শিগগিরই এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হবে। প্রায় ১৮ লাখ ৫৭ হাজার পরীক্ষার্থী এবং তাদের পরিবারের জন্য দিনটি আনন্দ, উৎকণ্ঠা ও প্রত্যাশার। কিন্তু বাংলাদেশে এই দিনটি গত কয়েক বছর ধরে আরেকটি আশঙ্কারও প্রতীক হয়ে উঠেছে। ফল প্রকাশের পরই বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভেসে আসে শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর। কোনো কোনো বছর সেই খবর একটি-দুটি নয়, ডজন ছুঁয়েছে। একটি নম্বরপত্র যেন মুহূর্তেই একটি কিশোর বা কিশোরীর কাছে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে পরিণত হয়।
এই উদ্বেগ যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান। আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে অন্তত ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৩১০; অর্থাৎ মাত্র এক বছরে তা প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে ১৯০ জনই ছিল স্কুলশিক্ষার্থী, যা মোট সংখ্যার প্রায় ৪৭ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয়, আত্মহত্যাকারীদের প্রায় ৬২ শতাংশই মেয়ে। অন্যদিকে ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই অন্তত ১৭ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সংখ্যাগুলো নিছক পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি অসমাপ্ত জীবন, একটি ভেঙে যাওয়া ভবিষ্যৎ।
আমরা প্রায়ই আত্মহত্যাকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা মানসিক অসুস্থতার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করি। কিন্তু সমাজবিজ্ঞান বহু আগেই দেখিয়েছে, আত্মহত্যা কেবল ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নয়; এটি সমাজেরও একটি আয়না। উনিশ শতকের সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম তাঁর বিখ্যাত গবেষণায় দেখিয়েছিলেন, সমাজের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে গেলে কিংবা সামাজিক প্রত্যাশা যখন মানুষের বহনক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়। অর্থাৎ আত্মহত্যা কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি সমাজের ভেতরের অসামঞ্জস্যেরও বহিঃপ্রকাশ।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দুর্খেইমের সেই পর্যবেক্ষণ আজও বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক মনে হয়। আমরা এমন একটি সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে একজন শিক্ষার্থীর পরিচয়, মর্যাদা, সম্ভাবনা, এমনকি আত্মসম্মানও অনেকাংশে নির্ধারিত হয় একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে। শিশুটি জন্মের পর থেকেই শুনতে শুনতে বড় হয়—ভালো ফল করতে হবে, প্রথম হতে হবে, জিপিএ–৫ পেতে হবে, নামী কলেজে ভর্তি হতে হবে। খুব কম পরিবারই তাকে শেখায়, ব্যর্থ হওয়াও মানুষের স্বাভাবিক অভিজ্ঞতা; জীবন কখনো একটি পরীক্ষার খাতায় আটকে থাকে না।
ফলে নম্বর ধীরে ধীরে জ্ঞানের পরিমাপ না থেকে মানুষের মূল্য নির্ধারণের যন্ত্রে পরিণত হয়। এই সংস্কৃতিতে একজন শিক্ষার্থী ফেল করলে সে শুধু একটি পরীক্ষায় ব্যর্থ হয় না; তার মনে হয় সে একজন ব্যর্থ মানুষ। এখানেই সবচেয়ে বড় বিপদ।
সমাজতাত্ত্বিক পিয়ের বুর্দিয়ু শিক্ষা সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দিয়েছিলেন—'সাংস্কৃতিক পুঁজি'। পরিবারের শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ, অর্থনৈতিক অবস্থা, ভাষা, বই পড়ার অভ্যাস, সাংস্কৃতিক চর্চা—সবকিছু মিলিয়ে একজন শিশুর শেখার সক্ষমতা গড়ে ওঠে। অর্থাৎ সব শিক্ষার্থী একই জায়গা থেকে দৌড় শুরু করে না। কিন্তু আমাদের পরীক্ষাব্যবস্থা প্রায়ই ধরে নেয়, সবাই একই সুযোগ পেয়েছে। ফলে যে শিশু দারিদ্র্য, পারিবারিক অশান্তি, গ্রামীণ বৈষম্য কিংবা প্রযুক্তিগত বঞ্চনার মধ্যেও পরীক্ষা দিচ্ছে, তার সঙ্গে শহরের সব ধরনের সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর তুলনা করা হয় একই মানদণ্ডে। এই বৈষম্যকে আমরা মেধার পার্থক্য বলে চালিয়ে দিই।
পরীক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন। মূল্যায়নও প্রয়োজন। কিন্তু যখন মূল্যায়ন মানুষের পরিচয়ের একমাত্র মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, তখন শিক্ষা তার মানবিক চরিত্র হারাতে শুরু করে। তখন বিদ্যালয় জ্ঞানচর্চার জায়গা না হয়ে প্রতিযোগিতার কারখানায় পরিণত হয়।
এই প্রতিযোগিতাকে আরও নির্মম করে তুলেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। ফল প্রকাশের দিন ফেসবুকজুড়ে শুরু হয় সাফল্যের উৎসব। জিপিএ–৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর ছবি, ফুলের তোড়া, মিষ্টি বিতরণ, সংবর্ধনা, অভিনন্দনের বন্যা। আনন্দ প্রকাশে কোনো দোষ নেই। কিন্তু একই সময়ে যে শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফল পায়নি, সে যখন বারবার অন্যের সাফল্যের ছবি দেখে, তখন তার নিজের ব্যর্থতাকে আরও বড় বলে মনে হয়। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় social comparison বা সামাজিক তুলনা। মানুষ স্বাভাবিকভাবেই নিজের অবস্থান অন্যের সঙ্গে তুলনা করে। কৈশোরে এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক সময় আনন্দের চেয়ে হতাশার উৎস হয়ে ওঠে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায় কৈশোর এমন একটি সময়, যখন আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এখনও পূর্ণতা পায় না, কিন্তু অনুভূতির তীব্রতা থাকে অত্যন্ত বেশি। মস্তিষ্কের যে অংশ দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও আত্মনিয়ন্ত্রণের কাজ করে, তার বিকাশ বিশের কোটায় গিয়ে সম্পূর্ণ হয়। কিন্তু আবেগ অনুভবের অংশটি কৈশোরেই অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে এই বয়সে অপমান, ব্যর্থতা কিংবা প্রত্যাখ্যানকে অনেক সময় জীবনের শেষ সত্য বলে মনে হয়।
এ কারণেই ফল প্রকাশের পর প্রথম ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এই সময়ে অধিকাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পরিকল্পনা করে না; বরং তীব্র আবেগ, লজ্জা, ভয় এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে হতাশার মুহূর্তে আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। পরে হয়তো সেই সিদ্ধান্ত বদলানোর সুযোগও আর থাকে না।
এই জায়গাটিই আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। আমরা শিশুকে অঙ্ক শেখাই, ইংরেজি শেখাই, তথ্যপ্রযুক্তি শেখাই; কিন্তু ব্যর্থতার সঙ্গে কীভাবে বাঁচতে হয়, কীভাবে অপমানকে সামলাতে হয়, কীভাবে আবার নতুন করে শুরু করতে হয়—সেই শিক্ষা দিই না। অথচ জীবনের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা সম্ভবত এটিই।
একজন শিক্ষার্থী যদি ছোটবেলা থেকেই শেখে যে মানুষের মূল্য নম্বরে নয়, চরিত্রে; সাফল্য একটি দীর্ঘ যাত্রা, কোনো একদিনের ফল নয়; ব্যর্থতা শেষ নয়, বরং শেখার আরেকটি ধাপ—তাহলে হয়তো একটি নম্বরপত্র তার কাছে আর মৃত্যুদণ্ডের সমান মনে হবে না।
বাংলাদেশে পরীক্ষাকেন্দ্রিক এই মানসিক চাপের সবচেয়ে বড় উৎস পরিবার। অধিকাংশ মা-বাবাই সন্তানের ভালো চান, কিন্তু অনেক সময় সেই ভালোবাসাই অজান্তে ভয়ঙ্কর চাপে রূপ নেয়। ‘এ-প্লাস না পেলে হবে না’, ‘অমুকের ছেলে পারে, তুমি পারবে না কেন?’, ‘এত টাকা খরচ করলাম, ফল কোথায়?’- এ ধরনের বাক্য হয়তো অনেক অভিভাবকের কাছে সাধারণ শাসন। কিন্তু একজন কিশোর-কিশোরীর কাছে এগুলো নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় শর্তযুক্ত গ্রহণযোগ্যতা (conditional acceptance)। অর্থাৎ শিশুটি ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শেখে, তার মূল্য তার ব্যক্তিত্বে নয়; তার ফলাফলে। সে মনে করতে শুরু করে, ভালো ফল করলে পরিবার তাকে ভালোবাসবে, ব্যর্থ হলে সে পরিবারের জন্য বোঝা হয়ে যাবে। এই বিশ্বাস একসময় আত্মসম্মানকে ক্ষয় করে। ফলে একটি পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া তার কাছে শুধু একটি ফল নয়; নিজের অস্তিত্বের ব্যর্থতা।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় মেয়েশিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার তুলনামূলক বেশি হওয়ার বিষয়টিও গভীরভাবে ভাবতে হবে। এর পেছনে শুধু মানসিক নয়, সামাজিক কারণও রয়েছে। আমাদের সমাজে মেয়েদের ওপর পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ, সামাজিক বিচার, বাল্যবিবাহের ঝুঁকি, চলাফেরার সীমাবদ্ধতা এবং সম্মান রক্ষার চাপ তুলনামূলক বেশি। অনেক পরিবারে এখনও পরীক্ষায় ব্যর্থ হওয়া মেয়ের সামনে উচ্চশিক্ষার পথ সংকুচিত হয়ে যায়। কোথাও বিয়ের চাপ বাড়ে, কোথাও পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। ফলে একটি খারাপ ফলাফল অনেক মেয়ের কাছে ভবিষ্যতের সমস্ত দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রতীক হয়ে ওঠে।
শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরেও এমন কিছু প্রবণতা তৈরি হয়েছে, যা অজান্তেই এই সংকটকে তীব্র করছে। শিক্ষা আজ অনেকাংশে নম্বর, র্যাঙ্কিং এবং প্রতিযোগিতার অর্থনীতিতে আবদ্ধ। বিদ্যালয়ের সাফল্য পাসের হার দিয়ে মাপা হয়, কোচিং সেন্টারের বিজ্ঞাপন জিপিএ–৫-এর সংখ্যা দিয়ে সাজানো হয়, এমনকি অনেক সময় শিক্ষকের দক্ষতাও শিক্ষার্থীর ফলাফলের ভিত্তিতে বিচার করা হয়। ফলে পুরো ব্যবস্থাটিই এমন এক বার্তা দেয়—তোমার পরিচয় তোমার নম্বর।
এই সংস্কৃতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারফেকশনিজম বা নিখুঁত হওয়ার অসুস্থ প্রবণতাও বাড়িয়ে তোলে। গবেষণায় দেখা গেছে, যে কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের প্রতি অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি করে এবং সামান্য ব্যর্থতাকেও ব্যক্তিগত বিপর্যয় হিসেবে দেখে, তাদের মধ্যে বিষণ্নতা ও আত্মহত্যার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। আমাদের সমাজে ‘ভালো ছাত্র’ হওয়ার যে একমাত্রিক সংজ্ঞা তৈরি হয়েছে, তা এই প্রবণতাকে আরও উসকে দেয়।
অথচ পৃথিবীর অনেক দেশ ইতোমধ্যেই বুঝতে পেরেছে, শিক্ষার্থীর মানসিক সুস্থতা ছাড়া শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য সম্ভব নয়। ফিনল্যান্ডে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য, সামাজিক দক্ষতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণকে পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে দেখা হয়। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশ, যেখানে পরীক্ষার চাপ ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত বেশি, সেখানেও বিদ্যালয়ভিত্তিক কাউন্সেলিং এবং সংকটকালীন মানসিক সহায়তা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারণ তারা উপলব্ধি করেছে, একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ তার পরীক্ষার ফল নয়; তার মানুষ।
বাংলাদেশেও এখন বিচ্ছিন্ন কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করছে, কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু এগুলো এখনও প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। দেশের কয়েক কোটি শিক্ষার্থীর তুলনায় প্রশিক্ষিত স্কুল কাউন্সেলরের সংখ্যা নগণ্য। অধিকাংশ বিদ্যালয়ে এমন একজন শিক্ষকও নেই, যিনি আত্মহত্যার ঝুঁকির প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করার প্রশিক্ষণ পেয়েছেন।
অথচ অনেক ক্ষেত্রেই সংকটের আগাম ইঙ্গিত থাকে। শিক্ষার্থী হঠাৎ নিজেকে গুটিয়ে নেয়, প্রিয় কাজের প্রতি আগ্রহ হারায়, নিজেকে অযোগ্য বলতে শুরু করে, বন্ধুদের এড়িয়ে চলে, ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাহীন কথা বলে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদায়ের মতো ইঙ্গিতপূর্ণ লেখা প্রকাশ করে। পরিবার, শিক্ষক বা বন্ধু যদি এসব লক্ষণকে গুরুত্ব দেন, তাহলে অনেক জীবনই হয়তো রক্ষা করা সম্ভব।
এখানে গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফল প্রকাশের দিন যদি সংবাদমাধ্যম শুধু সর্বোচ্চ জিপিএ পাওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়েই ব্যস্ত থাকে, তবে অনিচ্ছাকৃতভাবেই তারা প্রতিযোগিতার সংস্কৃতিকে আরও জোরালো করে। একই সঙ্গে আত্মহত্যার সংবাদ পরিবেশনেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকা অনুসরণ করা জরুরি। আত্মহত্যাকে কখনোই নাটকীয়, রোমান্টিক বা বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। বরং সংকট মোকাবিলার উপায়, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং আশার বার্তাকেই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
নীতিগতভাবেও এখন সময় এসেছে কয়েকটি জরুরি সিদ্ধান্ত নেওয়ার। প্রতিটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজে ধাপে ধাপে প্রশিক্ষিত মনোসামাজিক সহায়ক বা কাউন্সেলর নিয়োগ করতে হবে। ফল প্রকাশের সপ্তাহে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে বিশেষ মানসিক সহায়তা কার্যক্রম চালু করা যেতে পারে। জাতীয় জরুরি হেল্পলাইনগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে সংকটে থাকা শিক্ষার্থী বা পরিবার সহজেই সহায়তা পেতে পারে। শিক্ষক প্রশিক্ষণে মানসিক স্বাস্থ্য এবং আত্মহত্যা প্রতিরোধকে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিভাবকদের জন্য নিয়মিত সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করতে হবে, যাতে তাঁরা বুঝতে পারেন—একটি ফলাফল নিয়ে বলা একটি কঠিন বাক্যও কখনো কখনো সন্তানের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করতে পারে।
সবশেষে আমাদের ফিরে আসতে হবে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্নে—শিক্ষার উদ্দেশ্য কী? শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা, নাকি একজন সুস্থ, আত্মবিশ্বাসী, মানবিক এবং দায়িত্বশীল মানুষ তৈরি করা? যদি দ্বিতীয়টিই আমাদের লক্ষ্য হয়, তাহলে শিক্ষার্থীর মানসিক সুস্থতাকে আর প্রান্তিক বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
একটি সমাজের সভ্যতা শুধু তার বিশ্ববিদ্যালয়ের র্যাঙ্কিং, জিপিএ–৫-এর সংখ্যা কিংবা শতভাগ পাসের হার দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। সেই সমাজ কতটা সভ্য, তা বোঝা যায় সে তার দুর্বলতম মানুষটির পাশে কীভাবে দাঁড়ায়। যে সমাজ একটি কিশোরকে ব্যর্থ হওয়ার অধিকার দেয় না, সে সমাজ প্রকৃত অর্থে সফল হতে পারে না।
পরীক্ষার ফল জীবনের একটি অধ্যায়, পুরো জীবন নয়। একটি খারাপ ফলাফল নতুন করে চেষ্টা করার সুযোগ কেড়ে নেয় না; কিন্তু একটি আত্মহত্যা চিরদিনের জন্য সব সম্ভাবনার দরজা বন্ধ করে দেয়। তাই আজ সবচেয়ে জরুরি কাজ ফলাফল উদ্যাপন নয়, জীবনের পক্ষ নেওয়া। আমাদের সন্তানদের বলতে হবে—তুমি কত নম্বর পেয়েছ, তার আগে গুরুত্বপূর্ণ হলো তুমি বেঁচে আছ, তুমি আমাদের আপন, তুমি আমাদের ভালোবাসার মানুষ।
যেদিন প্রতিটি পরিবার, প্রতিটি বিদ্যালয় এবং পুরো সমাজ এই বার্তাটি আন্তরিকভাবে ধারণ করবে, সেদিন হয়তো পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন আর কোনো বাবা-মাকে সন্তানের নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে হবে না- ‘একটি পরীক্ষার জন্য এমনটা হওয়ার কথা ছিল না।’
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও উন্নয়নকর্মী