নতুন বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা ও বাস্তবতা

ইসতিয়াক ইমন

মতামত

গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে বাংলাদেশ যখন নতুন রাষ্ট্রচিন্তা, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেছে, তখন সড়ক নিরাপত্তার

2026-07-05T15:25:23+00:00
2026-07-05T15:25:23+00:00
  সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬,
২২ আষাঢ় ১৪৩৩
 
সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
মতামত
নতুন বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা ও বাস্তবতা
ইসতিয়াক ইমন
রোববার, ৫ জুলাই, ২০২৬, ৩:২৫ পিএম 
সংগৃহীত ছবি
গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে বাংলাদেশ যখন নতুন রাষ্ট্রচিন্তা, জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রত্যয়ে এগিয়ে চলেছে, তখন সড়ক নিরাপত্তার প্রশ্নটি নতুন করে গুরুত্বের সঙ্গে সামনে এসেছে। রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদা রক্ষা করা। অথচ বাংলাদেশের সড়কগুলোতে প্রতিদিন যে সংখ্যক প্রাণ ঝরে পড়ছে, তা কেবল দুর্ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা, অব্যবস্থাপনা এবং দুর্বল বাস্তবায়নের প্রতিফলন। সড়কে মৃত্যু যেন আমাদের সামাজিক জীবনের এক স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এই স্বাভাবিকীকরণই সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রোড ক্র্যাশে প্রায় আট হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিআরটিএর হিসাবেও মৃত্যুর সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার  ‘গেøাবাল স্ট্যাটাস রিপোর্ট অন রোড সেফটি’ অনুযায়ী এই সংখ্যা আরও উদ্বেগজনকÑপ্রায় ত্রিশ হাজার। পরিসংখ্যানের এই বিশাল পার্থক্য একটি মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতার দিকে ইঙ্গিত করেÑরাষ্ট্র এখনো রোড ক্র্যাশ পরিমাপের জন্য একটি অভিন্ন ও বিজ্ঞানসম্মত তথ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। তবে সব পরিসংখ্যানই এক বিষয়ে একমত: প্রতিদিন গড়ে অন্তত একুশ থেকে চব্বিশ জন মানুষ সড়কে প্রাণ হারাচ্ছেন, আহত হচ্ছেন আরও কয়েকগুণ। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা ও আইআরএপি এর তথ্য অনুযায়ী, রোড ক্র্যাশে এই অর্থনৈতিক ক্ষতি বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপির  প্রায় ২ থেকে ৩ শতাংশ গ্রাস করে, যা টাকার অঙ্কে কয়েক হাজার কোটি টাকা। ফলে এটি শুধু মানবিক সংকট নয়, টেকসই উন্নয়নেরও  একটি বড় প্রতিবন্ধক।

রোড ক্র্যাশের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়  ৪০ শতাংশের বেশি মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক এবং প্রায় ৫২ শতাংশ ঘটনায় পথচারীরা গাড়িচাপার শিকার হচ্ছেন। এটি প্রমাণ করে যে আমাদের সড়ক অবকাঠামো এখনো মানুষকেন্দ্রিক হয়ে উঠতে পারেনি, বরং তা কেবল যানবাহনের জন্য তৈরি। নিরাপদ ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং, আন্ডারপাস, সাইকেল লেন কিংবা গতি নিয়ন্ত্রণের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা অত্যন্ত অপর্যাপ্ত। রাজধানী ঢাকার চিত্র আরও হতাশাজনক। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের গবেষণায় ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০০৭ সালে যেখানে যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার, তা এখন নেমে এসেছে মাত্র সাড়ে চার থেকে সাত কিলোমিটারে, যা মানুষের স্বাভাবিক হাঁটার গতির কাছাকাছি। একটি আদর্শ নগরে মোট আয়তনের ২০ থেকে ২৫ শতাংশ সড়ক থাকা উচিত হলেও ঢাকায় আছে মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ। ফলে প্রতিদিন প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা যানজটে নষ্ট হচ্ছে, যা জাতীয় উৎপাদনশীলতাকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা যে আধুনিক দর্শনে স্থিত হয়েছেন তার নামসেইফ সিস্টেম তত্ত। এই দর্শনের মূল কথা হলোÑমানুষ ভুল করতেই পারে, কারণ ভুল মানুষের স্বভাবজাত সীমাবদ্ধতা, কিন্তু সেই ভুলের পরিণতি বা শাস্তি কখনো মৃত্যু হওয়া উচিত নয়। প্রচলিত সনাতন দৃষ্টিভঙ্গিতে দুর্ঘটনার সম্পূর্ণ দায় চালক বা পথচারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু “সেইফ সিস্টেম” তত্ত¡ বলে, এই দায় সড়ক নকশাকার, যানবাহন প্রস্তুতকারক, আইন প্রণেতা ও প্রশাসনকেও সমানভাবে ভাগ করে নিতে হবে। নেদারল্যান্ডস এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে মডেল তৈরি করে আজ বিশ্বের সর্বনিম্ন মাথাপিছু সড়ক মৃত্যুর দেশে পরিণত হয়েছে। এমনকি মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামের মতো উদীয়মান অর্থনীতিও এই মডেল আংশিক গ্রহণ করে মোটরসাইকেল লেন ও কঠোর হেলমেট আইন প্রয়োগের মাধ্যমে মৃত্যুহার কমিয়ে এনেছে, যা প্রমাণ করে এই দর্শন কেবল ধনী দেশের বিলাসিতা নয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় গণপরিবহন খাতের গভীর সংস্কার ও অব্যবস্থাপনার অবসান বিশেষভাবে জরুরি। বিআরটিএ ও মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নিজস্ব হিসাবেই ঢাকায় ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা প্রায় সোয়া লাখ, এবং অন্তত ৩০ শতাংশ বাসচালকের কোনো বৈধ লাইসেন্স নেই। চালকদের সমস্যাটিও বহুমুখী- অপ্রতুল প্রশিক্ষণে লাইসেন্স লাভ, বিশ্রামহীন একটানা ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা গাড়ি চালানো এবং তীব্র মানসিক ক্লান্তি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে, একটানা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালালে চালকের প্রতিক্রিয়া ক্ষমতা মদ্যপ অবস্থার মতোই হ্রাস পায়। সম্প্রতি চালকদের দৈনিক সর্বোচ্চ আট ঘণ্টার সীমা বেঁধে দেওয়া হলেও কার্যকর তদারকির অভাবে তা কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ। আইন বাস্তবায়িত হলে চালকের কর্মঘণ্টা, বাধ্যতামূলক বায়োমেট্রিক প্রশিক্ষণ এবং ডোপ টেস্ট একটি স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল ট্র্যাকিং কাঠামোর অধীনে আসবে, যেখানে চালকের পাশাপাশি মালিকপক্ষও সমান আইনি দায়বদ্ধতার আওতায় পড়বে।

ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়হীনতা দূর করা সময়ের দাবি। বর্তমানে ঢাকায় ডিএমপি, ডিটিসিএ এবং বিআরটিএÑএই তিন সংস্থা সম্পূর্ণ সমন্বয়হীনভাবে কাজ করায় বিশৃঙ্খলা আরও প্রকট হয়। মহাসড়কে ধীরগতির তিন চাকার যান (নসিমন, করিমন, ইজিরাইক) এবং দ্রæতগতির দূরপাল্লার বাস-ট্রাক একই লেনে চলাচল করায় অধিকাংশ ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটে। উন্নত দেশের মতো প্রযুক্তিভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় নজরদারি, লাইসেন্স থেকে পয়েন্ট-কর্তন ব্যবস্থা এবং মহাসড়কে ‘সার্ভিস লেন’ বা পৃথক লেন নিশ্চিত করা গেলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কোনো ব্যক্তির বিচারবোধের ওপর নির্ভরশীল না থেকে একটি কাঠামোগত নিয়মে পরিচালিত হবে। তখন একজন ট্রাফিক সার্জেন্টকে আর রাজনৈতিক বা স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে এককভাবে লড়তে হবে না, আইনই হবে তার ঢাল।

এই আইন ও নীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে এর সুফল হবে বহুমাত্রিক ও পরিমাপযোগ্য। সুইডেন বা নেদারল্যান্ডসের মতো মৃত্যুসংখ্যা যদি অর্ধেকেও নামিয়ে আনা যায়, তবে বাংলাদেশে বছরে হাজার হাজার কর্মক্ষম প্রাণ রক্ষা পাবে, যা কোনো অর্থনৈতিক সূচকে মাপা সম্ভব নয়। চিকিৎসা ব্যয় ও কর্মঘণ্টা ক্ষয় কমলে জিডিপির যে বিশাল ক্ষতি হচ্ছে, তা সাশ্রয় হয়ে জাতীয় উৎপাদনে পুনর্বিনিয়োগযোগ্য সম্পদে রূপান্তরিত হবে। গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ফিরলে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর মানুষের নির্ভরতা কমবে, যা পরোক্ষে যানজট ও পরিবেশ দূষণÑদুটোই উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করবে। নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছেও একটি ইতিবাচক রাষ্ট্রীয় বার্তা পাঠায়, যা দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়।

নতুন বাংলাদেশের অভিযাত্রায় সড়ক নিরাপত্তা আইন কোনো গৌণ বিষয় বা বিলাসিতা নয়; এটি নাগরিকের বেঁচে থাকার ন্যূনতম মৌলিক অধিকার। প্রতিটি প্রাণ রাষ্ট্রের সম্পদ, প্রতিটি অকাল মৃত্যু জাতির অপূরণীয় ক্ষতি। তাই সড়কে প্রাণহানি কমাতে বিচ্ছিন্ন বা ক্ষণস্থায়ী জরিমানার চক্রে আটকে না থেকে প্রয়োজন সমন্বিত, প্রমাণভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত পরিবর্তন। নাগরিকের জীবন আল্লাহর হাতে, কিন্তু তার কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সম্পূর্ণ রাষ্ট্রের। এই সত্য অনুধাবন করে সংসদে অবিলম্বে “সেইফ সিস্টেম এপ্রোচ” ভিত্তিক আধুনিক আইন উত্থাপন ও তা বাস্তবায়নের সময় এখনই।

লেখক: কর্মী, বাংলাদেশ ডিবেট ফেডারেশন


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: