মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিশুরা শুধু ভবিষ্যৎ নয়- তারা আজকের বাংলাদেশও

দীপু মাহমুদ

মতামত

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে হাজারো শিশুর সামনে দাঁড়িয়ে আপনি বললেন, “আজকের শিশুরা যদি আগামী দিনে নিজেদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারে,

2026-07-28T11:44:14+00:00
2026-07-28T11:44:14+00:00
  বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬,
১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
 
বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
মতামত
খোলা চিঠি
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিশুরা শুধু ভবিষ্যৎ নয়- তারা আজকের বাংলাদেশও
দীপু মাহমুদ
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬, ১১:৪৪ এএম 
সংগৃহীত ছবি
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

বাংলাদেশ আর্মি স্টেডিয়ামে হাজারো শিশুর সামনে দাঁড়িয়ে আপনি বললেন, “আজকের শিশুরা যদি আগামী দিনে নিজেদের সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারে, তবেই ভবিষ্যতে একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।” আপনি তাদের মন দিয়ে পড়তে বলেছেন, খেলতে বলেছেন, গাছ লাগাতে বলেছেন, নদী-নালা পরিষ্কার রাখতে বলেছেন, পশুপাখির প্রতি মমতা দেখাতে বলেছেন। এমন বক্তব্য কেবল একটি আনুষ্ঠানিক ভাষণ নয়; এটা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে শিশুদের প্রতি নৈতিক অঙ্গীকার।

আপনার এই কথাগুলো আমাদের আশাবাদী করেছে। তবে সেই আশার মধ্যেও একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে।

যে শিশুর হাতে আপনি আগামী বাংলাদেশের দায়িত্ব তুলে দিতে চান, সে কি আজ নিরাপদ?

যে শিশু আগামী দিনের ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক, শিল্পী, বিজ্ঞানী কিংবা আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ হওয়ার স্বপ্ন দেখবে, সে যদি আজ বিদ্যালয়ে নির্যাতনের শিকার হয়, ঘরের ভেতর সহিংসতার মধ্যে বড় হয়, সড়কে প্রাণ হারায়, শিশুশ্রমে বাধ্য হয়, বাল্যবিবাহের শিকার হয় কিংবা অনলাইন ও বাস্তব জীবনের নানা শোষণ-নির্যাতনের ঝুঁকিতে থাকে, তাহলে তার কাছে আত্মগঠনের আহ্বান কতটা বাস্তব? আত্মগঠনের আগে প্রয়োজন নিরাপদে বেড়ে ওঠার অধিকার।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার ভাষণ শুনতে শুনতে বারবার মনে হচ্ছিল- যে শিশুরা আজ গ্যালারিতে বসে আপনার কথা শুনছিল, তাদের সবাই কি আগামীকাল নিরাপদে ঘরে ফিরবে?সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমরা এমন অনেক শিশুকে হারিয়েছি, যারা কোনো অপরাধ করেনি- কেউ ঘরের ভেতর, কেউ বিদ্যালয়ে, কেউ খেলার মাঠে, কেউ সড়কে, কেউ আবার সহিংসতার নির্মম বাস্তবতায়। প্রতিবারই আমরা শোক প্রকাশ করি, বিচার চাই, প্রতিশ্রুতি দিই। কিন্তু একজন শিশুর জীবন কখনোই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া শৈশব রাষ্ট্রের বিবেকের সামনে এক একটি কঠিন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে- আমরা কি শিশুদের শুধু ভবিষ্যৎ হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছি, নাকি তাদের বর্তমানটুকুও নিরাপদ করে তুলতে পারছি?

আপনি শিশুদের বলেছেন, কেউ পরিবেশ নোংরা করলে তারা যেন তাকে নিরুৎসাহিত করে, প্রয়োজনে নিজেরাই ময়লা পরিষ্কার করে। পরিবেশ রক্ষায় শিশুদের অংশগ্রহণ অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু রাষ্ট্রেরও তো কিছু দায়িত্ব আছে। নিরাপদ বিদ্যালয়, নিরাপদ খেলার মাঠ, শিশুবান্ধব শহর, মানসম্মত শিক্ষা, সহজলভ্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, নির্যাতনের দ্রুত বিচার এবং কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা- এসব দায়িত্ব কোনো শিশুর কাঁধে তুলে দেওয়া যায় না। শিশুরা দায়িত্ববোধ শিখবে, কিন্তু তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রকেই নিতে হবে।

আপনি বলেছেন, সরকার শিশুদের বিকাশে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে। এই প্রতিশ্রুতিই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা। সেই আশার জায়গা থেকেই কয়েকটি বিনীত আবেদন।

বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার জন্য আরও শক্তিশালী ও সমন্বিত জাতীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজকল্যাণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং স্থানীয় সরকার একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে কার্যকর শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, অভিযোগ গ্রহণের নিরাপদ ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত কাউন্সেলিং সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। নির্যাতনের শিকার একজন শিশু যেন থানায়, হাসপাতালে কিংবা আদালতে গিয়ে দ্বিতীয়বার মানসিক আঘাতের শিকার না হয়- সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

আপনি গণমাধ্যমকে শিশুদের খবরকে গুরুত্ব দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। এই আহ্বান অত্যন্ত সময়োপযোগী। তবে আমরা চাই, পত্রিকার প্রথম পাতায় শিশুদের সাফল্যের খবর বেশি ছাপা হোক; নির্যাতন, মৃত্যু, অবহেলা কিংবা হারিয়ে যাওয়ার খবর নয়। সেটা সম্ভব হবে তখনই, যখন শিশুদের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হবে।

যেকোনো রাষ্ট্রের সভ্যতা বিচার করার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড তার উঁচু ভবন, প্রবৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামো নয়; বরং সে তার শিশুদের কতটা নিরাপদ রাখতে পেরেছে। কারণ একজন শিশু শুধু আগামী দিনের নাগরিক নয়, সে আজকেরও একজন পূর্ণ মানুষ, যার অধিকার আজই নিশ্চিত করতে হবে।

আপনি বলেছেন, বাংলাদেশ গড়ার কাজ শিশুরাই এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমরা বিশ্বাস করি, তারা পারবে। তবে তার আগে আমাদের দায়িত্ব তাদের হাতে এমন বাংলাদেশ তুলে দেওয়া, যেখানে কোনো শিশু ভয় নিয়ে স্কুলে যাবে না, ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাবে না, নির্যাতনের আতঙ্কে বড় হবে না, কিংবা স্বপ্ন দেখার আগেই জীবন হারাবে না।

আপনি শিশুদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন। আজ আমরা, দেশের শিশুদের পক্ষ থেকে, আপনার কাছেও একটি সহযোগিতা চাই।

শিশুদের জন্য এমন বাংলাদেশ গড়ে দিন, যেখানে নিরাপত্তা হবে অধিকার, সুরক্ষা হবে রাষ্ট্রের অঙ্গীকার, আর প্রতিটি শিশুর শৈশব হবে এই দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।

কারণ শিশুরা শুধু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নয়।তারা আজকের বাংলাদেশও।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও উন্নয়নকর্মী


Loading...
Loading...

মতামত- এর আরো খবর

Loading...
Loading...
© 2026 Daily Daily Bhorer Dak
সম্পাদক ও প্রকাশক : কে.এম. বেলায়েত হোসেন
৪-ডি, মেহেরবা প্লাজা, ৩৩ তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০ থেকে প্রকাশিত এবং মনিরামপুর প্রিন্টিং প্রেস ৭৬/এ নয়াপল্টন, ঢাকা থেকে মুদ্রিত। পিএবিএক্স: ৪১০৫২২৪৫, ৪১০৫২২৪৬, ০১৭৭৫-৩৭১১৬৭, বিজ্ঞাপন ও সার্কুলেশন: ৪১০৫২২৫৮
ই-মেইল : [email protected], [email protected]
ফলো করুন: