আমাদের ঘরে এমন জিনিস প্রায়ই জমে থাকে, যার মূল্য অনেক সময় বুঝতে পারি না। সেটা হলো উদ্বৃত্ত ওষুধ। কোনো রোগের চিকিৎসা শেষ হয়ে গেছে, চিকিৎসক ওষুধ পরিবর্তন করেছেন, পরিবারের কেউ সুস্থ হয়ে উঠেছেন, কিংবা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ওষুধ কিনে রাখা হয়েছিল- এমন নানা কারণে ঘরে থেকে যায় অসংখ্য ব্যবহারযোগ্য ওষুধ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোর বড় অংশ মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত আবর্জনার স্তূপে স্থান পায়। অন্যদিকে একই সময়ে দেশের অসংখ্য মানুষ অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধ কিনতে না পেরে কষ্ট ভোগ করেন, রোগ জটিল করে তোলেন, এমনকি কখনো কখনো জীবনও হারান।
এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে- যে ওষুধ একজনের কাছে উদ্বৃত্ত, সেটা কি অন্য একজনের জীবন বাঁচানোর উপায় হতে পারে না!
এই ভাবনা থেকে সামনে আসে এক মানবিক উদ্যোগ- “মেডি-শেয়ার”। দেশের প্রতিটি ফার্মেসিতে একটি সংরক্ষিত কর্নার থাকবে, যেখানে মানুষ তাদের উদ্বৃত্ত, মেয়াদোত্তীর্ণ নয় এবং ব্যবহারযোগ্য প্রয়োজনীয় ওষুধ জমা রাখতে পারবেন কিংবা অসচ্ছল মানুষের জন্য ওষুধ কিনে রেখে যেতে পারবেন। আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী সেখান থেকে ওষুধ সংগ্রহ করতে পারবেন। একটি ছোট উদ্যোগ হয়তো পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থা বদলে দিতে পারবে না, কিন্তু হাজারো মানুষের জন্য স্বস্তির দরজা খুলে দিতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকে বহন করতে হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। স্বাস্থ্য অর্থনীতি নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশ পরিবারকে সরাসরি বহন করতে হয় এবং সেই ব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ ওষুধ কেনার পেছনে চলে যায়। গ্রামীণ কিংবা নিম্নআয়ের শহুরে পরিবারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি রোগ- যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, অ্যাজমা কিংবা কিডনি রোগ- প্রায়ই আর্থিক সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অনেক পরিবার চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ নিয়মিত কিনতে পারে না। ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং শেষ পর্যন্ত চিকিৎসা ব্যয় আরও বেড়ে যায়।
একদিকে প্রয়োজনের তুলনায় ওষুধের অভাব, অন্যদিকে ব্যবহারযোগ্য ওষুধের অপচয়- এ দুটো অবস্থাকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে “মেডি-শেয়ার” ধারণাটি শুধু মানবিক নয়, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের সমাজের বাস্তবতা এমন উদ্যোগকে সমর্থন করে। আমাদের সমাজে দানের সংস্কৃতি শক্তিশালী। মানুষ ধর্মপ্রতিষ্ঠান, এতিমখানা কিংবা অসহায় মানুষের জন্য উদারভাবে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন। চিকিৎসা সহায়তার ক্ষেত্রেও একই মনোভাব দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়, কারও চিকিৎসার জন্য মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অর্থ সংগ্রহ করছেন। যদি সেই মানবিকতাকে সুসংগঠিত কাঠামোর মধ্যে আনা যায়, তাহলে “মেডি-শেয়ার” কার্যকর সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হতে পারে।
তবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আবেগই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দায়িত্বশীল পরিকল্পনা। ওষুধ এমন পণ্য, যা সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্য ও জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অবস্থাতেই মেয়াদোত্তীর্ণ, খোলা, ক্ষতিগ্রস্ত কিংবা অনুপযুক্ত পরিবেশে সংরক্ষিত ওষুধ রাখা যাবে না। ফার্মেসির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা নিবন্ধিত ফার্মাসিস্টকে জমা দেওয়া ওষুধ যাচাই করতে হবে।
এখানে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর, ফার্মেসি কাউন্সিল, ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। তারা চাইলে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে কয়েকটি জেলা বা শহরে পরীক্ষামূলকভাবে “মেডি-শেয়ার” কর্নার চালু করতে পারে। সফলতা ও সীমাবদ্ধতা মূল্যায়ন করে পরে তা দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা সম্ভব।
এই উদ্যোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক মর্যাদা রক্ষা। সাহায্যপ্রার্থী মানুষ যেন কোনোভাবেই বিব্রত বোধ না করেন, সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক মানুষ অভাবের মধ্যেও আত্মসম্মানের কারণে সাহায্য চাইতে সংকোচ বোধ করেন। তাই “মেডি-শেয়ার” কর্নারকে দানের স্থান নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতার সামাজিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এখানে দাতা ও গ্রহীতার সম্পর্কের চেয়ে বড় হয়ে উঠবে মানবিক সহমর্মিতা।
“মানুষ মানুষের জন্য” এই কথা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা বাস্তব উদ্যোগে রূপ নেয়। একটি ট্যাবলেট, ইনহেলার, ইনসুলিন পেন কিংবা অ্যান্টিবায়োটিকের পূর্ণ কোর্স- যা একজনের কাছে বাড়তি, তা অন্য কারও কাছে হতে পারে অমূল্য সম্পদ। কোনো দরিদ্র বাবা হয়তো সন্তানের জ্বরের ওষুধ কিনতে পারছেন না। কোনো বৃদ্ধা মা হয়তো নিয়মিত উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। কোনো শ্রমজীবী মানুষ হয়তো চিকিৎসকের দেওয়া প্রেসক্রিপশন হাতে নিয়ে ফার্মেসির সামনে দাঁড়িয়ে হিসাব করছেন, সব ওষুধ কিনবেন, নাকি অর্ধেক। “মেডি-শেয়ার” হয়তো তাদের সবার সমস্যার সমাধান করবে না, কিন্তু কিছু মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারবে।
আমরা বড় বড় পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখি। তবে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন অনেক সময় ছোট ছোট উদ্যোগ থেকেই শুরু হয়। একসময় রক্তদান আন্দোলনও ছিল সীমিত পরিসরের একটি ধারণা। আজ সেটা জীবন বাঁচানোর শক্তিশালী সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। একইভাবে সচেতনতা, নীতিমালা ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে “মেডি-শেয়ার”ও একদিন মানবিক সহযোগিতার নতুন দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।
সময় এসেছে ওষুধকে শুধু পণ্য হিসেবে নয়, সামাজিক সম্পদ হিসেবে ভাবার। যে ওষুধ কারও বাসায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে, তা অন্য মানুষের সুস্থতার সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। অপচয় ও অভাব- দুইয়ের মাঝখানে মানবিক সেতুবন্ধন তৈরি করাই হবে “মেডি-শেয়ার”-এর বড় সাফল্য।
আমরা যদি দেশের প্রতিটি ফার্মেসিতে ছোট্ট কর্নার তৈরি করতে পারি, তাহলে হয়তো হাজারো মানুষকে নতুন করে বাঁচার আশা দেওয়া সম্ভব হবে। মানবতার সবচেয়ে সুন্দর রূপটি প্রকাশ পায় তখনই, যখন নিজের প্রয়োজনের অতিরিক্তটুকু আমরা অন্যের প্রয়োজন পূরণে উৎসর্গ করি।
আসুন, ওষুধ অপচয় নয়- ভাগাভাগি করি। মেডি-শেয়ার হোক মানবতার নতুন ঠিকানা।
লেখক: কথাসাহিত্যিক