আজ বিশ্ব বাঘ দিবস, বাঘ বাঁচুক ‘বাঘের মতোই’

সোহাগ রাসিফ

মতামত

আজ ২৯ জুলাই, বিশ্ব বাঘ দিবস। বাঘের প্রাকৃতিক আবাস রক্ষা এবং বাঘ সংরক্ষণে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত

2026-07-29T18:30:10+00:00
2026-07-29T18:30:10+00:00
  বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬,
১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
মতামত
আজ বিশ্ব বাঘ দিবস, বাঘ বাঁচুক ‘বাঘের মতোই’
সোহাগ রাসিফ
বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬, ৬:৩০ পিএম 
ফাইল ছবি
আজ ২৯ জুলাই, বিশ্ব বাঘ দিবস। বাঘের প্রাকৃতিক আবাস রক্ষা এবং বাঘ সংরক্ষণে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয়। বাংলাদেশের জন্য এ দিবসটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনই বিশ্বখ্যাত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক আবাসস্থল। ‘সবাই হই সচেতন, বাঘ করি সংরক্ষণ’ প্রতিপাদ্যে এবার দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ উপলক্ষে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের উদ্যোগে শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, র‍্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

বাঘ শুধু একটি প্রাণীর নাম নয়, এটি শক্তি, সাহস ও রাজকীয়তার প্রতীক। তাই বাঘ যেন তার নিজস্ব অরণ্যে কোনো ভয়-ডর ছাড়াই ‘বাঘের মতো’ রাজকীয় ভঙ্গিতে বাঁচতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।

বাঘ একটি বনজ বাস্তুতন্ত্রের শীর্ষ শিকারি। এর উপস্থিতি পুরো ইকো-সিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা করে। বাঘের কারণেই তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং খাদ্যচক্র স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হয়। একটি বাঘ যখন হরিণ শিকার করে, তখন তার অবশিষ্টাংশ খেয়ে বেঁচে থাকে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, শিয়াল, পোকামাকড় ও অন্যান্য ছোট-বড় প্রাণী। তাই বাঘ সংরক্ষণ মানে শুধু একটি প্রজাতিকে রক্ষা করা নয়; বরং পুরো সুন্দরবন, এর জীববৈচিত্র্য এবং উপকূলীয় পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

সুন্দরবনের বাঘের সর্বশেষ শুমারি আশাব্যঞ্জক বার্তা দিচ্ছে। ২০২৪ সালের ক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি। এর আগে ২০১৮ সালে ছিল ১১৪টি এবং ২০১৪ সালে ছিল ১০৬টি। অর্থাৎ এক দশকে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে ১৯টি।

সংরক্ষণ কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে ২০২৭ সালের পরবর্তী জরিপে বাঘের সংখ্যা আরও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

বনের ভেতরে মানুষের উপস্থিতি কমে যাওয়া এবং হরিণের সংখ্যা বৃদ্ধিকে বাঘের সংখ্যা বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে অতীতের চিত্র ভিন্ন। ১৯৭৫ সালের জরিপে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩৫০টি। ২০১০ সালে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে অনুষ্ঠিত টাইগার সামিটে বাংলাদেশসহ ১৩টি দেশ ২০২২ সালের মধ্যে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। নেপাল সেই লক্ষ্য অর্জন করলেও বাংলাদেশ এখনও কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি।

বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য দুটি মৌলিক বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—নিরাপদ আবাসস্থল এবং পর্যাপ্ত খাদ্য।

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ বাঘের জন্য উপযোগী হলেও জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা এবং নদীভাঙনের কারণে তাদের আবাসস্থল ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে।

বর্তমানে জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাস পর্যটক ও জেলেদের সুন্দরবনে প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকায় বন তুলনামূলকভাবে মানব কোলাহলমুক্ত থাকে। বন কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মানুষের উপস্থিতি কম থাকায় বাঘ আরও স্বাভাবিকভাবে বিচরণ করছে। সম্প্রতি বিভিন্ন রেঞ্জে বাঘকে নদী সাঁতরাতে কিংবা বন অফিসের আশপাশে দেখা যাওয়ার ঘটনাও তারই প্রমাণ।

অন্যদিকে, বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ। কিন্তু অবৈধ হরিণ শিকার পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। হরিণের পর্যাপ্ত সংখ্যা নিশ্চিত না হলে বাঘও খাদ্য সংকটে পড়বে। তাই বাঘ সংরক্ষণের পাশাপাশি হরিণ সংরক্ষণেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পর্যাপ্ত খাদ্য ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হলেই বাঘের প্রজনন বাড়বে।

গত আড়াই দশকে সুন্দরবনে অন্তত ৯১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাঘ চোরা শিকারিদের হাতে মারা গেছে। অন্যদিকে, খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসা অনেক বাঘ গ্রামবাসীর পিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছে।

তবে গত এক দশকে সরকার বাঘ সংরক্ষণে প্রযুক্তিনির্ভর নানা উদ্যোগ নিয়েছে। স্মার্ট পেট্রোলিং, ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি এবং কঠোর আইন প্রয়োগের ফলে বাঘ হত্যা ও মানুষ-বাঘ সংঘাত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে বাঘ শিকার প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি করা জরুরি, যাতে তারা জীবিকার প্রয়োজনে বনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়।

সবশেষে, বাঘ যেন তার নিজস্ব পরিবেশে সত্যিকার অর্থেই ‘বাঘের মতো’ বাঁচতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কারণ বাঘ বাঁচলে সুন্দরবন বাঁচবে, আর সুন্দরবন বাঁচলে টিকে থাকবে আমাদের উপকূলীয় জনপদ, জীববৈচিত্র্য এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য।

লেখক: সাংবাদিক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থী, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: