয়কে অভিভাবকত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়। শিশু নির্যাতনের মামলায় দ্রুত ও নিশ্চিত বিচার, ভুক্তভোগীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার গড়ে তোলা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষাকে জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত করা জরুরি। পাশাপাশি গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে ঘটনাকে কেবল তাৎক্ষণিক সংবাদ হিসেবে নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সংকট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

শিশুরা কোনো দেশের ভবিষ্যৎ- এ কথা আমরা প্রায়ই বলি। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখার জন্য আমরা কতটা প্রস্তুত, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন শিশু নির্ভয়ে স্কুলে যেতে পারে, খেলতে যেতে পারে, অনলাইনে শেখার সুযোগ নিতে পারে এবং নিজের ঘর, পরিবার ও সমাজকে নিরাপদ আশ্রয় বলে বিশ্বাস করতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে আজ সেই চ্যালেঞ্জই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যে সমাজ তার শিশুদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত নিজের ভবিষ্যৎকেই অনিরাপদ করে তোলে।


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: