মধ্য জুন ২০২৬। নওগাঁর একটি মাদ্রাসা। বয়সে কেবল কিশোর, এমন এক ছাত্রকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে তারই এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, অভিযোগের পর অভিযুক্ত শিক্ষক পলাতক। সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে, মানুষ পড়েছে, ক্ষুব্ধ হয়েছে, তারপর হয়তো অন্য খবরে চলে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- এই ঘটনাকে আমরা কী নামে ডাকব?
সংবাদ প্রতিবেদনে ব্যবহৃত হয়েছে “বলাৎকার” শব্দটি। কিন্তু বাস্তবে এটা কী? এটা একজন শিশুর ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতা। এটা ধর্ষণ। এবং এর চেয়েও বড় সত্য হলো, এটা আমাদের সমাজের নৈতিক ব্যর্থতার আরেকটি নির্মম দলিল।
নওগাঁর ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়। মুন্সীগঞ্জের এক গ্রামের ১৫ বছরের এক কিশোর হয়তো এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি তার সঙ্গে কী ঘটেছে। সংবাদপত্রের ভাষায় তার ঘটনাটিও “বলাৎকার”। কিছুদিন পর রাজধানী থেকে আরেকটি খবর আসে- এক কিশোরকে বলাৎকারের ঘটনায় গ্রেপ্তারের পর আরও চার শিশুর ওপর একই ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এরপর একই ধরনের সংবাদ এসেছে মেহেরপুর, পটুয়াখালী, পঞ্চগড়সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে।
স্থান বদলেছে, অপরাধীর পরিচয় বদলেছে, কিন্তু অপরাধের ধরন বদলায়নি। বদলায়নি আমাদের সামাজিক প্রতিক্রিয়াও। আমরা ছেলেশিশুর ক্ষেত্রে “বলাৎকার” শব্দ ব্যবহার করেছি, যেন এটা ধর্ষণ নয়, যেন একজন ছেলে শিশুর শরীর ও মানসিকতার ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতা মেয়ে শিশুর বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের তুলনায় ভিন্ন কোনো ঘটনা। অথচ আইনের ভাষায়, মানবাধিকারের ভাষায় এবং শিশুর বেদনার ভাষায়- এটাও ধর্ষণ, এটাও ভয়াবহ যৌন সহিংসতা।
বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা এখন আর বিচ্ছিন্ন নয়, এটা এক ভয়াবহ সামাজিক বাস্তবতা। কয়েক বছর আগেও শিশু ধর্ষণের কোনো ঘটনা সমাজকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিত। কিন্তু আজ যেন আমরা ভয়াবহতার সঙ্গেই সহাবস্থান করতে শিখে গেছি। সংবাদপত্রের পাতা, টেলিভিশনের পর্দা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম- সবখানেই নিয়মিতভাবে উঠে আসছে শিশু ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, ধর্ষণচেষ্টা এবং হত্যার খবর।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঘটনার বড় অংশের ভুক্তভোগী শিশু এবং অপরাধীদের অধিকাংশই শিশুর পরিচিত মানুষ।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে শিশু ইরা মনি ও রাজধানীর পল্লবীতে রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা সারাদেশকে স্তম্ভিত করেছে। একই সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু ধর্ষণ ও যৌন সহিংসতার একাধিক ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যেই অন্তত ১১৮ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। একই সময়ে ধর্ষণচেষ্টার পর হত্যা এবং যৌন নির্যাতনের বহু ঘটনাও ঘটেছে।
তবে মেয়ে শিশুর পাশাপাশি ছেলে শিশুদের বিরুদ্ধে সংঘটিত যৌন সহিংসতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিতে হবে। আমাদের সমাজে ছেলে শিশু ধর্ষণের ঘটনাকে প্রায়শই “বলাৎকার” শব্দ দিয়ে আলাদা করে দেখা হয়। যেন “ধর্ষণ” শব্দটি কেবল মেয়ে শিশুর জন্য সংরক্ষিত।
এই ভাষাগত বিভাজনের পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক মনস্তত্ত্ব। আমরা ছেলে শিশুদের দুর্বল বা অসহায় হিসেবে দেখতে চাই না। ফলে তাদের ওপর সংঘটিত যৌন সহিংসতাকে আড়াল করা হয়, লজ্জার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কিংবা পরিবারগুলো ঘটনাই প্রকাশ করে না। অথচ ছেলে শিশু ধর্ষণের শিকার হলে তার মানসিক ক্ষত, সামাজিক আঘাত এবং ভবিষ্যৎ জীবনের ঝুঁকি কোনো অংশেই কম নয়।
বাংলাদেশে শিশু নির্যাতনের পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে অন্তত ১,০০৫ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। পরবর্তী বছরগুলোতেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ৩০৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৭৫ শতাংশ বেশি। একই সময়ে ১২৯ জন শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়।
জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের মতে, বাংলাদেশে শিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার বড় অংশই ঘটে পরিচিত মানুষের হাতে- আত্মীয়, প্রতিবেশী, শিক্ষক কিংবা পরিবারের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের মাধ্যমে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন শিশুনির্যাতনকারীর মধ্যে প্রায় ৯ জনই শিশুর পরিচিত মানুষ। যৌন নির্যাতনের বহু ঘটনাই ঘটছে শিশুর নিজের ঘর কিংবা পারিবারিক পরিবেশে।
প্রশ্ন হলো, কেন এত বেশি শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে?
প্রথম কারণ বিচারহীনতা। ধর্ষণ মামলার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। বহু পরিবার মামলা করতে চায় না, কারণ তারা জানে বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লাগবে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিপুলসংখ্যক মামলা বছরের পর বছর বিচারাধীন অবস্থায় পড়ে আছে। এই বিলম্ব অপরাধীদের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ তৈরি করে। তারা বিশ্বাস করে, ধরা পড়লেও শেষ পর্যন্ত পার পেয়ে যাওয়া সম্ভব। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন তুললে দ্রুত বিচার হয়, আদালত রায়ও দেন, কিন্তু সেই শাস্তি কার্যকর হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
দ্বিতীয় কারণ সামাজিক নীরবতা। শিশু যৌন নির্যাতনের ক্ষেত্রে পরিবারগুলো প্রায়ই ঘটনাকে গোপন রাখে। বিশেষ করে ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে সামাজিক লজ্জা, অপমানের ভয় এবং পুরুষত্ব সম্পর্কে ভুল ধারণা পরিবারকে মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করে। ফলে অপরাধীরা আরও সাহসী হয়ে ওঠে।
তৃতীয় কারণ শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা। অনেক স্কুল, মাদ্রাসা, আবাসিক প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মক্ষেত্রে শিশু সুরক্ষার কোনো কার্যকর নীতি নেই। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পর্যবেক্ষণও অনুপস্থিত। ফলে ক্ষমতার সম্পর্ককে ব্যবহার করে অপরাধীরা শিশুদের শিকার বানায়।
চতুর্থ কারণ ডিজিটাল ও সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সচেতনতা না বাড়া। অধিকাংশ শিশু জানে না “নিরাপদ স্পর্শ” এবং “অনিরাপদ স্পর্শ” কী। পরিবারও এসব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে সংকোচ বোধ করে। ফলে শিশুরা বিপদের সংকেত বুঝতে পারে না।
এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে কয়েকটি জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, শিশু ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের মামলাগুলোর দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি বিচারের রায় দ্রুত কার্যকর করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ছেলে ও মেয়ে- উভয় শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ছেলে শিশু ধর্ষণের ঘটনাকে “বলাৎকার” বলে আড়াল না করে স্পষ্টভাবে যৌন সহিংসতা বা ধর্ষণ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শিশু সুরক্ষা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। শিক্ষক, কর্মচারী এবং অভিভাবকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে।
চতুর্থত, শিশুদের বয়সোপযোগী যৌন ও নিরাপত্তা শিক্ষা দিতে হবে। নিরাপদ স্পর্শ, অনিরাপদ স্পর্শ, সম্মতি এবং সাহায্য চাওয়ার উপায় সম্পর্কে শিশুদের সচেতন করতে হবে।
পঞ্চমত, ভুক্তভোগী শিশুদের জন্য মনোসামাজিক সহায়তা, আইনি সহায়তা এবং পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। কারণ ধর্ষণের শিকার শিশুর জীবনের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কেবল বিচার নয়, প্রয়োজন পুনরুদ্ধার এবং নতুনভাবে বাঁচার সুযোগ।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, একজন শিশু যখন ধর্ষণের শিকার হয়, তখন শুধু একজন শিশুর জীবনই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত হয় একটি সমাজের নৈতিক ভিত্তিও। আমরা যদি ছেলেশিশুর কান্নাকে “বলাৎকার” শব্দের আড়ালে লুকিয়ে রাখি এবং মেয়ে শিশুর কান্নাকে শুধু সংবাদ শিরোনাম হিসেবে ব্যবহার করি, তাহলে আমরা প্রকৃত সমস্যাকেই অস্বীকার করছি।
শিশুর কোনো লিঙ্গ নেই, তার পরিচয় একটাই- সে শিশু। আর প্রত্যেক শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র, সমাজ এবং আমাদের সবার যৌথ দায়িত্ব।
ছেলেশিশুর কান্নাও ধর্ষণের ভাষা। সেই কান্না শোনার সময় এখনই। ছেলেশিশুর কান্না আমাদের শুনতে হবে, বুঝতে হবে। নইলে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।
লেখক: কথাসাহিত্যিক