বেলুচিস্তান থেকে আজাদ কাশ্মীর: পাকিস্তানের দ্বিমুখী সংকট

সুজন দে

মতামত

পাকিস্তান আবারও এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন দেশের দুই ভিন্ন প্রান্তে দুটি ভিন্ন ধরনের সংকট একসঙ্গে সামনে এসেছে। পশ্চিমে

2026-07-16T19:10:21+00:00
2026-07-16T19:10:21+00:00
  সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬,
৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬
মতামত
বেলুচিস্তান থেকে আজাদ কাশ্মীর: পাকিস্তানের দ্বিমুখী সংকট
সুজন দে
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬, ৭:১০ পিএম 
ছবি: সুজন দে
পাকিস্তান আবারও এমন এক সময় অতিক্রম করছে, যখন দেশের দুই ভিন্ন প্রান্তে দুটি ভিন্ন ধরনের সংকট একসঙ্গে সামনে এসেছে। পশ্চিমে বেলুচিস্তানে দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। অন্যদিকে, উত্তরে পাকিস্তান-শাসিত আজাদ কাশ্মীরে রাজনৈতিক অধিকার, প্রশাসনিক ক্ষমতা ও প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নে জনঅসন্তোষ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই দুই সংকটের চরিত্র এক নয়, লক্ষ্যও ভিন্ন; কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই ইসলামাবাদের জন্য এগুলো নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও রাজনীতির বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

বেলুচিস্তান পাকিস্তানের আয়তনে সবচেয়ে বড় হলেও জনসংখ্যার দিক থেকে তুলনামূলক ছোট। অথচ দেশটির প্রাকৃতিক গ্যাস, তামা, স্বর্ণ, কয়লা এবং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তামা-স্বর্ণ খনি রেকো ডিকসহ বিপুল খনিজ সম্পদের বড় অংশ এই প্রদেশে অবস্থিত। একই সঙ্গে আরব সাগরের তীরে অবস্থিত গওয়াদর বন্দর চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC)-এর কেন্দ্রবিন্দু। ফলে বেলুচিস্তানের গুরুত্ব কেবল পাকিস্তানের জন্য নয়, গোটা অঞ্চলের ভূরাজনীতির জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই বেলুচ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ, প্রদেশের সম্পদ থেকে স্থানীয় জনগণ ন্যায্য অংশ পায় না। উন্নয়ন প্রকল্পে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ সীমিত, কর্মসংস্থানও প্রত্যাশার তুলনায় কম। সেই সঙ্গে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা এবং নির্বিচার গ্রেপ্তারের অভিযোগও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো বহু বছর ধরে তুলে আসছে। পাকিস্তান সরকার অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলছে, সন্ত্রাসবাদ দমনে আইন অনুযায়ী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

গত দুই দিন ধরে সামাজিক মাধ্যমে বেলুচিস্তান নিয়ে নানা দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও বলা হচ্ছে, বিস্তীর্ণ এলাকা বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে; কোথাও আবার স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণার দাবি প্রচার করা হচ্ছে।

বেলুচিস্তানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর আন্তর্জাতিক মাত্রা। গওয়াদর বন্দর ও সিপিইসি প্রকল্পে চীনের কয়েক দশকের বিনিয়োগ রয়েছে। ফলে সেখানে অস্থিতিশীলতা শুধু পাকিস্তানের নয়, চীনের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থেও প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে এই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্য, ভারত মহাসাগর ও দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক কৌশলগত ভারসাম্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

অন্যদিকে, পাকিস্তান-শাসিত আজাদ কাশ্মীরের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটের। এখানে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়; বরং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, প্রশাসনিক ক্ষমতা, সাংবিধানিক কাঠামো এবং স্থানীয় জনগণের অধিকার। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে তাদের মতামতের যথাযথ প্রতিফলন ঘটে না এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার বড় অংশ ইসলামাবাদের নিয়ন্ত্রণে থেকে যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে এসব দাবিকে ঘিরে আন্দোলন, বিক্ষোভ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে হতাহত ও গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হলেও প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে সরকারি ও আন্দোলনকারী পক্ষের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। পাকিস্তান সরকার বলছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিপরীতে, আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক দাবির জবাবে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয়েছে।

আজাদ কাশ্মীরের গুরুত্ব কেবল পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি ভারত-পাকিস্তান বিরোধের অন্যতম স্পর্শকাতর অঞ্চল। ফলে এখানকার যেকোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা বা নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে এবং দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাতে পারে।

এখানেই দুটি সংকটের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়। বেলুচিস্তান ও আজাদ কাশ্মীরের রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন হলেও, উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের অংশগ্রহণ, আস্থার সংকট এবং শাসনব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশের মত, দীর্ঘমেয়াদে কেবল সামরিক অভিযান বা কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিয়ে এ ধরনের সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রাজনৈতিক সংলাপ, স্থানীয় জনগণের আস্থা অর্জন, সুশাসন এবং অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিই টেকসই সমাধানের ভিত্তি হতে পারে।

পাকিস্তানের অতীত অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। যেসব সংকটের শিকড় রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং প্রতিনিধিত্বের ঘাটতিতে নিহিত, সেগুলোর সমাধান শুধুমাত্র শক্তি প্রয়োগে আসে না। বরং দীর্ঘমেয়াদে তা অসন্তোষকে আরও গভীর করে তুলতে পারে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি নাগরিকের রাজনৈতিক অধিকার ও আস্থাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় পাকিস্তানের সামনে তাই একটি কঠিন সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে। ইসলামাবাদ কি নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নীতিকেই আরও জোরদার করবে, নাকি রাজনৈতিক সংলাপ, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের পথে এগোবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু বেলুচিস্তান বা আজাদ কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বরং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনীতির ভবিষ্যৎ গতিপথও অনেকাংশে প্রভাবিত করবে।

আজকের বিশ্বে রাষ্ট্রের শক্তি শুধু সামরিক সক্ষমতায় নয়, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, সুশাসন এবং জনগণের আস্থার ওপরও নির্ভর করে। পাকিস্তানের দুই প্রান্তের চলমান অস্থিরতা সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। সংকটের স্থায়ী সমাধান যদি খুঁজতেই হয়, তবে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক পথেই ফিরতে হবে—ইতিহাস অন্তত সেই কথাই বলে।

লেখক: সাংবাদিক ও সাধারণ সম্পাদক, পলিটিক্যাল রিপোর্টার্স ফোরাম।


  বিষয়:   পাকিস্তান  বেলুচিস্তান  কাশ্মীর  দ্বিমুখী সংকট 


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: