কোনো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে রাষ্ট্রের শিশুদের হাত ধরে। আজ যে শিশুর বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, স্বপ্ন দেখার কথা, নতুন কিছু শেখার কথা- সে যদি হাসপাতালের বিছানায় শ্বাস নিতে লড়তে থাকে, কিংবা প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে প্রাণ হারায়, তবে শুধু একটি পরিবার নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ। তাই হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবকে কেবল একটি সংক্রামক রোগের বিস্তার হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটা বাংলাদেশের মানবসম্পদ, শিক্ষা, অর্থনীতি এবং উন্নয়নের ভিত্তিকে নাড়া দেওয়া এক গভীর জাতীয় সংকট।
বাংলাদেশ গত এক দশকে কখনোই এমন বড় হামের প্রাদুর্ভাব দেখেনি। ২০২৫ সালে যেখানে সংক্রমণ ছিল বিচ্ছিন্ন, সেখানে ২০২৬ সালে মাত্র কয়েক মাসেই ৮০ হাজার ১০৪ জনের বেশি মানুষ সম্ভাব্য আক্রান্ত, ৯ হাজার ৭৭৯ জনের ল্যাবরেটরিতে নিশ্চিত আক্রান্ত এবং জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত ৬৮৯ জনের মৃত্যু রেকর্ড হয়েছে। আক্রান্তদের ৮২ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে ইতোমধ্যে কয়েক শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বিপুল অংশই শিশু। আক্রান্তের সংখ্যাও কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এর প্রতিটি সংখ্যা একটি অসমাপ্ত জীবন, একটি ভেঙে যাওয়া পরিবার এবং একটি হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনার প্রতীক। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, যারা বেঁচে যাচ্ছে, তাদের অনেকেই দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ও স্নায়বিক জটিলতার ঝুঁকিতে আছে। যার প্রভাবে হাম আগামীতে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ, শ্রবণশক্তি হ্রাস কিংবা স্থায়ী স্নায়বিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। সাম্প্রতিক গবেষণা আরও দেখিয়েছে, এই রোগ শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার স্মৃতিকে দুর্বল করে দেয়। ফলে একজন শিশু পরবর্তী মাস বা বছরজুড়ে অন্য সংক্রমণেও সহজে আক্রান্ত হতে পারে। অর্থাৎ হামের ক্ষতি রোগ সেরে যাওয়ার দিনেই শেষ হয় না, বরং তার দীর্ঘ প্রভাব শিশুর বেড়ে ওঠার পুরো পথজুড়ে বিস্তৃত থাকে। উল্লেখ্য, হাম বিশ্বের অন্যতম সংক্রামক রোগ, একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জন পর্যন্ত অন্য মানুষকে সংক্রমিত করতে পারেন।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে শিক্ষায়। যে শিশু বারবার অসুস্থ হবে, অপুষ্টিতে ভুগবে কিংবা স্নায়বিক জটিলতার শিকার হবে, তার বিদ্যালয়ে নিয়মিত উপস্থিতি, শেখার সক্ষমতা এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশ- সবই বাধাগ্রস্ত হবে। আজকের এই শিশুরাই আগামী দিনের চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, কৃষিবিজ্ঞানী কিংবা উদ্যোক্তা। তাদের এক বিশাল অংশ যদি প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগের কারণে স্থায়ীভাবে পিছিয়ে পড়ে, তাহলে তার মূল্য শুধু পরিবার নয়, পুরো জাতিকে দিতে হবে।
এই সংকট অর্থনীতির জন্যও সমান উদ্বেগজনক। পরিবারগুলোর চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে, অভিভাবকের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং সরকারকে জরুরি টিকাদান ও চিকিৎসায় বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল স্বাস্থ্য ও কম দক্ষ মানবসম্পদ দেশের উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয়। উন্নয়ন তখন শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকে, মানুষের সক্ষমতা আর সেই গতিতে এগিয়ে যেতে পারে না।
প্রশ্ন হলো, এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি হলো? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি, কোভিড-পরবর্তী সময়ে টিকা গ্রহণে ব্যাঘাত, অপুষ্টি, ভিটামিন-এ-এর অভাব এবং দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা মিলেই এই প্রাদুর্ভাবকে ভয়াবহ রূপ দিয়েছে। অথচ হাম এমন একটি রোগ, যার কার্যকর ও নিরাপদ টিকা বহু বছর ধরেই আছে। অর্থাৎ এই বিপর্যয়ের বড় অংশই প্রতিরোধযোগ্য ছিল।
অনেক দিন হয়ে গেল। এখন প্রয়োজন কেবল জরুরি চিকিৎসা নয়, সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউনিসেফ জরুরি গণটিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে, ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে, আগের ডোজ নেওয়া থাকলেও, টিকার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে ভিটামিন-এ সাপ্লিমেন্ট নিশ্চিত করা, অপুষ্ট শিশুদের দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে শতভাগ কার্যকর করতে হবে। বাদ পড়া প্রত্যেক শিশুকে দ্রুত টিকার আওতায় আনতে হবে, অপুষ্টি মোকাবিলায় বিশেষ কর্মসূচি জোরদার করতে হবে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গুজব ও টিকাবিরোধী ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক জনসচেতনতা গড়ে তোলাও জরুরি।
একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার আকাশচুম্বী ভবনে নয়, তার সুস্থ, নিরাপদ ও শিক্ষিত শিশুদের মধ্যে নিহিত। তাই হামের এই প্রাদুর্ভাবকে যদি আমরা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমস্যা বলে পাশ কাটিয়ে যাই, তাহলে ভুল করব। এটা শিক্ষা, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জাতীয় উন্নয়নেরও সংকট।
কারণ হামের এই প্রাদুর্ভাব শুধু শত শত প্রাণ কেড়ে নেয়নি, এটা আগামী এক দশকের শিক্ষার্থী, কর্মী, নাগরিক এবং জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তিকেও দুর্বল করে দিয়েছে। তাই এটাকে কেবল একটি স্বাস্থ্য সংকট বলা যাবে না, এটা হচ্ছে মানবসম্পদ, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার সংকট।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও উন্নয়নকর্মী