বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য

সুজন দে

মতামত

এক সময় বিশ্বের বড় কূটনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্র ছিল ওয়াশিংটন, লন্ডন কিংবা ব্রাসেলস। কিন্তু গত দুই বছরে আন্তর্জাতিক কূটনীতির মানচিত্রে একটি

2026-07-02T20:35:32+00:00
2026-07-02T20:36:16+00:00
  শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬,
১৯ আষাঢ় ১৪৩৩
 
শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬
মতামত
বেইজিং-নয়াদিল্লিমুখি বিশ্ব নেতারা
বদলে যাচ্ছে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য
সুজন দে
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬, ৮:৩৫ পিএম  আপডেট: ০২.০৭.২০২৬ ৮:৩৬ পিএম
সংগৃহীত ছবি
এক সময় বিশ্বের বড় কূটনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্র ছিল ওয়াশিংটন, লন্ডন কিংবা ব্রাসেলস। কিন্তু গত দুই বছরে আন্তর্জাতিক কূটনীতির মানচিত্রে একটি নতুন প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার প্রধান থেকে শুরু করে বিশ্বনেতারা ধারাবাহিকভাবে সফর করছেন চীনের রাজধানী বেইজিং এবং ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল আনুষ্ঠানিক সফরের সংখ্যা বাড়ার ঘটনা নয়, বরং বহুমেরু কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার বাস্তব প্রতিফলন। এর মধ্য দিয়ে বদলে যেতে শুরু করেছে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গেল দুই বছর বিশ্বের একাধিক দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান বেইজিং সফর করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, যুক্তরাজ্যর প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জ, স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ, ফিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতেরি ওরপো, সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকসান্ডার ভুচিচ, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং, ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট তো লাম, মিয়ানমারের রাষ্ট্রপতি মিন অং হ্লাইং, থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রপতি মহা ভাজিরালংকং।

বেইজিং সফরকালে এসব দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। এসব বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সামরিক সহযোগিতা, অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জ্বালানি, উৎপাদন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

অপরদিকে, গত দুই বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি সফর করেছেন। সর্বশেষ গত ১ জুলাই জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দিল্লি সফর করেন। গত দুই বছরে নয়াদিল্লি সফর করা উল্লেখযোগ্য রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা হলেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি ইমানুয়েল মাক্রোঁ, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, মায়ানমারের প্রেসিডেন্ট ইউ মিন অং হ্লাইং, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে. ডি. ভ্যান্স, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন এবং ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা, জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মের্জ, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রবোও সুবিয়ান্তো, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ, স্পেনের প্রেসিডেন্ট পেদ্রো সানচেজ, অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর ড. ক্রিশ্চিয়ান স্টককার, দক্ষিণ কোরিয়ার রাষ্ট্রপতির লি জে-মিয়ং, ইউএইয়ের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান, শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি অনুরা কুমারা দিশানায়েকে, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, মালদ্বীপের রাষ্ট্রপতি মোহামেদ মুইজ্জু, সহ ভিয়েতনাম, মরিশাস, মধ্যপ্রাচ্য, আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়া, অঞ্চলের একাধিক রাষ্ট্র সরকার প্রধানের পাশাপাশি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা নয়াদিল্লি সফর করেন।

সফরের সময় এসব দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দীপাক্ষিক বৈঠক করেন। বৈঠকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, প্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তা, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চীনের সঙ্গে রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা বহু দেশও অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করছে। আবার অনেক দেশেই নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতার জন্য ভারতের সঙ্গেও সম্পর্ক জোরদার করছে। অর্থাৎ বিশ্ব এখন আর ‘এক পক্ষ বা অন্য পক্ষ’ এই নীতিতে চলছে না, বরং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে সমানভাবে সম্পর্ক বজায় রাখছে।

চীনের শক্তির ভিত্তি তার বিশাল অর্থনীতি, উৎপাদন সক্ষমতা, বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় আধিপত্য। অন্যদিকে ভারতের শক্তি দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি, বিশাল ভোক্তা বাজার, প্রযুক্তি খাত, দক্ষ মানবসম্পদ এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কৌশলগত অবস্থান। ফলে দুই দেশই এখন বিশ্বের প্রায় সব বড় শক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান কূটনৈতিক বাস্তবতা দেখাচ্ছে যে বিশ্বের দেশগুলো আর একক পরাশক্তির ওপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। তারা একই সঙ্গে বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক সুযোগ এবং নয়াদিল্লির কৌশলগত অংশীদারত্ব উভয়কেই গুরুত্ব দিচ্ছে। গত দুই বছরের ধারাবাহিক উচ্চপর্যায়ের সফরগুলো সেই পরিবর্তনেরই স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল দ্বিপক্ষীয় সফরের সংখ্যা বৃদ্ধির ঘটনা নয়, বরং বিশ্ব ধীরে ধীরে একটি বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, যেখানে চীন ও ভারত উভয়ই আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের সফরগুলো প্রমাণ করছে যে বিশ্ব ধীরে ধীরে একক পরাশক্তিনির্ভর ব্যবস্থা থেকে বহুমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই নতুন বাস্তবতায় বেইজিং অর্থনৈতিক সহযোগিতার অন্যতম কেন্দ্র, আর নয়াদিল্লি কৌশলগত ও প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।


  বিষয়:   বেইজিং  নয়াদিল্লি  বৈশ্বিক ক্ষমতা 


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: