সমবায়ের পুনর্জাগরণ ছাড়া টেকসই পল্লী উন্নয়ন অসম্ভব

​এইচ. এম. হাসান আল মামুন লিমন

মতামত

৬ জুলাই ২০২৬ বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পালিত হতে যাচ্ছে ‘জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস’। এটি কেবলই ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি নতুন দিবস

2026-07-05T17:36:04+00:00
2026-07-05T17:36:04+00:00
  সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬,
২২ আষাঢ় ১৪৩৩
 
সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
মতামত
সমবায়ের পুনর্জাগরণ ছাড়া টেকসই পল্লী উন্নয়ন অসম্ভব
​এইচ. এম. হাসান আল মামুন লিমন
রোববার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ৫:৩৬ পিএম 
এইচ. এম. হাসান আল মামুন লিমন। ছবি: ভোরের ডাক
৬ জুলাই ২০২৬ বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো পালিত হতে যাচ্ছে ‘জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস’। এটি কেবলই ক্যালেন্ডারের পাতায় একটি নতুন দিবস যোগ হওয়া নয়; বরং পল্লী উন্নয়নকে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে আরও সুদৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠার একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এই মহতী উদ্যোগের জন্য সমগ্র দেশের সমবায়ী পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ। একই সাথে আমরা এই শুভক্ষণে তাঁর বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আমাদের প্রত্যাশা—এই দিবস কেবল আনুষ্ঠানিকতার বেড়াজালে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নের ইতিহাস, দর্শন এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে ভাবার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

​ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়
​বাংলাদেশের পল্লী উন্নয়নের ইতিহাস ঘাঁটলে যার নাম স্বমহিমায় সবার আগে উচ্চারিত হয়, তিনি হলেন কিংবদন্তি চিন্তক ড. আখতার হামিদ খান। তাঁর উদ্ভাবিত ‘কুমিল্লা মডেল’, দ্বি-স্তর সমবায় ব্যবস্থা, কৃষক সমবায় সমিতি (কেএসএস) এবং উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি (ইউসিসিএ)—সবই ছিল একটি আত্মনির্ভরশীল, অংশগ্রহণমূলক ও উৎপাদনমুখী গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ে তোলার সুদূরপ্রসারী দর্শনের ফসল।

​স্বাধীনতার পর তৎকালীন সরকার প্রধানের দূরদর্শী রূপকল্প ও রাষ্ট্রীয় দর্শনে ‘সমন্বিত পল্লী উন্নয়ন কর্মসূচি’ (আইআরডিপি) সেই সমবায় ব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দান করে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী সরকার প্রধানদের নীতিগত সিদ্ধান্তে ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে ১৯৮২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড (বিআরডিবি)। লক্ষ্য ছিল সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট—সমবায়ের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষককে সংগঠিত করা, উৎপাদন বৃদ্ধি, সেচ, ঋণ, প্রশিক্ষণ ও গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থার আধুনিকায়নের মাধ্যমে স্থানীয় নেতৃত্ব গড়ে তোলা। আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশের পেছনে যে নীরব বিপ্লব কাজ করেছে, তার মূল ভিত্তিই ছিল সেই কৃষি ও সমবায় আন্দোলন।

​প্রাতিষ্ঠানিক সংকট ও কাঠামোগত দ্বন্দ্ব
​কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, যে সমবায়কে কেন্দ্র করে বিআরডিবির জন্ম ও বিকাশ, সময়ের পরিক্রমায় সেই সমবায়ই আজ বিআরডিবির প্রশাসনিক আড়ালে হারিয়ে যেতে বসেছে। দেশের প্রতিটি উপজেলায় ইউসিসিএ এবং গ্রামপর্যায়ে কৃষক সমবায় সমিতির যে বিশাল নেটওয়ার্ক রয়েছে, তা রাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ এবং কোটি কৃষকের শ্রম-ঘামের ফসল। অথচ বর্তমান রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় এই স্থায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন মিলছে না বললেই চলে।

​উদাহরন স্বরূপ, ‘বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ড আইন, ২০১৮’-এ সমবায়ীদের বিকল্প ‘পল্লী উন্নয়ন দল’কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখানে একটি মৌলিক নীতিগত প্রশ্ন থেকে যায়—সমবায় সমিতির সদস্যরা হলেন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডার, প্রকৃত মালিক ও নীতিনির্ধারক; অন্যদিকে পল্লী উন্নয়ন দলের সদস্যরা মূলত বিভিন্ন প্রকল্পের সাময়িক সুবিধাভোগী বা গ্রাহক। এই দুই কাঠামোর উদ্দেশ্য, দায়বদ্ধতা এবং মালিকানার ভিত্তি কখনোই এক হতে পারে না। তাই বিআরডিবি'র নীতিতে এদের সমান্তরালে বিবেচনা করা কতটা যৌক্তিক, তা ভেবে দেখার জন্য আমরা নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

​পল্লী উন্নয়ন ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আমি দেখেছি—নীতিগত অনীহা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সমবায়কে প্রান্তিক করে দেখার মানসিকতার কারণে অনেক ইতিবাচক উদ্যোগ আলোর মুখ দেখেনি। এটি কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ নয়, বরং মাঠপর্যায়ের লাখো সমবায়ীর বাস্তব অভিজ্ঞতার এক বেদনাবিধুর প্রতিফলন।

​বিলুপ্তির প্রান্তে গ্রামীণ নেটওয়ার্ক
​সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আজ দেশের বহু কৃষক সমবায় সমিতি (কেএসএস) কার্যত বিলুপ্তির পথে। বহু উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতি ( ইউসিসিএ) আজ অস্তিত্ব রক্ষার চরম সংকটে ভুগছে। বছরের পর বছর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা অনিয়মিত, তারা মানবেতর জিবন যাপন করছে। নিজস্ব সম্পদ থাকা সত্ত্বেও আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতায় অনেক প্রতিষ্ঠান স্থবির হয়ে আছে। একসময় যে প্রতিষ্ঠানগুলো কৃষকের বিপদে ঢাল হয়ে দাঁড়াত, আজ তারাই টিকে থাকার লড়াইয়ে ক্লান্ত।

​সমবায় কেবল একটি অর্থনৈতিক মডেল নয়; এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। এটি গ্রামে নেতৃত্ব গড়ে তোলে, পারস্পরিক সৌহার্দ্য বাড়ায় এবং মধ্যস্বত্বভোগী ও মহাজনি ঋণের শোষণ থেকে প্রান্তিক মানুষকে রক্ষা করে। সমবায় যখনই দুর্বল হয়, তখন গ্রামীণ অর্থনীতিতে অপ্রাতিষ্ঠানিক ও অন্যায্য বাজারচক্রের আধিপত্য বাড়ে। ফলে কৃষক ফসলের ন্যায্যমূল্য হারায়, ভোক্তা বাড়তি দামে পণ্য কেনে এবং গ্রামীণ যুবসমাজ কর্মসংস্থান হারিয়ে শহরমুখী হয়।

​এ বছরের জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস উদযাপনের প্রারম্ভিক প্রস্তুতিতেও উপজেলা কমিটি থেকে ইউসিসিএ সভাপতিদের বাদ দেওয়া হয়েছিল, যা পরবর্তীতে সমবায়ীদের যৌক্তিক দাবির মুখে সংশোধন করা হয়। এই একটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে, নীতিনির্ধারণী মহলে সমবায়ের অবদান ও গুরুত্ব নিয়ে এখনো বড় ধরনের বোঝাপড়ার ঘাটতি রয়েছে।

​প্রকল্পনির্ভরতা বনাম প্রাতিষ্ঠানিক টেকসইত্ব
​আমরা যদি সত্যিই একটি বৈষম্যহীন ও টেকসই পল্লী উন্নয়ন দেখতে চাই, তবে আমাদের ‘প্রকল্পনির্ভরতা’ থেকে বেরিয়ে ‘প্রতিষ্ঠাননির্ভরতা’র দিকে নজর দিতে হবে। কারণ প্রকল্প নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে শেষ হয়ে যায়, কিন্তু একটি শক্তিশালী সমবায় প্রতিষ্ঠান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে উন্নয়নের সুফল বহন করে।

​বিআরডিবি ও সমবায়কে একে অপরের প্রতিপক্ষ ভাবার কোনো সুযোগ নেই; তারা পরস্পরের পরিপূরক অংশীদার। বিআরডিবির আসল শক্তি নিহিত রয়েছে তার মূল ভিত্তি—অর্থাৎ কৃষক সমবায় ও ইউসিসিএ-এর শক্তিশালীকরণের মধ্যে। সরকার যদি কৃষক সমবায় সমিতির পুনর্জাগরণ, ইউসিসিএকে আর্থিক ও প্রশাসনিকভাবে স্বাবলম্বী করা, সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিপণ্য সরাসরি বাজারজাতকরণ এবং আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবস্থাপনাকে জাতীয় নীতিতে অগ্রাধিকার দেয়, তবেই গ্রামীণ অর্থনীতির সমূল পরিবর্তন সম্ভব।

​সমবায়ের বিকল্প শুধু সমবায়
প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনা ও শক্তিশালী হস্তক্ষেপ ছাড়া এই ঐতিহাসিক কৃষিভিত্তিক সমবায় নেটওয়ার্ককে পুনরুজ্জীবিত করা প্রায় অসম্ভব। তাই জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবসের এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে আমরা দেশের সমবায় ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় তাঁর সদয় দৃষ্টি ও জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি। যে নেটওয়ার্কের জন্ম হয়েছিল কৃষকের অর্থনৈতিক মুক্তি ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে, তাকে আমলাতান্ত্রিক অবহেলায় বিলীন হতে দেওয়া জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

​জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবসের এই শুভক্ষণে আমাদের একটাই জোরালো দাবি—সমবায়কে আবার পল্লী উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনা হোক। অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার, কৃষকের মর্যাদা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখার একমাত্র পরীক্ষিত হাতিয়ার সমবায়। বাংলাদেশের টেকসই পল্লী উন্নয়নের বিকল্প অনেক কর্মসূচি হতে পারে, কিন্তু সমবায়ের কোনো বিকল্প নেই। এটিই ইতিহাসের শিক্ষা এবং ভবিষ্যতের অনিবার্য প্রয়োজন।

লেখক: সভাপতি, বাংলাদেশ জাতীয় পল্লী উন্নয়ন সমবায় ফেডারেশন


  বিষয়:   বাংলাদেশ  জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস  সমবায়ের পুনর্জাগরণ 


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: