অপরিসীম শ্রদ্ধায় স্যারের চির উন্নত মস্তক ছুঁয়ে দিলাম

আবদুর রহমান মল্লিক

মতামত

আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যার জীবনের অপরিসীম পূর্ণতা নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন অজানা ভুবনে। রবিবার (৫ জুলাই) দুপুরে খবর পেলাম স্যার

2026-07-12T18:07:31+00:00
2026-07-12T18:07:55+00:00
  সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬,
২৯ আষাঢ় ১৪৩৩
 
সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
মতামত
অপরিসীম শ্রদ্ধায় স্যারের চির উন্নত মস্তক ছুঁয়ে দিলাম
আবদুর রহমান মল্লিক
রোববার, ১২ জুলাই, ২০২৬, ৬:০৭ পিএম  আপডেট: ১২.০৭.২০২৬ ৬:০৭ পিএম
সংগৃহীত ছবি
আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যার জীবনের অপরিসীম পূর্ণতা নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন অজানা ভুবনে। রবিবার (৫ জুলাই) দুপুরে খবর পেলাম স্যার আর নেই। তখনও সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রচারিত হয়নি। নিশ্চিত হবার জন্য ফোন করলাম বাংলা একাডেমির একজন পরিচালককে। তিনিও নিশ্চিত নন। সারের একান্ত কাছের সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম ভাইকে ফোন দিলাম, উনি নিশ্চিত করলেন। এরপর একে একে বিভিন্ন গণমাধ্যমে স্যারের ইন্তেকালের খবর প্রচারিত হলো। স্যারের সঙ্গে আমার একটু ভালো যোগাযোগ থাকার কারণে অনেকেই স্যারের বিষয়ে জানতে ফোন করলেন।

অনেকদিন ধরে বার্তা সম্পাদক অসুস্থ এবং অনুপস্থিত থাকার কারণে কাজের চাপ ছিল অনেক বেশি। স্যারের জন্য নিজের পত্রিকায় একটু স্পেশাল করে কিছু লিখব সেটিও পারিনি। একজন রিপোর্টারকে বললাম নিউজ দিতে। নিউজের সঙ্গে স্যারের একটা পোর্ট্রেট ছবি ছাপলাম যেটি আগে করা ছিল। স্যারের জন্য আলাদা কোনো আবেগ প্রকাশের স্কোপ পাইনি। সীমাহীন অজ্ঞতা নিয়েও মহীরূহসম কিছু মানুষের সান্নিধ্যে যাবার সুযোগ হয়েছে তার মধ্যে আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যার অন্যতম। আমার ক্ষুদ্রতা, অক্ষমতা নিয়ে আমার কোনো সংশয় নেই। তবুও কিছু ভালো মানুষের স্নেহ ভালোবাসায় আমি ধন্য। সারেঙ এর বেশ কয়েকটি বিশেষ সংখ্যা করেছিলাম। পরে চিন্তা করলাম প্রয়াতদের নিয়ে শুধু নয় জীবদ্দশায় যেন কিছু মানুষ তাঁর কীতির্র অনেকটাই যেন দেখে যেতে পারেন। জীবন্ত কিংবদন্তি হিসেবে আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যারকে দিয়েই সেই কাজটি শুরু করেছিলাম। এসব সংখ্যা সময় নিয়ে করতে হয়। তাড়াহুড়া করে সম্ভব নয়। কাজ শুরু করার পর ভাবছিলাম সংখ্যা প্রকাশের আগে স্যারকে হারিয়ে না ফেলি। জানুয়ারি ২০২৬ মাসে প্রকাশিত হয় সারেঙ অধ্যাপক আবুল কাসেম সংখ্যা। সংখ্যাটি প্রকাশের পর বাংলা একাডেমি আল মাহমুদ সভাকক্ষে আয়োজন করি সংখ্যার প্রকাশনা উৎসব। যেখানে কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনসহ গুণীজন উপস্থিত ছিলেন। সংখ্যাটিতে বাংলা একাডেমি মহাপরিচালক অধাপক ড. মুহাম্মদ আজম ৬ হাজারের অধিক শব্দের একটি প্রবন্ধ দিয়ে আমাকে কৃতজ্ঞ করেছেন। ফোনে তিনি সংখ্যার প্রচ্ছদের তারিফ করেছেন। অংকনশিল্পীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

বাংলা একাডেমিতে গিয়ে যেদিন স্যারের হাতে সংখ্যাটা তুলে দিই সেটি ছিল এক অপূর্ব মুহূর্ত। স্যার খুব স্যুটেড বুটেড হয়ে অফিসে এসেছিলেন। নক করে দরজা ঠেলতেই স্যার বললেন আসো আসো। স্যারের মেয়ে অধ্যাপক সুচিত্রা শারমিন তাঁর পাশে বসে কথা বলছেন। দূরের সোফায় বসতে গিয়ে ভাবলাম ওনাদের জরুরি কোনো কথা আছে হয়ত। তখন বললাম, স্যার আমরা বাইরে বসি আপনি ফ্রি হোন। বললেন ঠিক আছে। পিয়ন ডেকে আমাদের চা দিতে বললেন। একটু পর শফিকুল ইসলাম ভাই এলেন। স্যার কিছু সময় পর বের হয়ে আমাদের সামনে একটা চেয়ারে বসলেন। সবাই দাঁড়িয়ে স্যারকে সম্মান জানালাম। সারেঙ এর কয়েকটা কপি স্যারের হাতে তুলে দিলাম। অত্যন্ত আনন্দের অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন। বেশ ভালো হয়েছে। পৃষ্ঠা ওল্টাতে থাকলেন। এরপর সুচিত্রা শারমিন স্যারের রুম থেকে বের হলেন। বললেন, আপনি যোগাযোগ করেছেন আপনাকে লেখা দিয়ে সহযোগিতা করতে পারিনি। ঠিক আছে, বলে একটা কপি তাকে দিলাম। পরে সবাই মিলে স্যারের রুমে গিয়ে বসলাম। নানা আলাপচারিতার পর বললেন তোমার টিমের সবাই নিয়ে একদিন আসো চা খাওয়া যাবে। 

স্যার দু তিন বার আমাকে ফোন দিয়েছিলেন। বিষয় ছিল যারা তাঁর সংখ্যায় লিখেছেন তাদের নিয়ে তিনি চা খাবেন। স্যার তাঁর বাটন ফোন ঘেঁটে আমাকে ফোন দিবেন সেটি তাঁর বয়সের কারণেই অকল্পনীয়। আমিও অভিভূত হয়েছি। স্যারকে বিনয়ের সাথে জানালাম নিশ্চয়ই সবাইকে জানিয়ে দিব। দিন তারিখ ঠিক করে সবাইকে জানিয়েছিলাম। সবাই স্যারের আহ্বানে অত্যন্ত খুশি হয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সেদিন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে সভাটি সফল হয়নি।  

স্যার যেদিন মারা গেলেন তার আগের দিন শনিবার শফিক ভাইর গ্রন্থের আলোচনা সভায় বাংলা একাডেমিতে এসেছিলাম। স্যারের সাথে দেখা, হেসে বললেন কেমন আছো। অফিসের তাড়ায় সবার সাথে দেখা করে চলে এসেছি। সেই দিন শেষ দেখা। আর দেখলাম জানাজার সময়ে। সবাই একে এক স্যারের চেহারা শেষবারের মতো দেখছেন। আমি অপরিসীম শ্রদ্ধায় পিতৃতুল্য স্যারের চির উন্নত মস্তক ছুঁয়ে দিলাম। 

অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক দীর্ঘ এক জীবন পেয়েছিলেন। সে জীবনের তিনি কোনো অপচয় করেছেন বলে মনে হয় না। তাঁর আদর্শিক সমালোচনা হয়তো কেউ করতেও পারেন তবে ব্যক্তি ফজলুল হক স্যারের ব্যাপারে সবাইকে সমীহ করতে দেখেছি। আমি যেটা বুঝেছি সবাইকে দেশপ্রেমিক হবার আহ্বান জানিয়েছেন, রাষ্ট্রটাকে নতুনভাবে বিনির্মাণ করতে চেয়েছেন। কোনো দলীয় বৃত্তের ভেতর থেকে নিজের কিছুটা স্বার্থ বাগিয়ে নেবার বিন্দুমাত্র প্রবণতা তাঁর ছিল না। নইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হওয়া তাঁর জন্য কোনো ব্যাপারই হতো না। আমরা একটি সেমিনার থেকে তাকে জাতীয় অধ্যাপক করার দাবি জানিয়ে ছিলাম। কিন্তু কোনো সরকার এগিয়ে আসেনি। অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করলাম তাঁর মৃত্যুতে শোকবানী প্রেসিডেন্ট কিংবা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দেওয়া হয়নি। যদিও শেষ শ্রদ্ধা জানাতে সংস্কৃতিমন্ত্রী এসেছিলেন। তবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্যারকে নিয়ে জাতীয় দৈনিকগুলো অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ প্রকাশ করেছে। 

দেশের একজন শীর্ষ বুদ্ধিজীবী ও রাষ্ট্রচিন্তক কেন দলীয় বিবেচনায় মূল্যায়িত হবেন। তাঁর শুন্যস্থান পূরণ হবার নয়। আবুল কাসেম ফজলুল হক স্যার শিক্ষা, সংস্কৃতির ও রাজনীতির জন্য যে অবদান রেখে গেছেন তা অতুলনীয়। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।  

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সাহিত্য সম্পাদক 


  বিষয়:   অপরিসীম শ্রদ্ধায়  স্যারের চির উন্নত  মস্তক ছুঁয়ে দিলাম 


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: