বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় গত দুই দশকে সবচেয়ে বড় সাফল্য নিঃসন্দেহে বিদ্যালয়ে ভর্তি বৃদ্ধি। আজ দেশের অধিকাংশ শিশুই স্কুলে যায়। নতুন ভবন হয়েছে, বিনা মূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ হয়, উপবৃত্তি কর্মসূচি চালু হয়েছে, ডিজিটাল শিক্ষা নিয়েও নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন এখন সামনে এসে দাঁড়িয়েছে- শিশুরা কি সত্যিই শিখছে?
এই প্রশ্নের উত্তর উদ্বেগজনক। সাম্প্রতিক সময়ে ইউনিসেফ, ইউনেস্কো, বিশ্বব্যাংক এবং বাংলাদেশের নিজস্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকাশিত তথ্য বলছে, স্কুলে উপস্থিতি বাড়লেও শেখার মান সেই অনুপাতে বাড়েনি। বরং বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেও বাংলা পড়তে, ইংরেজি বুঝতে কিংবা সাধারণ গণিত করতে পারছে না। এটাই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা-সংকট- Learning Crisis।
২০২৬ সালের ৭ মে প্রকাশিত ইউনিসেফ বাংলাদেশ ও ইউনিসেফ ইনোসেন্টির যৌথ গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের বহু শিক্ষার্থী মৌলিক সাক্ষরতা (Foundational Literacy) ও গণনাদক্ষতা (Foundational Numeracy) অর্জন না করেই মাধ্যমিকে প্রবেশ করছে। গবেষণায় দেখা যায়, পঞ্চম শ্রেণির ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে "Novice" পর্যায়ে, অর্থাৎ তারা শ্রেণি-উপযোগী অর্ধেক প্রশ্নেরও সঠিক উত্তর দিতে পারে না। একইভাবে বাংলায় ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থীও "Novice" পর্যায়ে রয়েছে। গবেষণাটি আরও দেখায়, শিক্ষার্থীর প্রকৃত শেখার স্তর অনুযায়ী পাঠদান করলে শেখার ফল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়।
এটা কোনো বিচ্ছিন্ন চিত্র নয়। ২০২২ সালে ইউনিসেফের আরেকটি প্রতিবেদনে দেখা গিয়েছিল, বাংলাদেশের তৃতীয় শ্রেণির মাত্র ৩৪ শতাংশ শিশুর ভিত্তিগত পাঠদক্ষতা এবং মাত্র ১৮ শতাংশের ভিত্তিগত গণিতদক্ষতা রয়েছে। অর্থাৎ শেখার সংকট বহু বছর ধরেই তৈরি হচ্ছিল; সাম্প্রতিক গবেষণা কেবল সেই সংকটের গভীরতাই স্পষ্ট করেছে।
ইউনেস্কোর Global Education Monitoring (GEM) প্রতিবেদনের অন্যতম বার্তা হলো, কেবল বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; শেখার ফল (Learning Outcomes) নিশ্চিত করতে না পারলে শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। প্রাথমিক স্তরে ভাষা ও গণিতের ভিত্তি দুর্বল থাকলে শিক্ষার্থীরা পরবর্তী প্রতিটি শ্রেণিতে আরও পিছিয়ে পড়ে। তাই দক্ষ শিক্ষক, কার্যকর শ্রেণিকক্ষ, মানসম্মত মূল্যায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা- এসবই শেখার মান উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত।
কেন এমন হচ্ছে?
প্রথম কারণ, ভিত্তিগত শেখার ঘাটতি। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া, লেখা ও সংখ্যাবোধ ঠিকমতো তৈরি না হলে সেই দুর্বলতা পরবর্তী শ্রেণিতে বহুগুণ বেড়ে যায়। যে শিশু দ্বিতীয় শ্রেণিতে সাবলীলভাবে পড়তে শেখেনি, সে পঞ্চম শ্রেণিতে গিয়েও বিজ্ঞান, সমাজ বা গণিতের প্রশ্ন বুঝতে পারবে না। ফলে সে শুধু একটি বিষয়েই নয়, সব বিষয়েই পিছিয়ে পড়বে।
দ্বিতীয় কারণ, মুখস্থনির্ভর শিক্ষা। আমাদের শ্রেণিকক্ষে এখনো অনেক ক্ষেত্রে শেখার চেয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতিই বেশি গুরুত্ব পায়। উত্তর মুখস্থ করে পরীক্ষায় কিছু নম্বর পাওয়া যায়, কিন্তু ভাষা বোঝা, বিশ্লেষণ করা কিংবা বাস্তব সমস্যার সমাধান করার দক্ষতা তৈরি হয় না।
তৃতীয় কারণ, শিক্ষণ-পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা। অনেক শিক্ষক আন্তরিক হলেও তাঁদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। বিশেষ করে বাংলা ভাষা শেখানো, ইংরেজিতে যোগাযোগ দক্ষতা তৈরি এবং গণিতের ধারণাগত শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে আধুনিক পদ্ধতির ব্যবহার এখনো সীমিত। একই সঙ্গে বড় শ্রেণিকক্ষ, অতিরিক্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব এবং শিক্ষকের ঘাটতিও কার্যকর পাঠদানকে বাধাগ্রস্ত করে।
চতুর্থ কারণ, শেখার বৈষম্য। একই শ্রেণিকক্ষে কেউ সাবলীলভাবে পড়তে পারে, কেউ বর্ণ চিনতেই হিমশিম খায়। কিন্তু পাঠদান হয় একই গতিতে। ফলে দুর্বল শিক্ষার্থীরা আরও পিছিয়ে যায়। ইউনিসেফের গবেষণাও দেখিয়েছে, শিক্ষার্থীর প্রকৃত শেখার স্তর অনুযায়ী পাঠদান করলে শেখার ফল উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়।
পঞ্চম কারণ, পরিবার ও সামাজিক পরিবেশ। অনেক শিশুর বাড়িতে বই পড়ার পরিবেশ নেই, অভিভাবকের শিক্ষাগত সহায়তাও সীমিত। অর্থনৈতিক চাপ, অপুষ্টি, অনিয়মিত উপস্থিতি এবং ডিজিটাল বিভাজনও শেখার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এই ঘটনা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে আমাদের সকলের জানা। এখন যদি কেউ স্কুল পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন শিক্ষার্থীরা বাংলা রিডিং পড়তে পারছে না কিংবা সহজ যোগ বিয়োগ করতে পারছে না, তাই দেখে বিস্মিত হন তাহলে তার বিস্মিত হওয়ার ঘটনায় আমরা বিস্মিত হই। বাংলাদেশের শিক্ষা যে পরিস্থিতি সবাই জানেন, তিনি কেন জানেন না!
তাহলে এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ কী!
প্রথমত, প্রাথমিক শিক্ষার মূল লক্ষ্য হিসেবে Foundational Literacy and Numeracy (FLN)-কে জাতীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রথম তিন বছরে প্রত্যেক শিশুকে সাবলীলভাবে পড়তে, বুঝতে এবং মৌলিক গণিত করতে শেখানো নিশ্চিত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, Teaching at the Right Level (TaRL) বা শিক্ষার্থীর প্রকৃত শেখার স্তরভিত্তিক পাঠদান পদ্ধতি ধাপে ধাপে চালু করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই পদ্ধতি উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে, এবং বাংলাদেশে ইউনিসেফের গবেষণাও এর কার্যকারিতা তুলে ধরেছে।
তৃতীয়ত, শিক্ষক প্রশিক্ষণকে এককালীন কর্মশালা থেকে বের করে ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের অংশ করতে হবে। শ্রেণিকক্ষে কীভাবে শিশুদের পড়া, লেখা ও গণিত শেখানো হবে, সেই ব্যবহারিক দক্ষতার ওপর জোর দিতে হবে।
চতুর্থত, পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়নের পরিবর্তে নিয়মিত শেখার মূল্যায়ন চালু করতে হবে। বছরে একবার পরীক্ষার ফল নয়; বরং প্রত্যেক শিশুর শেখার অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
পঞ্চমত, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য Remedial Learning বা পুনরুদ্ধারমূলক শিক্ষা চালু করতে হবে। যারা পড়তে বা গণিতে পিছিয়ে আছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত সময়, ছোট দলে পাঠদান এবং লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
ষষ্ঠত, অভিভাবকদেরও শেখার অংশীদার করতে হবে। প্রতিদিন ২০ মিনিট শিশুর সঙ্গে বই পড়া, গল্প বলা কিংবা সহজ গণিত অনুশীলনের মতো ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এখন সময় সেই সাফল্যকে শেখার সাফল্যে রূপান্তর করার। কারণ স্কুলে ভর্তি হওয়া একজন শিশুর অধিকার, কিন্তু শেখা তার ভবিষ্যৎ। যে জাতি তার শিশুদের পড়তে, বুঝতে ও চিন্তা করতে শেখাতে পারে না, সে জাতি টেকসই উন্নয়নের স্বপ্নও পূরণ করতে পারে না।
প্রাথমিক শিক্ষার প্রকৃত সাফল্য নির্ধারিত হবে ভর্তি, ভবন কিংবা বই বিতরণের সংখ্যায় নয়; নির্ধারিত হবে একজন শিশু পঞ্চম শ্রেণি শেষে নিজের ভাষায় একটি অনুচ্ছেদ বুঝে পড়তে পারে কিনা, ইংরেজিতে একটি সাধারণ নির্দেশনা অনুসরণ করতে পারে কিনা, কিংবা দৈনন্দিন জীবনের একটি সহজ গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে পারে কিনা। বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের পরবর্তী অধ্যায় শুরু হওয়া উচিত এই সহজ কিন্তু মৌলিক প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার মধ্য দিয়েই। অর্থাৎ টার্মিনাল কম্পিটেন্সি বা প্রান্তিক যোগ্যতা নিশ্চিত করা।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও উন্নয়নকর্মী